পোড়া-কপালি মূল : আহমেদ সাদী

অনুবাদ : হাইকেল হাশমী

24

হাশিম আলী কয়কদিন ধরে বেশ চিন্তিত। সে বুঝে উঠেতে পারছিল না যে সে কি করবে । শিউলীর ব্যাপারটা কীভাবে সমাধান করবে। সে রাগের মাথায় শিউলীকে তার স্বামীর থেকে তালাকের ব্যবস্থা করেছিল কিন্তু তারপর তার জন্য আর কোন ভাল বর খুঁজে পায়নি। কিছুদিন ধরে শিউলীর মতিগতি তার কাছে ভাল মনে হচ্ছে না।
ইদানীং শিউলী সারাদিন গাঁয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে। বাসার কোন কাজে তার মন বসে না। তাকে দেখে মনে হয় যেন তার কোন কিছু হারানো গেছে যেটা সে সারাদিন গাঁয়ে খুঁজে বেড়ায়। শিউলীর এই আচরণ হাশিম আলীকে জন্য খুব পীড়া দেয়।
শিউলীর স্বামী যদি ওকে তিন বেলার জায়গা এক বেলা খেতে দিত আর দুবেলা না খাইয়ে রাখত তাও সে সহ্য করতে পারতো কিন্তু যখন সে জানল যে তার স্বামী শিউলীকে তার বন্ধুদের মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করেছে তখন তার রক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠলো সে রাগে পাগলের মতো হয়ে গেল। সে নিজের মেয়েকে লালন পালন করে এত বড় এই জন্য করে নাই, তার বিয়ে এই জন্য দেয় নাই যে সে অন্য লোকের বিনোদনের সামগ্রী হবে। কালামের নির্লজ্জতার জন্য সে রাগে আর ক্ষোভে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল এবং তার ইচ্ছা হয়েছিল দা দিয়ে ওই ইতরের মাথাটা ঘাড় থেকে আলাদা করে দিতে। তাহলে সে শান্তি পেতো, তারপর জেল হতো বা ফাঁসি সে কোন চিন্তা করতো না। কিন্তু তার বউ মঞ্জু তাকে বুঝালো যে বেশি উত্তেজিত না হয়ে শিউলীকে তার স্বামী থেকে আলাদা করে আনাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
তখন হাশিম আলী চিন্তাও করে নাই যে স্বামী থেকে আলাদা করার ফলে একটি সমস্যার সমাধানতো মিলবে কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার নতুন সমস্যাটা দাঁড়িয়ে যাবে। এই কথাটা তার মাথায় আসে নাই। ওর নিজের অবস্থা যদি একটু সচ্ছল হতো তাহলে সে এতটা চিন্তা করতো না। কিন্তু এখন তার যে অবস্থা একবেলা খাওয়া জুটলে আর একবেলা কি হবে তা নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। তার পর সে শিউলীর বিয়ের জন্য যে ধারকর্জ করে ছিল তার বোঝা এখন পর্যন্ত বইতে হচ্ছে। এখন তার দ্বিতীয় বিয়ের জন্য ধার চাইলে তাকে কে ধার দিবে? এদিকে শিউলীর পাগলামি তার দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ওর ইচ্ছে হয় তার গলা টিপে এই সমস্যার চিরসমাধান করে ফেলতে কিন্তু আবার ভাবে ওর ঘা’টা এখনো তাজা, এখন ব্যথার মাত্রাও বেশি। যখন ব্যথা প্রকট হয় তখন অস্থিরতাও বেড়ে যায়। এখন বিচলিত হয়ে ঘুরছে, যত সময় যাবে অস্থিরতাও কেটে যাবে। স্বামী যতই খারাপ হোক না কেন, স্ত্রীর সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক স্বামীর সাথেই থাকে। একটু আকর্ষণ থাকাটা স্বাভাবিক, আবার মানুষের মনটাও যে আজব এক বস্তু, পাঁজরের