রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের আশ্বাস

প্রতিফলন দেখতে চাই

4

কূটনৈতিক সূত্রে জানতে পারি, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সরকার যাই করুক চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র সংকট সমাধানের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত না হলে এর কোন সুফল পাওয়াটা কঠিন হবে। কারণ আমরা জানি এবং প্রত্যক্ষ করছি, মিয়ানমারের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক রয়েছে চীনের। ভারতের সঙ্গেও মিয়ানমারের সম্পর্ক ভালো। পার্শ্ববর্তী দেশ হিসাবে ভারত এবং চীন এই উভয়ের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দূরের হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও চমৎকার বলা যায়। ফলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ দেশ তিনটি আন্তরিক হলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হাতের মুঠোতে চলে আসবে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জল অনেত ঘোলা হয়েছে। মিয়ানমারের সুচতুরতার আড়ালে কপটতার মুখোশ বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয়েছে। ফলে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করেছে বলে আমাদের ধারণা। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তাদের আন্তরিকতা এবং বাংলাদেশকে সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। সর্বশেষ চীন অনেকটা নির্লিপ্ত থাকলেও চীনের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তাদের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, এই সংকট সমাধানে দেশ দু’টি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী। দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছে চীন। গত শুক্রবার চীনের স্টেট কাউন্সিলর ও জননিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ঝাও কেঝি বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এসময় চীনের এ মন্ত্রী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের নাগরিকদের দ্রুত সময়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে দিতে চীনকে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার আহব্বান জানালে চীন স্বীকার করেছেন, মিয়ানমারের ১ মিলিয়ন নাগরিক এখানে থাকায় বাংলাদেশ সমস্যায় পড়েছে। স্বল্পসময়ে এতসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেয়ায় তারা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। চীনের এ মন্ত্রী মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তিগুলো যেন মিয়ানমার যথাযথভাবে পালন করে, সে বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ নেবে চীন। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার দাবির সমর্থনে চীনা মন্ত্রীর বক্তব্য ইতিবাচক। শুধু সমর্থন নয়, এই দাবি বাস্তবায়নে প্রতিবেশী দেশ ও বৃহৎ শক্তি হিসেবে চীনের সক্রিয় সহযোগিতা প্রত্যাশা করি আমরা। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সচিবালয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নিরাপত্তাবিষয়ক তিনটি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। বৈঠকে রোহিঙ্গা, ভিসা, জননিরাপত্তা, আঞ্চলিক শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিষ্পেষণ চলে আসছে কয়েক দশক ধরে। সর্বশেষ গত বছর ২৫ আগস্টের সেনা অভিযানের মুখে সেখান থেকে পালিয়ে প্রায় ৬ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ করে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এখনও হচ্ছে। এর আগে থেকেই কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে আরো চার লাখের অধিক রোহিঙ্গা। সব মিলে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের এমন মানবিক বিপর্যয়ে জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংঘ, সংস্থা এবং বিশ্বের বহু দেশ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারা সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায়। বাংলাদেশ মানবিক কারণে এদের আশ্রয় দিয়েছে, যদিও আশ্রিতের চাপ বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় রকমের বিরূপ প্রভাব ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের এই বড় সংকটের সময়ে নিকটতম প্রতিবেশী এবং বন্ধুপ্রতিম দেশ চীন সেরকম জোরালো কণ্ঠ না থাকা দেশবাসীর মনে যে হতাশা তৈরি করেছে, তা বলাই বাহুল্য। চীনের স্টেট কাউন্সিলর ও জননিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ঝাও কেঝি বাংলাদেশ সফর তাই বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সফরকালে চীনা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে তার দেশের অবস্থান তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পক্ষে মন্ত্রীর বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই।