প্রতিরোধ হোক জরায়ু ক্যান্সার, স্বাস্থ্য-সুখে বাঁচুক নারী

14

সুকন্যা ঘোষ

সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে -সত্যিই তাই। গুণসম্পন্ন রমণীদের দ্বারাই এই সংসার এতো সুন্দর, এতো মধুর হয়ে ওঠে। কিন্তু এই রমণীদের গুণ যদি কাজে লাগাতে হয়, তাদেরকে অবশ্যই সুস্থ থাকতে হবে। তাদের শরীরের প্রতি যত্ন নিতে হবে এবং সেই সাথে বাড়ির লোকদেরও সচেতন হতে হবে তাদের বাড়ির এই রমণীটির প্রতি। আজকাল ‘জরায়ু ক্যান্সার’ সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই শুনতে পাই। মহিলাদের মধ্যে যে ক্যান্সার অধিক পরিমাণে দেখা যায় তার মধ্যে এটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই ‘জরায়ু ক্যান্সার’। তাই, নিঃসন্দেহে এটি নারীদের জন্য একটি ভয়াবহ ব্যাধি। বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে একজন নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন এবং প্রতি বছর ৫০ লক্ষাধিক নারী নতুন করে আক্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা এজেন্সি সাম্প্রতিক এক জরিপে বলেছে, বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে। প্রতি বছর নতুন করে ১২ হাজারের মতো নারীর শরীরে এই ক্যান্সার শনাক্ত হচ্ছে। জরায়ু ক্যান্সার কি, তার চিকিৎসা পদ্ধতি কি তা নিয়েই আমরা আজকে জানব।
‘জরায়ু’ বা ‘Uterus’ হলো নারীদের বাচ্চা ধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন অঙ্গ, যা দেখতে অনেকটা ছোট্ট ফোলানো বেলুনের মতো। এর উপরের দিকের ভাগ টা কে বলা হয় বডি, নিচের দিকের ভাগ টা কে বলা হয় জরায়ু মুখ বা Cervix। দুই ভাগেই ক্যান্সার হতে পারে। উপরের ভাগ বা বডি তে ক্যান্সার হলে সেটাকে বলা হয় ‘এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার’ আর জরায়ু মুখে ক্যান্সার হলে সেটাকে ‘Cervical cancer’ বা ‘জরায়ু মুখের ক্যান্সার’ বলা হয়। আমাদের দেশে বিশেষ করে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মূলত জরায়ু মুখের ক্যান্সার টি বেশি হয়।
জরায়ু মুখের ক্যান্সার হওয়ার কারণসমূহ :
অতি অল্প বয়সে বিয়ে এবং সহবাস; অধিক সন্তান ধারণ করার ফলে জরায়ু মুখের ছিঁড়ে যাওয়া বা ক্ষয় ; অসাবধানতা এবং নোংরা পরিবেশে বড় হওয়া; অস্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনা ; HPV (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) এর সংক্রমণ ; শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়া ; ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত দীর্ঘদিন যাবৎ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন।
লক্ষণসমূহ :
জরায়ু ক্যান্সার এর প্রধান উপসর্গ হলো অনিয়মিত ও অতিরিক্ত ঋতুস্রাব বা ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই আবার শুরু হওয়া; এছাড়া, ভাইরাসের সংক্রমণ এর কারণে অত্যধিক সাদা স্রাব ক্ষরণ, সহবাসের পর রক্তরণ হতে পারে। সাধারণত শুরুর দিকে তেমন কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না বা তলপেটে হালকা ব্যথা হতে পারে এবং গ্যাস, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা হালকা খাবারের পর পেট ভর্তি লাগা, পেটে অস্বস্তি লাগা ইত্যাদি খুব বেশি হলে তা জরায়ু ক্যান্সরের লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু যখন ক্যান্সার অ্যাডভান্সড স্টেইজে যায় তখন পেটের পিছন দিকে প্রচুর ব্যথা হতে পারে যা আস্তে আস্তে পায়ের দিকে নামতে থাকে। যখন ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে (অর্গান) ছড়িয়ে পড়ে তখন সেই অর্গান সংক্রান্ত বিভিন্ন উপসর্গও দেখা দেয়।