ভিতরে কম্পিত এই ছোট একটি বস্তু, দুনিয়ার উথাল-পাতালের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কখনো ভালবাসার একটি ইঙ্গিত, ভালবাসার একটি ছোঁয়া, কোন একটি অক্ষর মনের উপর এমনভাবে অঙ্কিত হয়ে যায় যেন পাথরের উপর খোদাই করা কোন লেখা হাশিম আলীতো ভাল করে জানে যে পাথরের উপর লেখাটা মুছে যেতে শত শত বছর লেগে যায়। স্বামীর সাথে শিউলীর বিচ্ছেদেরতো মাত্র এক বছর হয়েছে।
হাশিম আলী শিউলীর চিন্তায় অর্ধ পাগলের মতো হয়ে আছে। ওকে পাগল বানানোর জন্য জীবনের অন্যান্য সমস্যার অভাব ছিল না। সে দিন মজুর হিসাবে যা আয় করতো, এই উচ্চমূল্য বাজারে তা দিয়ে জীবন যাপন করা একটি দুরূহ ব্যাপার। সে নিজের পরিবারকে দু’বেলা ভাত দিতেও অক্ষম ছিল । সে সব ধরণের কাজ জানত এবং দক্ষতার সাথে করতে পারতো। বাসার ছাদ বানানো, বেড়া লাগানো, ক্ষেতে লাঙল চষা, ক্ষেত থেকে আগাছা পরিষ্কার করা, ক্ষেতে চাড়া বপন করা অথবা ফসল কাটা, ও সব ধরণের কাজ করতেই সে সক্ষম। তবুও তার আয়ের চাদর এত ক্ষুদ্র ছিল যে মাথা ঢাকলে পা খুলে যেত আর পা ঢাকলে মাথা। সারা দিন কাজ করলে এক বেলা পেট ভরে খাবার যোগাড় হতো, সে সন্ধ্যাবেলা এক কিলো চাল আর দুই টাকা নগদ মজুরী হিসেবে পেতো। আর সংসারে মোট পাঁচজন সদস্য। এই আয় দিয়ে নিজের, তিন বাচ্চা আর বউ’এর পেট ভরাই দুরূহ ছিল তারপর শিউলীর বোঝা আবার তার ঘাড়ের উপর এসে পড়ল।
শিউলীর বিয়ের পর হাশেম আলী খুব উৎফুল্ল ছিল। একজনের খরচটা তো কমলো। একজন মানুষ কমপক্ষে আধা কিলো চালতো খায়। সে কোনদিন হিসাব কষে নাই কিন্তু শিউলী একবেলায় ২৫০ গ্রাম চালের ভাত তো নিশ্চয় খায়। আবার এক বছরে তাকে দুই জোড়া কাপড় দেয়াই লাগে। শিউলীর বিয়ের পর কিছু খরচ অবশ্যই কমে গিয়েছিল। কিন্তু সে কি জানতো যে শিউলীর বিবাহিত জীবনের মেয়াদ এত অল্প হবে। তার বিয়ের এক বছর যেতে না যেতে তার তালাকও হল আর সে আবার বাপের বাড়িতে ফিরে আসলো। এখন হাশিম আলীর কাছে তাকে একটি ভারী পাথরের মতো মনে হতে লাগল যেটা তার বুকের উপর রাখা, সেটা সে তার বুকের উপর থেকে নামাতেও পারছে না আবার তার বোঝায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম।
এদিকে বিয়ের পর থেকে শিউলীর আচার ব্যবহারে তুমুল পরিবর্তন ঘটেছে, আগে সে যেমন তেমন কাপড় পরে নিতো, খাবার সময় ভাত আর লবণ থাকলেও কিছু না বলে খেয়ে নিতো, এখনতো মাছ মাংস না থাকলে গলা দিয়ে ভাত নামে না। প্রিন্টেড শাড়ি ছাড়া অন্য কোন শাড়ি পরতে সে মোটেও আগ্রহী না। গোসলের জন্য সুগন্ধি সাবান আর মাথায় দেবার জন্য সুগন্ধি তেলের আবদার করে। হাশিম আলী এই সব জিনিস কোন না কোন উপায় তাকে এনে দিতো।
মাঝে মাঝে হাশিম আলী রেগে যেতো এবং বলতো “হারামি, তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, নিজের অভ্যেস যদি এত বদলিয়ে নিলি তাহলে বাপের বাড়ি কেন ফিরৎ আসলি? স্বামীর কথা মতো চললেই হতো, নালিশ দিলি, কান্না কাটি করলি। তা না হলে আমার কি ঠেকা ছিল তোকে তালাক দেওয়ায় বাসায় নিয়ে আসার? সে অনেকক্ষণ রাগের মাথায় বক বক করতে থাকতো তারপর মঞ্জু তাকে বুঝিয়ে তার রাগটা ঠান্ডা করতো।
