বিজয় ফুল প্রতিযোগিতা

প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে রাখবে বিশেষ ভূমিকা

এমরান চৌধুরী

7

স¤প্রতি স্কুল পর্যায়ে বিজয় ফুল প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম একদিকে যেমন হাতে কলমে ফুলটি তৈরি করতে শিখছে, সে সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে হাসিমুখে গ্রহণ করছে অনেক পুরস্কার, যে পুরস্কার তাদের নিজেদের ভেতর সৃজনশীলতার বীজ বুনে দিচ্ছে, আগ্রহী তুলেছে সৃজনশীল কর্মকাÐে। অন্যদিকে তাদের অবচেতন মনে উদয় হচ্ছে নানান প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তর তাদের জানতে দেওয়া হয়নি। জানার পথে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল নানা কণ্টক।
স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে তিন মাসের মাথায় জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশে শুরু হয় ইতিহাসের চাকাকে উল্টো ঘুরানোর অশুভ প্রয়াস। শুধু তাই নয় রাতারাতি পাল্টিয়ে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী সেøাগান জয়বাংলাকে। জয়বাংলার পরিবর্তে আসে পাকিস্তানি প্রেতাত্মার ধ্বনি জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রাখা হয় রেডিও বাংলাদেশ। তারপর দীর্ঘ একুশ বছর অফিস আদালত, হোটেল রেস্তোরাঁ কোথাও উচ্চারণ করতে দেওয়া হয়নি জাতির পিতার নাম। শুধু তাই নয় পত্র পত্রিকা, বইপুস্তক, সাহিত্য সংস্কৃতি কোথাও বঙ্গবন্ধুর নাম লেখার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। সিনেমা সøাইডে যেখানেই ছিল বঙ্গবন্ধুর নাম বা ছবি সেখানেই অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাঁর নামটি ছবিটি মুছে ফেলার ঝাপসা করার প্রাণান্তকর অপপ্রয়াস চালানো হয়। বই পুস্তকে নানা চলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে তুলে ধরা হয় বিকৃত ইতিহাস। ফলে দীর্ঘ একুশ বছর আমাদের নতুন প্রজন্ম জানতে পারেনি ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস। কিন্তু ঘাতকেরা জানত না সত্যকে বেশিদিন চাপিয়ে রাখা যায় না, যেমনটি রাখা যায় না সূর্যের আলোকে। সত্য সূর্যের আলোর মতোই সামনের অমানিশা ছাড়িয়ে একদিন না একদিন প্রকাশিত হবেই।
স্বাধীনতার আট চল্লিশ বছর পর সরকার কোমলমতি শিশুদের কাছে একটি ফুলের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। দেরিতে হলেও এ ধরনের প্রতিযোগিতা আমাদের শিশুদের আমাদের গৌরবময় ইতিহাস জানতে আগ্রহী করে তুলবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এ প্রতিযোগিতার নাম বিজয় ফুল। এ প্রতিযোগিতাটি একদিকে যেমন নতুন সে সাথে বেশ তাৎপর্যবহ। কারণ, প্রথমত এটি তৈরি হবে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলার আদলে। দ্বিতীয়ত এটির ভেতরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুটো অনিবার্য উপাদান। তৃতীয়ত এটি এমন এক মাসকে সামনে নিয়ে আয়োজন করা হয় যে মাসের নাম বিজয়ের মাস আর ফুলটির নাম বিজয় ফুল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, ত্রিশ লক্ষ মানুষের অকাতরে রক্তদান আর হাজার হাজার মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি পাকিস্তানি হায়েনার বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় বিজয়। সেই বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বিজয় ফুলের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবহ। বিজয় ফুল বানাতে গিয়ে আমাদের কোমলপ্রাণ শিশুকিশোররা জানতে পারবে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূলে কী ছিল এবং কে ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক।
বিজয় ফুল একটি প্রতীকি ফুলের নাম। এটি কোনো গাছে ফোটে না কিংবা এ নামে বাংলাদেশে বা পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো ফুল গাছ নেই। এটি তৈরি করতে হয় একটি নির্দিষ্ট নিয়মে। গত বছর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক নির্দেশনায় বিজয় ফুলের বিষয়বস্তু ও গঠন সম্পর্কে দেশের স্কুল, কলেজ ও মাঠ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। আমাদের কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীরা যাতে বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে পারে এবং আনন্দের সহিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে সেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘“জাতীয় ফুল শাপলাকে বিজয় ফুলের প্রতীক বিবেচনা করে বিজয় ফুল তৈরি করতে হবে। বিজয় ফুলের ছয়টি পাপড়ি থাকবে যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাকে স্মরণ করবে। বিজয় ফুলের মাঝে একটা কলি থাকবে যা পাপড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়ে (৬+১=৭) তাঁর ৭ মার্চের ভাষণকেও স্মরণ করবে”।
বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলনে ছয় দফার রয়েছে একটি অনন্য ভূমিকা। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পথ ধরে ৭ মার্চের ভাষণ রচনা করেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। এ কারণে বিজয় ফুলে ছয়টি পাপড়ি ও একটি কলি বেছে নেওয়া হয়েছে। ফুলটি দেখলে মনে হবে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফুলের কলি হয়ে ফুটে আছেন। বিজয় ফুল তৈরি করা যাবে কাগজ, কাপড়, প্লাস্টিকসহ যে কোনো সামগ্রী দিয়ে। বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে বিজয় ফুল প্রতিযোগিতা। প্রথম পর্ব স্কুল পর্যায়ে, ২য় পর্ব উপজেলা পর্যায়ে, ৩য় পর্ব জেলা পর্যায়ে এবং চতুর্থ পর্বে বিভাগীয় পর্যায়ে বিজয় ফুল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। এ পর্যায়ে যারা বিজয়ী হবে তাদেরকে মহান বিজয় দিবসে পুরস্কৃত করা হবে।
আমাদের দেশে বিজয় ফুলের ধারণা এ প্রথম হলেও পৃথিবীর অনেক দেশেই তা চালু আছে অনেক আগে থেকেই। বাংলাদেশে বিজয় ফুলের ধারণাটি প্রথম প্রকাশ করেন কবি শামীম আজাদ। তিনি ১৯৯৮ সালে তাঁর একটি লেখায় ধারণাটি প্রথম তুলে ধরেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর বেলজিয়ামের প্রাণহীন মাটিতে প্রথম ফুটেছিল পপিফুল। সে থেকেই শুরু হয় মহাযুদ্ধের স্মারক টুকটুকে লাল কাগজের পপি বিক্রি আর বিক্রয়লব্ধ অর্থে মৃত সৈনিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা। প্রথমে ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশে এ কর্মসূচি চালু থাকলেও পরে তা বিস্তৃত হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ব্রিটেনের ৩৯টি স্হানে বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কর্মসূচি পালিত হয়। ব্রিটেনের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইতালি, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পালিত হয় এ কর্মসূচি। হাতে তৈরি এ পপি ফুল বিক্রয় করে এক কানাডিয়ান মহিলা মৃত সৈনিকদের সন্তানদের জন্য প্রথম ক্রিসমাস উপহার কিনেছিলেন। ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা ও বেলজিয়াম প্রতিবছর ১১ নভেম্বর তাদের বীর শহীদদের স্মরণে পালন করে রিমেমব্রোস ডে। যে সব যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে মারা গেছেন তাদের স্মরণে সবাই নিজ নিজ পোশাকে লাল পপিফুল পরে থাকে।
বিজয় ফুল আমাদের বিজয়ের প্রতীক। একাত্তরের ডিসেম্বরের রক্তে ঝরা দিনে কোথাও কোনো গাছে কোনো লাল রঙের ফুল ফুটেছিল কি না সেটা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য এ ডিসেম্বরেই ফুটেছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ফুল। পতাকার ঘন সবুজের মাঝখানে যে রক্তের মতো লাল সূর্য উঠেছিল তারই প্রতিরূপ আজকের বিজয় ফুল। এ ফুল কাগজে তৈরি হলেও এর প্রতি পাপড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের গৌরবের ইতিহাস। যে ইতিহাস রচিত হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। আর তাই স্বাধীনতার সে সব বীর শহীদদের স্মরণে পপি ফুল বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ যেমন যুদ্ধাহত যোদ্ধা বা তাদের পরিবারকে তুলে দেওয়া হতো। ঠিক তেমনি আমরাও পারি বিজয় ফুল বিক্রয় করা অর্থ কোনো অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে তুলে দিতে। হোক তা সামান্য কিন্তু ভালোবাসার মাপকাঠিতে তা হবে অসাধারণ, অনন্য।
বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি, যা জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ। এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যখন নিজেদের হাতে বিজয় ফুল তৈরি করবে তখন তাদের মনে অবশ্যই নানা প্রশ্নের জন্ম নেবে। কেন এই বিজয় ফুল? কেন তার ছয়টি পাপড়ি, একটি কলি। ছয় দফা কী। বঙ্গবন্ধু কেন ৭ মার্চ ভাষণ দিয়েছিলেন? তাঁর সেই ভাষণ কেন এত স্মরণীয় হয়ে আছে? নিজেদের মনে এ সব প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি তারা খুঁজতে চেষ্টা করবে এ সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর। এখানেই সার্থকতা বিজয় ফুল প্রতিযোগিতার। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যত বেশি বিজয় ফুল তৈরিতে উৎসাহী হবে ততই শাণিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমরা পাব দেশপ্রেম আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমৃদ্ধ একটি নতুন প্রজন্ম। আর তা পেতে হলে আমাদের মানুষ গড়ার কারিগরদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে আমরা সে প্রত্যাশা করতে পারি।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক