পেঁয়াজের বাজার অস্থির করার চেষ্টা

পূর্বদেশ ডেস্ক

15

বাজারে পেঁয়াজের সংকট নেই। সরবরাহও প্রচুর। বৈরী কোনও আবহাওয়ায় পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যাহতও হয়নি। মজুদও ফুরিয়ে যায়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনও আশঙ্কাও নেই। তারপরও কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা করছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। উদ্দেশ্য- ফায়দা লোটা। কোরবানির সময় পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে যায়। তাই সুযোগ বুঝে তারা কোনও কারণ ছাড়াই কেজিতে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। ৪০ টাকা কেজি দরের দেশি পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। কোথাও কোথাও ৬০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখনই এই চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্রেতারা আরও ভোগান্তিতে পড়বে। আর ব্যবস্থাটি নিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই। এমন মন্তব্য ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের।
জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজের চাহিদা তৈরি হয় কোরবানির ঈদে। আর এই উৎসব সামনে রেখেই ধাপে ধাপে বাড়ছে মসলা জাতীয় এ পণ্যটির দাম। প্রায় দুই মাস ধরে বাড়তে বাড়তে এই দাম পৌঁছে গেছে ৬০ টাকায়। আর আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়, যা আগে বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের একটি অসাধু সিন্ডিকেটের তৎপরতায় কোনও কারণ ছাড়াই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে- এমন অভিযোগ উঠেছে। খবর বাংলাট্রিবিউনের
এদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পাইকারিতে (ট্রাকসেল) পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৬ টাকা। এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২২ টাকা থেকে ২৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৮ টাকা থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। তবে পেঁয়াজের এই দাম বাড়াকে ব্যবসায়ীদের এক ধরনের কারসাজি বলে মন্তব্য করছেন ক্রেতারা। হিলি স্থলবন্দর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দর দিয়ে আগে গড়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি হলেও এখন পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ ট্রাকে। গত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার এই ছয় দিনে বন্দর দিয়ে ৩৬৫ টি ট্রাকে ৭ হাজার ৩০০ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। কাজেই সরবরাহ প্রচুর। বন্দর দিয়ে ভারত থেকে নাসিক ইন্দোর জাতের পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে।
হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেনের বরাতে জানা গেছে, দেশের বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা বাড়ায় বন্দর দিয়ে পেঁয়াজের আমদানিও বেড়ে গেছে। আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন বন্দর দিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি হতো, এখন সেখানে গড়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। আমদানি করা এসব পেঁয়াজ সব প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত বন্দর থেকে খালাস করা হচ্ছে। এসব পেঁয়াজ চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর খুচরা কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে
সর্বোচ্চ ৬০ টাকা কেজি দরে। আর আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা কেজি দরে। গত রমজান মাসের শেষ দিকে দেশি পেঁয়াজ ৩৫-৪০ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজের দাম নেমে এসেছিল ২৫-৩০ টাকায়। ক্রেতারা জানিয়েছেন, সিন্ডিকেট চক্র বছরে দুই বার পেঁয়াজের বাজারকে অস্থির করে তোলে। একটি হচ্ছে রোজা এবং অপরটি কোরবানির ঈদ। সামনে কোরবানি ঈদকে লক্ষ্য রেখে অসৎ মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে তারা।
ক্রেতাদের অভিমত, নিয়মিত বাজারে অভিযান পরিচালনা ও বাড়তি মনিটরিং না করার কারণে অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। তবে বাজারে অভিযান ও মনিটরিং থাকলে দাম নেমে আসবে। এদিকে টিসিবি’র (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোজার ঈদের পর থেকেই দেশি ও আমদানি উভয় পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কেজিতে পাঁচ টাকা করে বাড়তে বাড়তে আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় ৪৫ টাকায়। আর দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। টিসিবি’র মতে, গত এক মাসেই দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২২ শতংশের বেশি। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশের বেশি।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) তথ্য মতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৬ হাজার টন যা এর আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ টন বেশি। বিবিএস জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় ১৯ লাখ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ার কোনও কারণ নেই এই মৌসুমে। তবে মনিটরিং করে দেখা উচিত কি সমস্যা রয়েছে বাজারে যার কারণে দাম বাড়ছে পেঁয়াজের। সিন্ডিকেট করে কেউ অতিরিক্ত মুনাফার আশায় দামের কারসাজি করে থাকলে তাকে শনাক্ত করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে’।
মৌলভীবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী ও মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা জানিয়েছেন, ‘পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি কমিয়ে আনা প্রয়োজন। না পারলে সরকার সমালোচিত হবে’।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘পেঁয়াজের প্রচুর সরবরাহ রয়েছে। মজুদও স্বাভাবিক। শুধু স্বাভাবিকই নয়, অতিরিক্ত মজুদও রয়েছে পেঁয়াজের। তাই কোনও অজুহাতেই পেঁয়াজের দাম বাড়বে না। এ বিষয়ে সরকার তৎপর রয়েছে’।