হাশিম আলী যদি প্রত্যেক দিন উপার্জন করতে পারতো তাহলে কোন কথা ছিল না কিন্তু বছরে তিন মাস গ্রামে কোন কাজ পাওয়া যেত না। বর্ষাকালে বাসার ছাদের কাজ বন্ধ থাকতো, ক্ষেতে ধান আর পাটের ফসল তৈরী থাকতো, ওখানে কোন কাজ থাকতো না। শুধু ঝড়ে যদি কারো বাসার বেড়া উড়ে যেত অথবা ছাদে কোন ক্ষতি হতো তাহলে অল্প কিছু কাজের যোগাড় হতো কিন্তু মাঝে মাঝে ওটাও পাওয়া যেত না, যেহেতু গ্রামে ওর মতো আরো অনেক দিন মজুর ছিল যাদের মাঝে ওই কাজগুলো ভাগাভাগি হয়ে যেত। এমন দিনগুলোতে হাশেম আলী যে কাজ পেত তাতে আয় হতো অতি নগণ্য। অন্যরা কিছু না কিছু সঞ্চয় করে রাখতো এবং এই অভাবের সময় ওই সঞ্চয় থেকে খরচ করতো কিন্তু সে এতই ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিল যে সঞ্চয়ের কোন সুযোগ ছিল না। বর্ষার দিনে সে ছোট ছোট মাছ ধরার জন্য বাঁশের পলো বানিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করতো এবং ওটা দিয়ে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করতো কিন্তু এইকাজে তার লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হতো যেহেতু সে ন্যায্য মূল্য পেত না। তাই তার জীবন খাতায় লোকসানের সংখ্যা বেড়েই চলছিল দিনের পর দিন।
এক সন্ধ্যায় ওর স্ত্রী মঞ্জু যখন ফিসফিস করে ওকে জানালো যে গ্রামের এক যুবক শিউলীকে পছন্দ করতে আরম্ভ করেছে এবং শিউলীও তার সাথে দেখা করার জন্য সবার চোখের আড়ালে নদীর ধারে যেতে শুরু করেছে তখন হাশিম আলীর মনে হল যেন তার বুকে রাখা ভারী পাথরটা সরে যাচ্ছে। তার মনে হল যেন তার থমকে থাকা নিঃশ্বাস আবার চলতে শুরু করেছে। যখন মঞ্জু তাকে আরো জানাল যে ছেলেটা ফায়জু দেওয়ানীর বড় ছেলে ওয়াজেদ তখন সে আরো খুশী হল কারণ ফায়জু দেওয়ানী বেশ স্বচ্ছল লোক, এবং সে কয়েক শত বিঘা জমির মালিক। ওয়াজেদের যদিও একটি বিয়ে হয়েছে এবং তার দুটো সন্তানও আছে কিন্তু এটা কোন চিন্তার ব্যাপার না। গ্রামের স্বচ্ছল লোকরা এমনিই দু-তিনটা বিয়ে করে দিব্যি আরামে ঘর সংসার করে। এমন বিয়ে ব্যর্থও হয় কিন্তু অনেক কম। ওয়াজেদের দুটি সৎ মা আছে যারা কয়েক সন্তানের জননী এবং তারা বেশ আরামেই আছেন।
“তুমি তাকে ডেকে কথা বল না কেন?” হাশিম আলী খুশী মনে বলল।
“আমিও তাই চিন্তা করছি”।
“ওকে ডেকে বলে দাও এমন লুকোচুরি করার দরকার নাই, যদি শিউলীকে তার পছন্দ হয় তার সাথে বিয়ে করে নিলেই পারে”। হাশিম আলী তার কথা শেষ করে বিড়ির সুখটান দিতে দিতে মনে মনে ভাবল যাক ভাল হয়েছে তারা একে অন্যকে পছন্দ করছে, বিয়ের পর সংসারও টিকে যাবে। শিউলীর প্রথম বিয়ে তার মতামত ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু এটাতে তার কোন দোষ ছিল না, প্রত্যেক পিতা তার মেয়েকে বিয়ের পর সুখী দেখতে চায়। সে যা করেছিল শিউলীর সুখের জন্যই করেছিল। কালামের নিজের দোকান ছিল, দেখতে ভাল ছিল, স্বাস্থ্যবান ছিল। বাসায় শুধু মা ছিল, কোন আর ভাই বোন ছিল না । বাবা অনেক আগে মারা গেছে। এমন সংসার কোন ভাগ্যবানের কপালেই জোটে। সে কি তখন জানত কালাম এত ইতর প্রকৃতির লোক। ওর মাকেও অনেক ভদ্র মনে হত, কথা বার্তায় বেশ ভাল ছিল। কিন্তু কে জানত ৪৫ বছর বয়সেও সে পরকীয়া প্রেম করে বেড়ায়। কালামের বাবা মারা যাবার পর তিন তিনটা বিয়ে করল আবার তালাকও নিয়ে নিল। কিন্তু ওয়াজেদের কথা আলাদা, শিউলীর যদি ওয়াজেদের সাথে বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তারা চিরসুখী থাকবে। হাশিম আলী মনে মনে অনেক উৎফুল্ল বোধ করল।
“আমি আগামীকাল তাকে রাতের খাবার জন্য ডেকে নেই” মঞ্জু নিশ্চিতভাবে বলল।
“হ্যাঁ এটাই ঠিক এখন আর বিলম্ব করার কোন দরকার নাই”
পরদিন যখন ওয়াজেদ, হাশিম আলীর বাসায় এলো তখন সঙ্গে করে পাঁচ কিলো বাসমতী চাল আর একটি বড় ইলিশ নিয়ে এলো ।
মঞ্জু তাকে বলল “তুমি এইসব কেন নিয়ে এলে, আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু তাই বলে তোমাকে একবেলা ভাত খাওায়তে পারব না?”
“না না এমন কোন কথা না, আপনার বাসায় প্রথমবার এসেছি এবং খালি হাতে আসাটা ভাল দেখাতো না, কিছু মনে করবেন না” ওয়াজেদ উত্তর দিল।
মঞ্জু আর কিছু বলল না এবং বলারই বা কি ছিল, ওয়াজেদ এইসব জিনিস এনে তাকে আরো ধার করা থেকে বাঁচিয়ে দিল। সে চুপচাপ রান্না ঘরে চলে গেল।
হাশিম আলী উঠানে কিছু না শোনার ভান করে বসে বিড়ি ফুঁকতে থাকল কিন্তু মনে মনে আনন্দবোধ করল এবং ভাবতে লাগল যে ওয়াজেদের পরিবার একটি স্বচ্ছল পরিবার, তার জন্য এইসব জিনিস আনা কোন ব্যাপার ছিল না। ওদের গোলায় শতাধিক মন চাল থাকে ওখান থেকে পাঁচ কেজি চাল বের করে আনা যেন নদী থেকে এক কলস পানি বের করে নেয়া। হঠাৎ তার মনে একটি কথা জাগল ওয়াজেদ যদি বিয়ের পর শিউলীকে তার ঘরে না উঠায়ে হাশিমের বাসায় রেখে দেয় আর তার খরচ দিতে থাকে তাহলে খুবই ভাল হয় তাতে তার নিজের অভাব অনটনের থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার উপায় হতো। এই কথা চিন্তা করে সে খুব তৃপ্ত হলো।
সেই রাতে মঞ্জু বাসমতী চালের ভাত আর ইলিশ মাছ রান্না করে ওয়াজেদকে রাতের খাবার পরিবেশন করল এবং সে পেট ভরে খেলো। খাবার পর সে অনেকক্ষণ উঠানে বসে মঞ্জু আর শিউলীর সাথে আলাপে মগ্ন থাকলো।
তারপর থেকে ওয়াজেদ প্রত্যেক দিন তাদের বাসায় আসত এবং সঙ্গে কিছু না কিছু নিয়ে আসত আর মঞ্জু প্রত্যেক দিনই আপত্তি করতো কিন্তু ওয়াজেদের কাজে কোন পরিবর্তন হয় নাই। ওয়াজেদ বেশিরভাগ সময় মঞ্জুর সাথেই কথা বলতো আর মাঝে মাঝে শিউলীও কথা বার্তায় অংশ নিত। এর মধ্যে হাশিম আলী একেবারে দর্শক হয়ে থাকতো।
কয়ক দিন পরে মঞ্জু, হাশিম আলীর কানে কানে বলল “ওরা আমাদের সামনে কথা বলতে লজ্জা পায়, খুলে মনের কথা বলতে পারে না, আমি ভেবে দেখেছি এবার থেকে তাদেরকে বাসার ভিতরে বসানো উচিৎ, তুমি কি বল?”
