প্রতিক্রিয়া

46

হাসপাতাল বন্ধ দায়িত্বশীল আচরণ নয়
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ করে দেওয়া কখনো দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। এটি আসলেই অত্যন্ত দুঃখজনক। যে অন্যায় করবে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অন্যায়কে ঢাকার জন্য এটাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা মোটেও উচিত নয়। এতে ভুল বোঝাবুঝির মাত্রাটা বেড়ে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ জনগণ। জনগণের ভোগান্তির এ দায়ভার নিবে কে?
সিটি মেয়র আরও বলেন, নগরীতে সাংবাদিক এবং ডাক্তার যেভাবে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন সেটা কারোর জন্য কল্যাণকর নয়। এতে ভুল বোঝাবুঝির মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। সঠিক বিশ্লেষণ করে দু’পক্ষরই দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। কেউ অন্যায় করলে সেটাকে পুঁজি করে সবদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার কোনো মানে হয় না। আর নিজের পেশাকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করলে একসময় জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাইভেট মেডিকেল থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ সেবা নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে চলে। তারা যদি নিয়ম বহিভূর্ত কিছু করে তাহলে তাদের কর্তৃপক্ষ শোকজ করবে। সময় দিবে শোধরানোর জন্য, না শোধরালে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হুট করে অভিযান পরিচালনা বা হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে তো সমস্যার সমাধান হবে না।

সেবা বন্ধ করা
কোনোভাবেই
গ্রহণযোগ্য নয়
চবি উপাচার্য ড. ইফতেখার

কোনো কিছুর বিনিময়ে সেবা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষকদের পেশা মানবিক। এসব পেশায় অবশ্যই সেবার মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে। সেবা দেওয়াটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেখানে জীবন-মরণের প্রশ্ন, সেখানে
কোনো কিছুর বিনিময়ে তা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। সেবা দিতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা ভিন্ন বিষয়। সেটা একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমঝোতা বা সমাধান করতে হবে।
র‌্যাবের অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এখতিয়ার রয়েছে অভিযান করার। কোনো কারণে যদি দেশবিরোধী কার্যক্রম বা কোনো অনিয়ম হয় সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে পারে। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ঠিক হবে না। অনিয়মের পক্ষে কারো অবস্থান নেওয়া উচিতও না। আমার মনে হয় এখানে যোগাযোগের বিচ্যুতি আছে। কেউ উদ্যোগ নিলে সেটা সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, জনগণকে সেবাবঞ্চিত করে কোনো আন্দোলন হতে পারে না। এটা নৈতিকতায় পড়ে না। সত্যিকার নৈতিকতা থাকলে অবশ্যই মানুষকে সেবা দিতে হবে। সেবা না দেওয়াটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমি ডাক্তারদের অনুরোধ করবো জনগণের ভোগান্তি কমানোর জন্য। আন্দোলন করুক, আন্দোলন হতে পারে। কিন্তু সেটা জনগণের ভোগান্তির জন্য হতে পারবে না। প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে ভিন্ন। প্রতীকী প্রতিবাদ হতে পারে।

এ ধরনের কর্মসূচি
প্রকৃত পেশাজীবীর
আচরণ নয়
প্রফেসর সেকান্দর খান

ইস্ট ডেল্টা ইউনির্ভাসিটির ভিসি প্রফেসর সেকান্দর খান বলেছেন, হাসপাতালগুলোতে সরকারের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা উচিত ছিল, মনিটরিং কার্যক্রম চালানো উচিত ছিল। সিভিল সার্জন আছেন, ওনারা করেন কি? নিয়মিত পরিদর্শন করা, যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা সেটা দেখা, এটা আসলে খারাপ কিছু না। তবে সবগুলো
একসাথে হওয়াতে সমস্যা হয়েছে। এতো বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো। সরকার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসতে চেষ্টা করছে। এটা আরো আগে হওয়া উচিত ছিল। বারবার এমন কর্মসূচিতে সরকারের নিরব থাকায় তারা আস্কারা পেয়েছে। আগে থেকেই সরকারের শক্ত অবস্থান থাকা প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, লাইসেন্স নিয়ে সমস্যা ঠিক করার জন্য একটা নির্ধারিত সময় দেওয়ার দরকার। এ সময়ের মধ্যে তাদের সবকিছু ঠিক করা উচিত ছিল। এখন একটা ঘটনার পর তৎপরতা বেড়ে যাওয়াতে এমনটা হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে জিম্মি করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আগোরা স্টোরে অভিযানের পর তারা একজোট হয়ে চেইনশপ বন্ধ করার ডাক দেয়। কিন্তু তাদের জিনিসগুলো মার্কেটে পাওয়া যায়। যার কারণে তারা সেটা থেকে পরে সরে আসে। বিএমএ যেহেতু শক্তিশালী ও জোটবদ্ধ, তাই তারা শক্তি দেখায়। তবে এমন কর্মসূচি কোনো পেশাজীবীর সত্যিকারের আচরণ হতে পারে না। এটা দুঃখজনক। তারা জনসাধারণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। অন্যায় হলে কোর্টে যাবে। কিন্তু তাদের সমস্যা আছে বলেই তারা কোর্টে যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, একজনের উন্নয়ন অন্যজনের উন্নয়নকে সহযোগিতা করে। র‌্যাবের অভিযানে অন্যায় হলে সেটার বিরুদ্ধে তারা আইনগত ব্যবস্থায় যেতে পারে। অভিযানগুলো নিয়মিত হলে হাসপাতালগুলোতে সমস্যা থাকতো না। মানসম্মত করার ব্যবস্থা করলে ক্ষতি কি? নিয়মিত র‌্যাবের অভিযান দরকার। তদারকি জোরদার হওয়া প্রয়োজন।
প্রফেসর সেখান্দর খান বলেন, ডাক্তাররা এলিট সোসাইটির মানুষ। ক্লিনিকগুলো বাণিজ্য করে। দুঃখ লাগে, এলিট সোসাইটির লোকগুলো কিভাবে বণিকদের সাথে একত্রিত হয়?

