পেঁয়াজে উচ্চ মুনাফা লুটছে খুচরা ব্যবসায়ীরা

মনিরুল ইসলাম মুন্না

24

প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত আমদানির ফলে সব ধরনের আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম এখন নিম্নমুখী। ফলে আমদানিকারকরা এখন অর্ধেক দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিন্তু এর বিপরীতে উচ্চ মুনাফায় চড়ামূল্যে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী হলেও খুচরা বাজারে বরাবরের মতই ৫০ টাকার উপরে ভাল মানের পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে।
আমদানিকারকরা বলছেন, পেঁয়াজ আমদানি করে আমরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছি। প্রয়োজনের বাইরে আমদানি করা আমাদের মোটেও উচিত হয়নি। কিন্তু খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমরা আগে যে দামে পেঁয়াজ কিনেছি, তার থেকে ৫ টাকা মুনাফা রেখে বিক্রি করছি। গতকাল শনিবার নগরীর চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
পাইকারি বাজারে কিছুটা দাম কমলেও খুচরা বাজারে কমেনি পেঁয়াজের ঝাঁজ। সেখানে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়িদের দাবি, খাতুনগঞ্জে যেসব পেঁয়াজের দাম কমেছে তার চাহিদা কম।
সরেজমিনে দেখা যায়, আন্দরকিল্লা এলাকায় ভ্যানের উপর পাকিস্তানি পেঁয়াজ বিক্রি করছে ৫০ টাকা কেজি দরে। কিন্তু সেটির পাইকারি মূল্য মানভেদে ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।
জানতে চাইলে ভ্যানওয়ালা মো. হাসান বলেন, আমি দাম কমার আগেই পেঁয়াজগুলো কেজিপ্রতি ৪৫ টাকা করে কিনেছি। তাই ৫০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। আর দেশি পেঁয়াজও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বিধায় ৮০ টাকায় বিক্রি করছি। তবে বিভিন্ন জায়গায় খারাপ মানের পেঁয়াজ আরো কম দামেও বিক্রি হতে পারে।
একই কথা বললেন চৌমুহনী কর্ণফুলী মার্কেটের খুচরা ব্যবসায়ী সাহাবউদ্দিন। তিনি বলেন, আমরা অতিরিক্ত মুনাফা করছি না। যা আগে এনেছি, তা বিক্রি করছি। নতুন করে কম দামে পেঁয়াজ আনলে তখন কম দামে বিক্রি করতে পারবো।
অন্যদিকে খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানান, এবার পেঁয়াজের আমদানিকারকরা বড়সড় ধরা খেয়েছেন। আমদানিমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার এরই মধ্যে আবহাওয়ার কারণে শত শত বস্তা পেঁয়াজ পচে গেছে। পচা পেঁয়াজগুলো ‘যা পাই তা লাভ’ মনে করে বিক্রি করে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এসব পচা পেঁয়াজ ভ্যান ও ফেরিওয়ালারা কিনে নিয়ে রোদে শুকিয়ে বিক্রি করছেন।
গতকাল চাক্তাই খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে মিয়ানমারের পেঁয়াজ মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ৩৫ টাকা, চীনা পেঁয়াজ ১০ থেকে ৩০ টাকা, তুরস্কের পেঁয়াজ ২৫ থেকে ৩০ টাকা, হলুদ ও নিম্নমানের এবং ৪০ থেকে ৪৫ টাকা লাল ও ভাল মানের, পাকিস্তানি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা নিম্নমানের এবং ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ভালমানের, মিশরের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৮ থেকে ৩৫ টাকা। অন্যদিকে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে লোকসানের বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে গত শুক্রবার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের বাজার পরিদর্শন করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। এসময় তিনি হামিদুল্লাহ মিয়া বাজারের ব্যবসায়ী নেতাদের সাথেও বৈঠক করেন।
বৈঠকের পর অতিরিক্ত সচিব সাংবাদিকদের বলেন, খাতুনগঞ্জের অনেক ব্যবসায়ী পেঁয়াজ পচে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আসলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেঁয়াজ আমদানি করার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি আগামী জানুয়ারিতে টিসিবি পেঁয়াজ প্রকিউরমেন্ট করার সময় তাদের কাছ থেকে কিছু নেয়া যায় কিনা ভেবে দেখবো।
হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস পূর্বদেশকে বলেন, পেঁয়াজের বাজার খুবই খারাপ। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী পুুঁজি হারানোর অবস্থা। শত শত টন পেঁয়াজ ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হয়েছে। অনেক দেশ নিম্নমানের পেঁয়াজ পাঠিয়েছে। অনেক পেঁয়াজ অতিরিক্ত ঠান্ডায় পাতা বেরিয়ে গেছে। অতিরিক্ত আমদানি হওয়ায় পেঁয়াজের বাজারে এমন ধস হয়েছে।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, সরকারের একটি পরিসংখ্যান তৈরি করা উচিত, যাতে পেঁয়াজ কতটুকু দেশে উৎপাদন সম্ভব আর কতটুকু আমদানি করা প্রয়োজন। এবারে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা যেন আমরা শিক্ষা হিসেবে নিতে পারি। যাতে পরবর্তীতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পেঁয়াজ আমদানি না করি।
তিনি আরও বলেন, আমি নিজেও ৫৫ টাকা দরে পেঁয়াজ আমদানি করে ২৫ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এটা আমিসহ সবার জন্য বড় ধরনের লোকসান।
চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বুলবুল পূর্বদেশকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত এক মাসে ৩৩৬টি ছাড়পত্র ইস্যুর মাধ্যমে ৪২ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। আর পচে যাওয়ার আশঙ্কায় পেঁয়াজ বন্দরে আসার পর দ্রæত ছাড় করছে কর্তৃপক্ষ।
উল্লেখ্য, গত ১৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। রপ্তানি বন্ধের জেরে দেশের বাজারে হু হু করে বেড়ে যায় পেঁয়াজের বাজার। এর আগে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর দেশের বাজারে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত। সেই সময় দুই দফায় পেঁয়াজের দাম দ্বি-শতক পেরিয়ে যায়। পরবর্তীতে পেঁয়াজ আমদানিকারকরা মিয়ানমার, চীন, মিশর, পাকিস্তান, তুরস্কের মতো দেশগুলোতে পেঁয়াজ এনে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। এবারও একইভাবে আমদানিকারকরা শত শত টন পেঁয়াজ এনেছেন। তবে গতবার মিয়ানমার থেকে স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হলেও এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই আসছে মিয়ানমারের পেঁয়াজ।