শনাক্তারী পরীক্ষা : পেপস স্মেয়ার টেস্ট বা প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট, এ জাতীয় ক্যান্সার সনাক্তকরণের একটি সহজ পরীক্ষা। জরায়ুমুখ থেকে রস নিয়ে অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে ক্যান্সার, ক্যান্সার হওয়ার পূর্বাবস্থা ও জরায়ুমুখের অন্যান্য রোগ যেমন প্রদাহ (ইনফ্লামেশন) শনাক্ত করা যায়। এটি একটি ব্যথামুক্ত ও সাশ্রয়ী পরীক্ষা পদ্ধতি। সাধারণত বিবাহিত নারীদের ২১ বছরের পর থেকে এ পরীক্ষা শুরু করা যেতে পারে এবং দুই বছরে একবার করে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেয়া হয়। ৩০ থেকে ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত, যাদের ফলাফল তিনবার ‘স্বাভাবিক’ এসেছে, তারা প্রতি তিন বছর পর পর এই পরীক্ষা করা উচিত। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে এ রুটিনের পরিবর্তন হতে পারে। এছাড়াও ভায়া টেস্ট বা ভায়া পরীক্ষা জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের একটি সাধারণ পদ্ধতি। এই পরীক্ষাটি সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়।
স্টেইজ বা পর্যায়সমূূহ :
স্টেইজ ০ – শুধুমাত্র জরায়ুর কোষগুলোর উপরেরস্তরে ক্যান্সার হয় ।
স্টেইজ ১ – ক্যান্সার জরায়ুর আবরণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
স্টেইজ ২ – যখন ক্যান্সার ভ্যাজাইনার উপরের ২/৩ ভাগ ও জরায়ুর আশেপাশের কোষে ছড়িয়ে পড়ে।
স্টেইজ৩ – যখন ক্যান্সার ভ্যাজাইনার নিচের ১/৩ ভাগ ও পেলভিস ওয়ালে ছড়িয়ে পড়ে।
স্টেইজ ৪ – যখন ক্যান্সার মূত্রথলি, মলদ্বার, পেলভিক গ্রন্থিসমূহ এমনকি দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসা : যদি জরায়ু ক্যান্সার প্রি ইনভেসিভ স্টেইজ (ঊধৎষু ংঃধমব) এ শনাক্ত করা যায় তবে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করে এর প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়াও বিভিন্ন স্টেইজ অনুযায়ী রয়েছে সহজ ও উন্নত মানের চিকিৎসা ব্যবস্থা। তাই যখনই কোনো উপসর্গ দেখা দিবে, দেরি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রতিরোধ :
ভ্যাকসিন – জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য Early stage দেওয়া হয়। ৯ থেকে ২৬ বছর বয়সী নারীদের ৩ টি ডোজে ৬ মাসের কোর্স করে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ দেওয়ার ১ থেকে ২ মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রথম ডোজের ৬ মাস পরে তৃতীয় ডোজ দেওয়া হয়। যদি টিকা দেওয়ার সিরিজটি বাধাগ্রস্ত হয়, তবে সিরিজটি পুনরায় আরম্ভ করার দরকার নেই। সেক্সুয়াল এক্সপোজার বা যৌন সং¯পর্শে আসার আগেই টিকা নিতে হয়। ২৬ বছর পর্যন্ত টিকা নেওয়া যেতে পারে। এরপর যদি কেউ এ টিকাটি নিতে চায়, তবে এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট করে দেখে নিতে হবে। যদি ইতিমধ্যেই সে আক্রান্ত না হয়, তবে টিকা নিতে পারবে। সচেতনতামূলক শারীরিক শিক্ষা- যেমন, সঠিক বয়সে বিয়ে; অধিক সন্তান ধারণ না করা; স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা; সঠিক মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সংক্রমণ রোধ করা। বাংলাদেশের নারীরা লোক লজ্জার ভয়ে তাদের সমস্যার কথা বলতে চান না। কেউবা আবার অবহেলা করে বা টোটকা চিকিৎসার উপর বিশ্বাস করে সময় নষ্ট করে, যার ফলে ক্যান্সার বিস্তৃতি লাভ করে এবং মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই,আর নয় লজ্জা কিংবা অবহেলা; সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমে ‘জরায়ু ক্যান্সার’ নির্মূল, নিয়ন্ত্রণ করতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজ