মেয়াদোত্তীর্ণ নকল-ভেজাল ওষুধ

প্রতিরোধে প্রয়োজন কঠোর শাস্তির বিধান

5

ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব নগর থেকে গ্রাম। তবে নগরে প্রশাসনের নজরদারীতে এ ভেজাল ও নকল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গ্রামের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। গতকালের দৈনিক পূর্বদেশে ‘ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বড় বাজার গ্রাম’ প্রকাশিত শিরোনামের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নগর বা শহর নয় এবার গ্রামের বাজারে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যের খবর। কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তৈরি ও বাজারজাত করছে নকল- ভেজাল ওষুধ। আর প্রতারিত ও বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রামের সহজ-সরল সাধারণ ভোক্তারা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবসার সিন্ডিকেটের সঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতেও এমন অভিযোগ ছিল। বাস্তবতা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের লোকজন সম্পৃক্ত না থাকলে বাজারে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রবেশ করতে পারে না।
সূত্র জানায়, গত দুইমাসে চট্টগ্রামের ৮টি উপজেলায় ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অনুমোদনহীন ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি এবং লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার অপরাধে রাঙ্গুনিয়ায় ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনুমোদনহীন ও নকল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি নকল ওষুধ বিক্রি ও লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করার অপরাধে বেশ কয়েকটি ফার্মেসিকে জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ, অবৈধ ও ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ওষুধ বিক্রির অপরাধে রাউজানে ৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। উত্তর চট্টগ্রামের দুইটি উপজেলার সীমিত এলাকায় অভিযান চালিয়ে যদি এমনটি হাল বিরাজমান দেখা যায়, পুরো চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর কি দশা-তা সহজেই অনুমেয়।
দেশে চাল-ডাল আটা-ময়দা ফলমূল থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই যাতে ভেজাল দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু ওষুধে ভেজাল বিশেষভাবে গুরুত্ব দাবি করে। কারণ মানসম্পন্ন ওষুধ যেমন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি মানহীন ওষুধ স্বাস্থ্যহানি এমনকি জীবননাশের কারণও হতে পারে। কাজেই ওষুধের মান সংরক্ষণ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্য খাদ্যপণ্যের মতো ওষুধের গুণমান ভোক্তাদের নিজেদের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয় না। এ কাজটির জন্য অপরিহার্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি। উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো- ওষুধের বাজারে নকল-ভেজাল রোধে আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা অপর্যাপ্ত।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশে নকল-ভেজাল ওষুধ উৎপাদনে ভুয়া কোম্পানি থেকে শুরু করে লাইসেন্সধারী কোম্পানি সবাই শামিল। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির পরীক্ষায় দেশের ২০টি লাইসেন্সধারী কোম্পানির ওষুধ মানহীন বলে চিহ্নিত হয়েছে। স¤প্রতি আদালত এই কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আর কত ভুয়া কোম্পানি লুকিয়ে-ছাপিয়ে কত নকল-ভেজাল ওষুধ তৈরি করছে তার কোনো হিসাব নেই। দেশের একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশের বাজারে শতকরা ১০ ভাগ ভেজাল ওষুধ বিক্রি হয়। ওষুধ প্রশাসনের তথ্য মতে, দেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কারখানার সংখ্যা ২৮১টি, ইউনানির সংখ্যা ২৬৬টি, আয়ুর্বেদিক ২০৭টি, হোমিওপ্যাথিক ৭৯টি ও হারবাল ৩২টি। এসব কারখানায় মনিটরিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্টের অভিযান চালানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। ওষুধ কোম্পানি ও ফার্মেসিগুলোর বিরুদ্ধে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ওষুধ আদালতে ৯টি, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১০টি, মোবাইল কোর্টে ৬৩৭টি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু এসব তৎপরতা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। জানা গেছে, নকল ওষুধ নামমাত্র খরচে তৈরি করা হয়। আর বিক্রেতারা ৩০-৪০ টাকায় কেনা ওষুধ ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করতে পারেন। ফলে যে বিপুল মুনাফা হয়, তার তুলনায় যে জরিমানা গুনতে হয় তা নগণ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই খাতে দুর্নীতি, আইন প্রয়োগের শৈথিল্য, প্রশাসনের নজরদারির অভাব, দুর্বল বিচার ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত অসমর্থতা, দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব ভেজাল ওষুধ বাজারজাত রোধ করতে না পারার প্রধান কারণ। অন্যদিকে, আইনে এ সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কম হওয়াও বড় কারণ। ওষুধের বাজার ভেজালমুক্ত করা খুবই জরুরি। এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষভাবে তৎপর হওয়া দরকার। ওষুধের কারখানা ও বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে আইন কঠোরও করার উদ্যোগ নিতে হবে। ওষুধ প্রশাসনের তৎপরতায় দুর্নীতি শিথিলতা রাখা যাবে না। সর্বোপরি নকল-ভেজাল ওষুধ উৎপাদক-বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার সরকারের। এই চক্র যত ক্ষমতাবানই হোক তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।