“ঠিক আছে কিন্তু আমি ঘরের বাইরে চলে যাব, তুমি তাদের উপর চোখ রেখ”।
“ওটাতো আমি রাখব, তুমি তা নিয়ে চিন্তা কর না”।
তারপর থেকে ওয়াজেদ যখনই আসতো মঞ্জু তাকে বাসার ভিতরে বসিয়ে দিয়ে দরজার বাইরে বসে তাদের পাহারা দিত। হাশিম আলী কোন ওজর দেখিয়ে বাইরে চলে যেত। যদি কোনদিন গ্রামের অন্য কেউ কোন কাজে তার বাসায় আসতো সে উঠে উঠানে চলে আসতো। তবুও গ্রামের লোকদের থেকে এই জিনিসটা লুকানো থাকল না। মঞ্জু এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হলো না সে জানত লোকেরা আড়ালে অনেক কথা বলবে কিন্তু বিয়ে হয়ে গেলে সব কিছু ভুলে যাবে।
একদিন হাশিম আলী বাসায় একা ছিল, মঞ্জু আর শিউলী, দুই জনেই কোন কাজে বাইরে ছিল, তখন ওয়াজেদ এল এবং নিজের পকেট থেকে এক প্যাকেট বিড়ি বের করে তাকে দিল এবং বলল “আব্বা এটা রাখেন, আপনার জন্য এনেছি”।
হাশিম আলী মনে মনে অনেক খুশী হল ওয়াজেদের “আব্বা” সম্বোধনে, তার মানে ওয়াজেদ স্থির করে নিয়েছে সে শিউলীকে বিয়ে করবে।
“ধন্যবাদ বাবা” হাশিম আলী একটি বিড়িতে আগুন ধরাল, “তুমি বিয়ে কবে করছ?”
“এই ধরেন আরো দশ বারো দিন লাগবে” ওয়াজেদ কাঠের পিড়ি টেনে তার উপর বসতে বসতে উত্তর দিল, “জরিনাকে রাজী করে নিয়েছি, প্রথম প্রথম সে অনেক কান্না কাটি করল কিন্তু পরে রাজী হলো”।
“আর তোমার মা?” হাশিম আলী জিজ্ঞাসা করল।
“মাও রাজী হয়ে গেছে” ওয়াজেদ উত্তর দিল “জরিনা থেকে ভয় পাচ্ছিলাম, মেয়েরা সব সহ্য করতে পারে কিন্তু সতিন সহ্য করতে পারে না। সতিনের কথা শুনলেই নাগিনির মতো ফুসে উঠে”।
“যাক এটাও ভালই হল”।
“এখন শুধু বাবাকে রাজী করাতে হবে, যেদিন তিনি রাজী হয়ে যাবেন সঙ্গে সঙ্গে কাজী নিয়ে আপনার বাসায় চলে আসব”।
ওই দিন ওয়াজেদ বেশিক্ষণ বসে নাই, মঞ্জু আর শিউলীর ফিরে আসার আগেই সে চলে যায়।
এভাবে কিছু দিন ওয়াজেদ প্রত্যেক দিন সন্ধ্যায় তাদের বাসায় আসতো আর রাতের খাবার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আলাপ করতো। তারপর হঠাৎ তার আসা-যাওয়া একদম বন্ধ হয়ে গেল।
প্রথম প্রথম তারা মনে করল সে হয়তবা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা জানতো কৃষিকাজের সব দায়িত্ব তার উপর ছিল, ফসল বপন থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত, গুদামজাত করা থেকে হাট-বাজারে বিক্রি করা পর্যন্ত, সবই তার দায়িত্ব ছিল। তারা মনে করলো হয়তবা সে এইসব কাজ নিয়ে ব্যস্ত তা না হলে কোন আত্মীয়র বাড়ি বেড়াতে গেছে।
যখন পনের দিন হয়ে গেল আর ওয়াজেদ একবারও এলো না তখন মঞ্জুর একটু খটকা লাগল, কিন্তু সে চিন্তা করল ওয়াজেদের নেশা এত তাড়াতাড়ি কীভাবে কাটতে পারে, বরং আরো তীব্রতা আসার কথা। ও ওয়াজেদের চোখে নেশার লাল রং দেখেছে, তার হাঁটাতে এলোমেলো ভাব দেখেছে, ওর আন্দাজ ভুল হতে পারে না। ওর মাথায় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঘুরতে লাগলো।
তখন সে শিউলীকে জিজ্ঞাসা করল “কি ব্যাপার ওয়াজেদ এদিকে একদম আসা ছেড়ে দিয়েছে, তোমার সাথে কোন ঝগড়া বিবাদ হয়নি তো?”
“না তো” শিউলী উত্তর দিল, “মনে হয় রাগ করেছে”।
“রাগ করেছে” মঞ্জু আশ্চর্য স্বরে জিজ্ঞাসা করলো, “কেন রাগ করলো?”
“ইদানীং সে অনেক জেদ করতে শুরু করেছিল”, শিউলী বলল।
“জেদ করতে শুরু করেছিল, কিসের জন্য?”
শিউলী তার দিকে এক নজর দেখলো তারপর দৃষ্টি নিচু করে বলল “সে শুধু বলতো কয়েক দিনের ভিতরে আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে তাহলে এই দূরত্ব কেন?”
“তুমি কি বললে?”
“আমি বললাম কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়ে গেলে এই দূরত্ব নিজে নিজে কমে যাবে”।
মঞ্জু একদম রাগে ফেটে পড়ল “তোমাকে কত করে বুঝিয়ে ছিলাম ওকে হাত ছাড়া করবা না, তাকে হাত থেকে ফসকাতে দিবা না, কিন্তু ওটাই হল যা ভয় ছিল।”
“তাহলে আমি কি করতাম?” শিউলী কান্না কান্না কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল।
“ওরে পোড়া-কপালি তুই এটাও বুঝলি না” মঞ্জু রাগে চিৎকার দিয়ে বলল “দানা না দিলে কোন পাখি ফাঁদে পা দেয় রে বোকা!”
আর শিউলী বিস্ময়ভরা চোখে মা’এর দিকে তাকিয়ে রইল!
আহমেদ সাদী ১৯২৪ সালে বিহারের মুঙ্গেরে জন্মগ্রহণ করেন। পরে কোলকাতা চলে আসেন এবং ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে সৈয়দপুরে স্থায়ী বসবাস গড়েছিলেন। আহমেদ সাদী বাংলাদেশের উর্দু লেখকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি একধারে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, বলিষ্ঠ গল্পকার আর অনুবাদক ছিলেন। তিনি শুধু একজন প্রগতিশীল গল্পকার ছিলেন না তার প্রগতিশীলতার প্রকাশ তার কবিতার মধ্যে ফুটে উঠে ছিল। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার পটভূমিতে যে গল্প আর কবিতা রচনা করেছেন তা বাংলাদেশে উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে থাকবে। তিনি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো উর্দু ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন, যার মধ্যে বিমল মিত্র রচিত “কড়ি দিয়ে কিনলাম” অন্যতম। তিনি ১৯ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে সৈয়দপুরে ইন্তেকাল করেন।