প্রকৃতি থেকে শিক্ষা সঞ্জয় চৌধুরী

19

জাগতিক বিশ্বের মানব সৃষ্ট নয় এমন দৃশ্য-অদৃশ্য বিষয় এবং জীবন ও প্রাণই হলো প্রকৃতি। আর মানুষের আচরণের কাক্সিক্ষত, বাঞ্চিত এবং ইতিবাচক পরিবর্তনই হল শিক্ষা। এ শিক্ষা সম্পূর্ণ তখনই হয় যখন তাত্তি¡ক এবং প্রায়োগিক উভয় শিক্ষাই লাভ করা যায়। আমাদের পাঠ্যপুস্তক তাত্তি¡ক শিক্ষা দিতে পারে, প্রায়োগিক শিক্ষা নয়। প্রায়োগিক শিক্ষা পূর্ণ হয় প্রকৃতি থেকে শিক্ষায়। ছোটবেলায় আমরা জেনেছি ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’। এ প্রসঙ্গে রবার্ট ব্রূসের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যখন এক গুহায় আশ্রয় নেন এবং হতাশা যখন তাঁকে গ্রাস করেছিল তখন তিনি দেখতে পান এক মাকড়সা পর পর সাতবার চেষ্টার পর অষ্টমবার তার স্বপ্নের জাল বুনতে সক্ষম হয়েছিল। এতে ব্রুসের মনে প্রশ্ন এল মাকড়সা যদি সাতবার চেষ্টার পর অষ্টমবারে জাল বুনতে সক্ষম হয় ঠিক তেমনিভাবে আবার আমিও যদি চেষ্টা করি তবে যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারি। পরবর্তীতে দেখা যায় ব্রুস তাঁর চেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধে জয়লাভ করে হৃতরাজ্য ফিরে পেয়েছেন। তিনি অনুধাবন করেছেন বারবার চেষ্টা করলে সফলতা একসময় আসবেই। তাহলে অধ্যবসায়ের এই শিক্ষা আমরা কীটপতঙ্গ থেকে পেয়ে থাকি। প্রকৃতি নিজেকে বিকশিত করতে পছন্দ করে। নিজের গুণ, সৌন্দর্য্য ও স্বভাব নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকাটাও এ জগতের একটি শিক্ষনীয় বিষয়। আমরা যারা নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগি, কারে সাথে না মিশি, নিজের মেধার বিকাশে ভয় পায় এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলি তখন প্রকৃতি থেকে নিজেকে বিকশিত করার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারি। শীতে যখন ঘাস শুকিয়ে যায় এবং গাছের পাতা ঝড়ে যায় তখন মনে হয় প্রকৃতি আর সবুজ হয়ে উঠবে না। কিন্তু শীত শেষে যখন বসন্ত আসে তখন প্রকৃতি আবার তাঁর সবুজবর্ণ ধারণ করে সুন্দর এই পৃথিবীকে আরো সুসজ্জিত করে তোলে। ঠিক তেমনিভাবে আমরা যখন সব হারিয়ে শূন্য হয়ে যায় তখন প্রকৃতিকে দেখে আবার সব ফিরে পাবার সাহস যোগাতে পারি। পিঁপড়া যখন সারিবদ্ধভাবে দেয়াল, গাছ কিংবা অন্য কোন পথে হাঁটে তখন তারা একটি নিয়মনীতি অবলম্বন করে সারিবদ্ধভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। যা দেখে আমরা শৃঙ্খলাবোধের মত একটি মহৎ গুণকে জীবনে অনুশীলন করতে পারি। বর্ষাকালে যখন এদের বাসা জলে ভেসে যায় তখন আত্মরক্ষার প্রয়োজনে একসঙ্গে জড়াজড়ি করে গোল বলের মত দলা পাকিয়ে জলের উপর ভাসতে ভাসতে কোন উঁচু জায়গা পেলে অথবা জল কমে গেলে আবার এরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, যা দেখে আমরা যৌথভাবে বিপদে মোকাবেলা করার সাহসিকতা অর্জন করতে পারি। অবাধ্য সন্তানকে সঠিক পথে আনার জন্য মা যেমন মাঝে মাঝে তাকে শাসন করে, ঠিক তেমনি প্রকৃতিও মানুষকে প্রাকৃিতক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে শাসন করার চেষ্টা করে। আজ আমরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা ‘ওজোন স্তরের ফুটো’ কথাটি প্রায়ই শুনে থাকি যা মানুষের অসংযত ক্রিয়াকলাপের ফলে ঘটতে থাকে। এখনও সাবধান না হলে মানুষ নিজের কবর নিজে রচনা করবে। প্রকৃতি চায়না তার নিয়মগুলো মানুষ প্রতিনিয়ত বদলে দিক। বরং সে চাই তার নিয়মগুলো মেনে এবং তার সঙ্গে সহযোগিতা করে মানুষ তার ভবিষ্যতের আনন্দময় ক্ষেত্রটা গড়ে তুলুক। যে কোন পরিস্থিতিতে খাপ খাপিয়ে নেয়ার মনমানসিকতা প্রকৃতি থেকে শেখা যায়। প্রচন্ড গভীর জঙ্গলে কিংবা ধু-ধু মরু এলাকায় পশুপাখি যেমনিভাবে তার খাবার খুঁজে নিতে পারে ঠিক তেমনিভাবে মানুষ যখন একটু ধৈর্য্য হারিয়ে সহজেই হাল ছেড়ে দেয় তখন প্রকৃতি থেকে সহনশীলতার মত একটি গুণাবলিকে নিজের জীবনে আত্মস্থ করা যায়। সমুদ্রে যখন প্রচন্ড ঢেউ উঠে তখন বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে সাগর তীরের সব গাছপালা তছনছ করে দেয়, কিন্তু ঝড় থেমে গেলেই আবার সব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এভাবে মানুষের জীবনেও কিছু কঠিন সময় পার করতে হয়। আর তাই জীবনের এই কঠিন সময়টাতে প্রকৃতির এই ভাঙ্গাঁ-ঘরা থেকে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে যেতে হবে। বিখ্যাত দার্শনিক রুশো শিশুদের প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়ার মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে প্রকৃতি থেকে শিক্ষাটা হবে স্বতঃস্ফূর্ত এবং আনন্দময় যেখানে তারা নিজের মত পর্যবেক্ষণ করে আপনা-আপনি শিখবে। এভাবে অর্জিত শিক্ষা অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী হবে। যেমন-বৃষ্টিতে ভিজলে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ দৃষ্টিতে আমরা তাদের বৃষ্টিতে ভিজতে দিই না। কিন্তু এক্ষেত্রে শিশু যদি নিজে নিজে বৃষ্টিতে ভেজে অসুস্থতার সম্মুখীন হয়ে দুঃখ কষ্ট ভোগ করে তবে সে এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান উপলদ্ধি করে ভবিষ্যতে আর একটিবারও বৃষ্টিতে ভেজার চেষ্টা করবে না। সারাবিশ্বে এখন শ্রেণিকক্ষের বাইরে বিভিন্ন পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। আমাদের বিদ্যালয়ের কাছেই রয়েছে বাস্তব পরিবেশ। যেখানে শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রমকে আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী করে শিখনকে অর্থপূর্ণ করা যায়। দার্শনিকদের মতে জীবন চলার পথে সবচেয়ে বড় শিক্ষক হচ্ছে প্রকৃতি। তাই চলুন সবাই আমরা প্রকৃতিকে জেনে এটিকে সংরক্ষণে এগিয়ে আসি এই হোক সবার প্রত্যাশা।