প্রথম বিয়ের কথা গোপন করায় ক্ষোভে স্বামীকে খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

59

প্রথম বিয়ের কথা গোপন রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করায় গলায় ছুরি চালিয়ে স্বামীকে হত্যা করেন স্ত্রী আশা। পুলিশ বগুড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি অকপটে হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেছেন।
পুলিশ জানায়, বগুড়ার মেয়ে আশা আক্তারকে বিয়ে করেন চট্টগ্রামের শামীম। বিয়ের পর আশা বুঝতে পারে, সে প্রতারণার শিকার হয়েছে। প্রতারিত হওয়ার ক্ষোভ থেকে ‘ভালোবাসার’ মানুষটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় মুখের উপর কম্বল চাপা দিয়ে গলা কেটে নৃশংসভাবে খুন করে আশা। গলা কাটার পর আবারও মুখের উপর বিছানার চাদর দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপান। পরে পালিয়ে যান বগুড়ায়।
পাহাড়তলী থানা পুলিশ লাশ উদ্ধারের পর টানা চারদিন ধরে তদন্ত চালিয়ে নিহতের পরিচয় নিশ্চিতের পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে আশাকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যদিয়ে এই ঘটনার রহস্যও উন্মোচন হয়েছে।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পাহাড়তলী থানার আব্দুল আলী নগরের নেছারিয়া মাদ্রাসার সামনে প্রয়াত ইউসুফ মিয়ার কলোনির একটি বাসা থেকে মো. শামীমের (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পেশায় বাবুর্চি শামীমের বাড়ি ব্রা²ণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলায়। থাকতেন নগরীর খুলশী থানার ঢেবারপাড় এলাকায় মা, এক বোন এবং স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে।
পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘ভাড়া নেওয়া বাসাটিতে সকালে স্ত্রীকে নিয়ে উঠেছিলেন শামীম। বাড়ির মালিকের কাছে নাম-ঠিকানা কিছুই ছিল না। সে জন্য লাশ উদ্ধারের সময় আমরা নাম-ঠিকানা কিছুই পাইনি। তবে আমরা তথ্য পাই, বাড়ির মালিকের মেয়ে তানিয়াকে বাসায় ওঠার আগে নিহত ব্যক্তি কয়েকবার ফোন করেছিলেন। কিন্তু পরে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। সেই ফোন কলের সূত্র ধরে আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে শামীমের বাসার ঠিকানা পাই এবং স্বজনদের খুঁজে বের করি। শামীমের মা ও প্রথম স্ত্রী তার লাশ শনাক্ত করেন।’
শামীম ফেসবুকে এক মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলত প্রথম স্ত্রীর দেওয়া এমন তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে আশা আক্তারের বিষয়ে জানা যায় এবং গত মঙ্গলবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) তাকে বগুড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন ওসি।
পুলিশ জানায়, আশা আক্তার (২৩) বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া নতুনপাড়া এলাকার আব্দুল আজিজের মেয়ে। বগুড়া শহরে একটি বায়িং হাউজে চাকরির পাশাপাশি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট থেকে আশা এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী।
গ্রেপ্তারের পর আশাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পাহাড়তলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অর্নব বড়ুয়া জানান, একবছর আগে ফেসবুকে আশা আক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয় শামীমের। পরিচয়ের সময় শামীম তার বাবুর্চি পেশা এবং আগের সংসারের তথ্য গোপন করে। এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে বগুড়ায় গিয়ে আশা’র সঙ্গে দেখা করেন শামীম। এক পর্যায়ে শামীমের সঙ্গে আশার বিয়ে হয়।
এসআই অর্ণব জানান, চারমাস আগে আশা’র পরিবারের সম্মতিতে দু’জনের বিয়ে হয়। বগুড়া শহরে একটি বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন। তবে শামীমের মা ও প্রথম স্ত্রী কেউই বিষয়টি জানত না। বিয়ের পরপরই প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের কথা জেনে যায় আশা। এরপরও স্বামীকে নিজের করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় আশা এনজিও থেকে ৬৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শামীমকে একটি টমটম গাড়ি (ইজিবাইক) কিনে দেয়। এর আগেও ৩০ হাজার টাকা শামীমকে দেয়। কিন্তু টমটমটি মাত্র তিনদিন চালিয়ে শামীম আশাকে না জানিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসে। এতে আশা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়। শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে আশাকে টমটম গাড়িটি বিক্রি করে টাকা নিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে রাজি হয়ে আশা তিনদিন সময় চায় শামীমের কাছে। তিনদিন পর আশা ঢাকার সায়েদাবাদে আসবে, শামীম তাকে সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসবে- এমন কথা হয় তাদের মধ্যে।
তিনি বলেন, মূলত প্রথম বিয়ের কথা গোপন রাখায় আশা এই তিনদিন ধরে তার স্বামীকে খুন করার পরিকল্পনা করে। যে স্বামীকে এতকিছু করেও নিজের করে রাখতে পারল না, তার সঙ্গে সংসার করবে না এবং তাকেও দুনিয়াতে রাখবে না- এমন শপথ নেয় আশা। বগুড়া শহরের রেললাইনের পাশে একটি খোলাবাজার থেকে ছুরি কিনে সেটিতে শান দেয় আশা। মাকে প্র্যাকটিক্যাল খাতা দেখানোর জন্য বান্ধবীর বাসা যাচ্ছে বলে বেরিয়ে পড়ে ঢাকার উদ্দেশে। ব্যাগে নেয় ছোরাটি। ঢাকায় পৌঁছে আশা ও শামীম দু’জনই তাদের যাতে কেউ খুঁজে না পায় সে জন্য মোবাইল ভেঙে সিম নষ্ট করে ফেলে। এরপর দুজনে ১৬ ফেব্রæয়ারি ভোরে নগরীতে পৌঁছে ভাড়া করা বাসায় ওঠে।
হত্যাকাÐের বিবরণ দিয়ে এসআই অর্ণব বড়ুয়া বলেন, ‘ভোরে বাসায় ওঠার পর আশা দোকানে গিয়ে দুজনের জন্য কলা-কেক কিনে আনেন। দু’জনে মিলে খাওয়ার পর শামীম গোসল সেরে ঘুমিয়ে পড়ে। বাসায় একটি লাল কম্বল ও বিছানার চাদর ছিল। ঘুমন্ত শামীমের মুখ প্রথমে সেই কম্বল দিয়ে চেপে ধরে আশা গলায় ছুরি চালিয়ে দেয়। এরপর মুখের ওপর একটি চাদর দিয়ে দেয়। পরে আরও তিনবার সে মুখের ওপর ছুরিকাঘাত করে। এতে বীভৎস অবস্থা হয় শামীমের মুখমন্ডলের। কয়েক মিনিটের মধ্যে রক্তমাখা পোশাক পাল্টে আশা বগুড়ার উদ্দেশে বাসে রওনা দেয়।’
পাহাড়তলী থানার ওসি সদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘আমরা ওই মেয়ের বাসা থেকে তার রক্তমাখা জামা উদ্ধার করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে- এই খুনের ঘটনা সে একাই ঘটিয়েছে। মূলত প্রতারিত হওয়ার ক্ষোভ সহ্য করতে না পেরে সে স্বামীকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে।’