প্রকৃত বন্ধু

মোহাম্মদ অংকন

14

নদী পার হলেই একটি ঘন জঙ্গল দেখা যায়। আশেপাশে কোনো গ্রাম কিংবা বাড়িঘর নেই। আর সেই ঘন জঙ্গলে বাস করে এক হরিণ ও এক শেয়াল। তাদের মধ্যে চমৎকার বন্ধুত্ব। তারা প্রতিদিন বিকালবেলা নদীটির পাড়ে আসে। শেয়াল নদী থেকে কাঁকড়া ধরে আর হরিণ নদীর পাড়ের কচিকচি দূর্বাঘাসগুলো আহার করে। নদীর পাড়ে যেতে যেতে হরিণ ও শেয়ালের জম্পেস কথা-বার্তা চলে। তাদের মাঝে যেন আনন্দ উল্লাসের জুড়ি নাই। তবে সেদিন হরিণটি দুঃখ করেই বলছিল, ‘শোনো বন্ধু, আমরা রোজ নদীর পাড়ে যাই। কিন্তু ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। তুমি কাঁকড়া খুঁজতে খুঁজতে যখন অনেক দূরে চলে যাও, তখন আমার অনেক ভয় লাগে। যদি নৌকাপথে কোনো মনুষ্য শিকারী আমাকে আক্রমণ করতে আসে, তাহলে আমি তো রেহাই পাব না। আমি শুনেছি, হরিণের মাংস শিকারীদের খুব প্রিয়। এটি খেতে তাদের কাছে সুস্বাদু লাগে। সত্যি যদি আমাকে কোনো শিকারী এসে ধরে নিয়ে যায়, তাহলে তুমি যে একা হয়ে যাবে?’
হরিণের কথাগুলো শুনে শেয়াল ভয় পেয়ে যায়। সে নিজের চিন্তা করে না। কেননা, মাংসের জন্য তাকে কেউ কখনও শিকার করবে না। শেয়ালের মাংস খাওয়া যায় না। শেয়ালের ভয় তার বন্ধু হরিণকে নিয়ে। ‘শোনো বন্ধু, নদীর পাড়ে আসা সত্যি আমাদের জন্য অনিরাপদ। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর তো আমরা পর্যাপ্ত খাবার পাই না। তুমি না হয় গাছের সবুজ পাতা খেয়ে থাকলে; কিন্তু আমি কি করব? আর এখন তো বনে পাখপাখালিও পাই না যে তা দিয়ে কোনো মতে দিনাতিপাত করব। বেঁচে থাকতে হলে আমাদেরকে নিরাপত্তা বজায় রেখে এখানে আসতেই হবে।’
‘হ্যাঁ বন্ধু, তুমি ঠিকই বলেছ। আমাদেরকে বুঝে শুনে নদীর পাড়ে আসতে হবে। কখন কোন বিপদ ঘটে তা তো আর আগে থেকে বলা যায় না।’
সে অনেক দিন পরের কথা। তখন শরৎকাল চলছিল। নদীর পানি কমে যেতে থাকে এবং নদীর পাড়ে সবুজ সবুজ ঘাস জন্মাতে থাকে। আর এসবের খবর পেয়ে দুই বন্ধু হরিণ ও শেয়াল নদীর পাড়ে চলে আসে। শেয়াল আগের মত কাঁকড়া খুঁজতে খুঁজতে একটু দূরে চলে যায়। বেশ কিছু কাঁকড়ার সন্ধান পেয়ে সেগুলো সে মজা করে খেতে থাকে। অপরদিকে হরিণও সবুজ কঁচিকঁচি ঘাসগুলো মজা করে খেতে থাকে। কিন্তু হরিণের পূর্বের আশঙ্কা অনুযায়ী সে শিকারীর খপ্পরে পড়ে যায়। চলন্ত নৌকা থেকে একজন শিকারী তাকে তাক করে গুলি ছোঁড়ে। গুলিটি হরিণের পেছনের পায়ে লাগে আর সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলির শব্দ শুনে বন্ধু শেয়াল বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে।
‘বিকট শব্দ হল। আমার বন্ধু হরিণ কী তাহলে সত্যই আজ বিপদে পড়ল? না, ওর কিছু হলে আমি সইতে পারব না।’
এমনটা বলতে বলতে শেয়াল হরিণের নিকট দৌঁড়ে আসে। দৌঁড়ে এসে শেয়াল যা দেখে তা তার ভাবনার সাথে সাথে একদম মিলে যায়। কিন্তু পরক্ষণে যা দেখে তা আরও বিপদের। শেয়াল দেখতে পায়, নৌকা থেকে শিকারীগুলো হরিণের দিকে ছুটে আসছে। সে খুবই বিচলিত হয়ে যায়। ভাবতে থাকে, আজ বুঝি তার আহত বন্ধুকে ওরা নিয়েই যাবে। তার ভেতরে হতাশা কাজ করতে থাকে। বন্ধুকে বাঁচাতে কী করবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শুধু আহত হরিণকে সমবেদনা জানাতে থাকে। কিন্তু হরিণের আর্তনাদ তার অন্তরে আঘাত হানে। তার কান্নার শব্দ কানে গিয়ে লাগে।
কয়েক মিনিট অতিক্রম হতেই মনুষ্য শিকারী দল প্রায়ই হরিণ ও শেয়ালের কাছে চলে আসে। তখন বিচলিত শেয়াল চিৎকার করতে থাকে।
‘হুক্কা হুয়া, হুক্কি হুয়া, তোরা কে কোথায় আছিস, আমাদেরকে রক্ষা কর। আমাদেরকে মেরে ফেলল। হুক্কা হুয়া..!’
ঠিক সে সময় এ বনের রাজা সিংহমশাই ঘুরে ফিরে বনরাজ্যটি দেখছিল। হঠাৎ শেয়ালের চিৎকারের তীব্র আওয়াজ তার কানে যায়। বন্যরাজ সিংহ বুঝতে পারে, তার রাজ্যে হয়তো কোনো প্রজা বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সোজা নদীর পারে ছুটে আসে। এবং হরিণ ও শেয়ালকে দেখে তাদের বিপদের কারণ বুঝতে পারে। তারপর সে তার সৈন্য-সামন্তদের প্রতিবাদ করার হুকুম দেয়। তারা সবাই একত্রে গর্জন করতে থাকে। ‘চি-হি, চি-হি..!’ সিংহদের এমন গর্জনের আওয়াজ ঐসব মনুষ্য শিকারীদের কানে যায় এবং তারা পথে থমকে দাঁড়ায়।
এক শিকারী আরেকজনকে বলে, ‘বন্ধু, আমাদেরকে বোধহয় হরিণ আনতে যাওয়া ঠিক হবে না। ঐ দেখ, সারি সারি সিংহদল দাঁড়িয়ে আছে। ওরা আমাদেরকে ধরে খামচে মারবে।’
অপর এক শিকারী পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বলে, ‘হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। সামনে আমাদের বিপদ। চলো দ্রুত নৌকায় চলে যাই। নইলে সিংহদের থাবায় নির্ঘাত মৃত্যু হবে।’
এভাবেই শিকারী ধরতে এসে নিজেরা সিংহের শিকার হওয়ার ভয়ে তারা জঙ্গল ছেড়ে চলে যায়। সিংহ রাজা বলে, ‘শেয়াল, এখন আমরা বিপদমুক্ত। তুমি তোমার বন্ধুকে নিয়ে বাসায় দ্রুত ফিরে যাও। এবং ওর সেবা যত্ন করতে থাকো। আর তামার বন্ধুকে বাঁচাতে চিৎকার করে আমাদেরকে অবগত করে ডেকে আনার জন্য তোমাকে আমি পুরস্কৃত করব। কেননা, তুমি একজন প্রকৃত বন্ধু। হরিণের বিপদ দেখে পালিয়ে যাও নাই। হরিণ সুস্থ হলে আমার রাজ দরবারে এসো তোমরা। আমরা এখন চলে যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, জঙ্গলের বাহিরে বেশি ঘোরাফেরা করিও না। বিপদ বলে কয়ে আসে না।’
সিংহ তার দলবল নিয়ে নদীর পাড় থেকে চলে যায়। আহত দেহ নিয়ে হরিণ পড়ে থাকে। ‘বন্ধু, তোমাকে সুস্থ করতে বাসায় নিয়ে যেতে হবে।’ হরিণ বলে, ‘আমি হাঁটতে পারছি না।’
তারপর শেয়াল তার বন্ধু হরিণকে নিজের পিঠে সওয়ার করে বাসায় নিয়ে যায়। তারপর চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। শেয়াল হরিণকে ঘাস এনে খাওয়ায়। এভাবেই সে তাকে সেবা-যত্ন করতে থাকে।
এই ঘটনার প্রায় মাসখানেক অতিক্রম হয়ে যায়। হরিণ সুস্থতা লাভ করে। শেয়াল তার বন্ধুকে আবার আগের মত করে ফিরে পায়। দু’জন জঙ্গলের ভেতরে হাঁটতে থাকে, গাইতে থাকে। হঠাৎ হরিণের বন্যরাজ সিংহের কথা মনে পড়ে যায়। ‘বন্ধু, চলো আজ আমরা রাজ দরবারে যাই। তোমার কী সেদিনের কথা কিছু মনে নাই?’ ‘মনে থাকবে না কেন? বেশ মনে আছে। চলো যাই।’
দুই বন্ধু রাজ দরবারে হাজির হয়। সিংহ রাজা তাদেরকে দেখে খুশি হয়। ‘তোমরা আমার দরবারে এসেছ জেনে আমি খুশি হলাম। তোমরা দু’জন ভাল বন্ধু। তোমাদের মত প্রকৃত বন্ধু আমার রাজ্যে আরও থাকলে কেউ কোনো দিন বিপদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। আজ আমি শেয়ালকে তো পুরষ্কার দিবোই সাথে হরিণ তোমাকেও পুরষ্কার দেবো।’ তারপর দুই বন্ধু সিংহ রাজার কাছ থেকে পুরষ্কার নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।