প্রতিটি দিন যদি ঈদের দিন হতো!

মোহাম্মদ আবদুস সালাম

23

ঈদ বিশ্ব মুসলিমদের আনন্দের উৎসব, প্রাণের উৎসব। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমান সমাজ এই দিনটির অপেক্ষায় থাকে। ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবাই এই দিনে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে এই উৎসব জাতীয় উৎসবে পরিণত হতে চলেছে। ঈদ উৎসবকে ঘিরে নানা আয়োজন চলে পুরো রমজান মাস জুড়ে।
মূলত এই উৎসব মসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও পর্যায়ক্রমে তা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। বছরের এই দিনকে ঘিরে দেশে ও দেশের বাইরে থাকা বাঙালি মুসলমানেরা দেশের গ্রামে কিংবা শহরে এসে একই স্থানে মিলিত হওয়ার সুযোগ লাভের প্রত্যাশায় থাকে। ব্যস্ততম জীবনে ঈদের দিনে এই মিলনের মুহূর্ত অবশ্যই সুখকর ও আনন্দের। এতে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে নৈকট্য লাভ ও বন্ধনের সম্পর্কটা আরো সুদৃঢ় হয়। পরিবার ছাড়াও এই ঈদে ছেলে মেয়েদের শ্বশুর বাড়ির লোকদের বিশেষ করে শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, দেবর কিংবা শ্যালক-শ্যালিকাদের জন্য জামা-কাপড়, ঈদ সেলামীসহ নানা আয়োজনের ব্যবস্থা থাকে। এতে একদিকে যেমন আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, অপরদিকে সামাজিক বন্ধন আরো গভীর থেকে গভীরতর হয়। পুরনো অনেক স্মৃতি উকি দেয় মনের কোণে, ভালোবাসার মহিমা আরো প্রসারিত হয়।
মুসলমানদের সমাজে প্রাণ খুলে আনন্দ করার রেওয়াজ দীর্ঘ দিনের। কিন্তু সঙ্কোচ আর দ্বিধার কারণে তা মাঝে মধ্যে বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে। তাই সরস ও সচেতন মনের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে ইসলামধর্মে ঈদ উৎসবের আনন্দকে উৎসাহিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মদ এনামুল হক বলেছেন “মুসলমানদের মধ্যে পরবের সংখ্যা নিতান্তই অল্প; আবার তাহাতে আনন্দ উৎসব করার বিশেষ ঘটা নাই। কিন্তু তাই বলিয়া, ইসলাম মানুষের আনন্দের দিক টুকুকে যে একেবারে বাদ দিয়েছে তেমন নহে, ইসলামে ঈদ নামক পর্ব দিন দুইটিই তাহার জ্বলন্ত নিদর্শন।” তবে আমরা দেখি এই ঈদ উৎসবে আনন্দের সাথে পবিত্রতার ভাবেরও কমতি নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কেবল আনন্দের ভেতর যদি মূল্যবোধ, মানবিকতা ও একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা না থাকে তাহলে পুরো আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবারসমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়।
ইসলাম ধর্ম সর্বজনীন এবং পৃথিবীর বহুদেশে এই ধর্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হয়ে আসছে। এছাড়া এই ধর্ম এখন এক বিশ্ব মানবিক ধর্মে পরিণত হয়েছে। ফলে ঈদ উৎসবকে ঘিরে দেশে যেমন আয়োজনের উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়, তেমনি দেশের বাইরেও এই দিনটিকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলে।
ভারতীয় উপমহাদেশে মোঘলরাই ঈদ উৎসবকে বেশি পরিচিত দানে সহায়তা করেছে বলে ধারণা করা হয়। ইতিহাসবেত্তারা মনে করেন, বাংলাদেশে মুঘলদের আগমন বা তার আগে ঈদ উৎসবের তেমন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে সেই সময়ে যারা অভিজাত বলে দাবি করতেন তারাই কেবল ঈদ পালন করতেন। সুলতানী আমলে সুলতানরা রমজান মাসে মসজিদে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনার খোলা জায়গায় ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা করতেন। এজন্য প্রয়োজন হলে প্রচার বাহক নিযুক্ত করতেন। আর ঈদে নামাজ পড়ার জন্য বিশেষ ইমাম নিয়োগের ব্যবস্থাও করতেন। গ্রাম কিংবা শহরের ব্ইারে বিশাল উন্মুক্ত এলাকা বেছে নিতেন ঈদের বিশেষ নামাজ আদায় করার জন্য। বিশাল নামাজ আয়োজনের এই ব্যবস্থার জায়গাকে ‘ঈদগাহ’ বলা হতো।
এখনো সুলতানী আমলের সেই চিহ্ন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলা উপজেলায় রয়েছে। কিশোর গঞ্জের শোলাকিয়া থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ ময়দান পর্যন্ত এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশের গ্রামে, শহরে ঈদ উৎসবের একটি স্বাভাবিক প্রথা ছিল ঈদের দিনে ঈদের নামাজ পড়ে সবাইকে পায়ে ধরে সালাম করা। বিশেষ এই রেওয়াজকে ‘কদমবুসি’ বলে। এই রেওয়াজ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। অপেক্ষাকিত বয়োকনিষ্টরা গুরুজনদের এভাবে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কিছু সেলামীও পেতো। মূলত সালাম আর সেলামীর সম্পর্কটা আনন্দদায়ক ছিল বলে কেউ কিছু মনে করতো না। যাকে কদমবুসি বা সালাম করা হতো তিনি যে সালাম করেছে তার হাতে কিছু নগদ অর্থ তুলে দেয়ার চেষ্টা করতেন। এ প্রথা এখনো টিকে আছে।
ঈদের দিনে গ্রামে গঞ্জে দল বেঁধে ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়ায়। বিবেদ ভুলে সবাইকে আপন করে নেয়ার মনমানসিকতায় আমরা সবাই তখন আপন জনের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করি। রঙিন ও নতুন জামা কাপড় পরিধান করে ছোট-বড়, ধনী-গরীব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে এসে সামিল হওয়ার এই বাসনা মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধনকে সমুন্নত রাখে। এদিক থেকে ঈদ উৎসব সামাজিক বন্ধনের অন্যতম প্লাটফর্ম।
নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের সামর্থ অনুযায়ী সবাই ঈদের কেনাকাটা করার চেষ্টা করে। ফলে ঈদকে ঘিরে অর্থনৈতিক দিকটিও বেশ বড় আকারের হয়ে থাকে। ঈদ উৎসবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সঙ্গে মূল্যবান ও সৌখিন দ্রব্যাদিরও ব্যবহার রয়েছে। তাই ঈদ উল ফিতরকে মাথায় নিয়ে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক ভাবটি বেশ চাঙ্গা হতে দেখা যায়। দেশের ভিতরের অর্থনীতিও এর ব্যতিক্রম নয়। নতুন জামাকাপড়, নতুন যানবাহনে করে বাড়ি ফেরা, সাজসজ্জার উপকরণ, বিশেষ খাবার এসব কিছুতে নতুন অর্থের যোগান দিতে গিয়ে অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ সময়ে বেশি আর্থিক লেনদেন ঘটে। মানুষও তখন অধীক পরিশ্রমে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেনে বাংলাদেশের সামষ্ঠিক অর্থনীতির উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায়। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের কোথাও কোথাও ‘ঈদ বাজার’ নামে বিশেষ বাজারের ব্যবস্থাও করা হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে ঈদের বাজারে দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টাটা চোখে পড়ার মতো।
ঈদ উৎসবকে ঘিরে বর্তমান বাংলাদেশে কোথাও কোথাও ‘ঈদ পুণর্মিলনী’ নামে একটি নতুন রেওয়াজ চালু হয়েছে। এই পুণর্মিলনীতে নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়াসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। পাড়ায় পাড়ায়, অফিস-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিকিংবা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে এই ‘ঈদ পুণর্মিলনী’ অনুষ্ঠানটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঈদের ‘আনন্দ মেলা’ এক সময়ের খুব জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠানগুলোর অন্যতম ছিল। বর্তমানে টিভি চ্যানেল বেশি হওয়ায় এই অনুষ্ঠান আর আগের মতো দর্শক ধরে রাখতে পারছে না। আনন্দ মিছিল ও কোথাও কোথাও ঈদ মেলা এখনো অনুষ্ঠিত হয়। এসব আনুষ্ঠানিকতা ঈদের মাহাত্ম্যকে মহিমান্বিত করে তোলে।
ঈদের উৎসব এদেশের মুসলমানের প্রাণের উৎসব। তাই এই উৎসব ধীরে ধীরে জাতীয় উৎসবের আদলে হতে শুরু করেছে। ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করতে ঈদ উৎসব ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। শত্রু-মিত্রকে এক করে দেয়ার সুযোগ করে দেয়। বৈরীভাব দূর করে। সবচেয়ে বড় কথা ঈদ মানে আনন্দ। এক নির্মল আনন্দের জগৎ তৈরিতে বাঙালি সমাজে ঈদের কোন বিকল্প নেই। তাই বলতে ইচ্ছে করে- প্রতিটি দিন যদি ঈদের দিন হতো !