অভিযানের কারণে
কখনও হাসপাতাল
বন্ধ হয়নি
জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেছেন, হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মোবাইল কোর্টের অভিযান আগেও হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু আগে তো কখনও কোন হাসপাতাল চিকিৎসা সেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়নি। তাহলে এবার কেন বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দিল?
আসলে মুশকিলটা হয়েছে ‘বিশেষ পরিস্থিতি ও সময়ের’ কারণে। এমনিতেই গত বেশ কয়েকদিন ধরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিকের শিশুকন্যার অনাকাংখিত মৃত্যুকে ঘিরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দুটি পেশাজীবী সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন অব্যাহত রেখেছে। নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও তাতে এখন পর্যন্ত সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। এমন পরিস্থিতি চলমান থাকাবস্থায় ওই বেসরকারি হাসপাতালসহ কয়েকটিতে মোবাইল কোর্টের অভিযানকে মালিকরা স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিতে পারে নি। আরেকটা ব্যাপার হল, মোবাইল কোর্ট কিন্তু আমরা মানে জেলা প্রশাসন পরিচালনা করিনি। এটি ঢাকা থেকে সরাসরি এসে পরিচালনা করা হয়েছে। সাধারণত ঢাকা থেকে কোন সংস্থা এসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও আগে জেলা প্রশাসককে জানানো হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। দুপুরের দিকে বিষয়টি আমি জানার পর অফিসে আসা ফ্যাক্সগুলো ঘেঁটে দেখলাম, সকাল দশটার দিকে এ সম্পর্কিত একটা ফ্যাক্স এসেছে। কিন্তু, ততক্ষণে অভিযান থেকে শুরু করে হাসপাতাল বন্ধের ঘোষণাও অলরেডি মানুষের কানে চলে এসেছে।
আমি বিষয়টি নিয়ে দুপুর থেকেই চিকিৎসকদের বিভিন্ন লেবেলে কথা বলেছি। ঢাকায় স্বাস্থ্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। এমনকি, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেও উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অনেক রোগী ভর্তি আছে। তারা চিকিৎসা সেবা না পেলে তো মুশকিল হয়ে যাবে। তাই আমি সকলের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে অন্ততপক্ষে হাসপাতাল বন্ধের ঘোষণা প্রত্যাহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, কালকের (সোমবার) মধ্যে একটা সমাধানে আমরা পৌঁছাতে পারব।

হাসপাতাল
বন্ধের ঘোষণা
অমানবিক
অ্যাডভোকেট ইফতেখার

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেছেন, যে কারণেই হোক না কেন, চিকিৎসার মত বিকল্পহীন ও জরুরি সেবা বন্ধের ঘোষণা এক কথায় অমানবিক। এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কেননা, চিকিৎসার সাথে মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিষয় সম্পর্কিত।
তিনি পূর্বদেশকে বলেন, মোবাইল কোর্টের অভিযান কিংবা অন্য কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি আমাদের সম্মানিত চিকিৎসকরা নিগৃহীত বা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন, তাহলে দেশের সব নাগরিকের মতই আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া, এভাবে হুট করে হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত না নিয়ে তারা কয়েকদিন সময় বেধে দিয়ে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরতে পারতেন। ওই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে হাসপাতাল বন্ধের মত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন বলে আল্টিমেটাম দিতে পারতেন। আরও অনেক বিকল্প তাদের সামনে রয়েছে। সেই পথগুলো ধরে তারা হাঁটতে পারতেন। এখন তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে জনমত তাদের বিরুদ্ধে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আইনজীবী ইফতেখার সাইমুল আরো বলেন, আমি সম্মানিত চিকিৎসকদের আহবান জানাচ্ছি, মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে- এমন সিদ্ধান্ত থেকে তারা যেন সরে আসেন। প্রয়োজনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ভেন্যুতে ডেকে তাদের বঞ্চনার কথাগুলো বলুক। তাদের ওপর অন্যায়-অবিচার হয়ে থাকলে, তা সকলের সামনে তুলে ধরুক। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করুক। সেটাই হবে উত্তমপন্থা। মনে রাখতে হবে, অন্য পেশায় ভুল করলে আপিলের সুযোগ আছে। কিন্তু চিকিৎসক তার চিকিৎসায় ভুল করলে রোগীর নিশ্চিত ঠিকানা হল কবর। দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তারা চিকিৎসক হচ্ছেন। তাই দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা অন্য যে কোন পেশাজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি। তাই কোনভাবেই চিকিৎসা সেবা বন্ধ বা রোগীদের জিম্মি করা কাম্য হতে পারে না।