পৃথিবী থেকে বহু দূরে পানির খোঁজ প্রাণের আশা বিজ্ঞানীদের

13

মহাকাশের একটি গ্রহ বসবাসযোগ্য বলে প্রথমবারের মতো প্রমাণ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সেখানে পৃথিবীর মতো বায়ুমÐল রয়েছে। আছে প্রাণের বিকাশের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, ওই গ্রহে প্রাণ রয়েছে।
এই গ্রহটির নাম কেটু-১৮বি। এটি গ্রহটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ২০১৫ সালে। কেটু-১৮বি কয়েকশ মহাপৃথিবীর একটি, যেখানে ভূখÐের পরিমাণ পৃথিবী এবং নেপচুনের মাঝামাঝি। এটি একটি তারাকে প্রদক্ষিণ করে। এই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিয়ে এখন নতুন করে কাজ শুরু করবেন বিজ্ঞানীরা।
স¤প্রতি নেচার অ্যাস্ট্রনমি নামে একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে এই গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। নাসা সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি, এই প্রথম কোনো এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহে পানির অস্তিত্বের প্রমাণ মিলল, যেখানে সেটির তরল আকারে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
প্রধান বিজ্ঞানী লন্ডনের প্রফেসর জিওভান্না টিনেত্তি এটাকে ‘বিস্ময়কর আবিষ্কার’ বলছেন। তিনি বলেন, এই প্রথমবারের মতো মহাকাশের যে এলাকা বসবাসযোগ্য, সেই এলাকার মধ্যে এক গ্রহে আমরা পানির অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম। মহাকাশের ওই স্তরের যে তাপমাত্রা তাতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব।
নতুন এই গ্রহের আকার পৃথিবীর দ্বিগুণেরও বেশি। গ্রহের হিসাবে এটি ‘মহাপৃথিবী’ (সুপার আর্থ) হিসেবে বিবেচিত। এখানকার তাপমাত্রা শূন্য থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে।
কেটু-১৮বি গ্রহের দূরত্ব পৃথিবী থেকে ১১১ আলোক বর্ষ। অর্থাৎ এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন মিলিয়ন মাইল দূরে, অনুসন্ধানী মহাকাশযান পাঠানোর জন্য যা খুবই দূরে। এখন একমাত্র পথ হলো, ২০২০-এর দশকে নতুন প্রযুক্তিসম্পন্ন মহাকাশ টেলিস্কোপ উদ্ভাবন করে তা সেখানে পাঠানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা।
লন্ডনের ইউসিএল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ইঙ্গো ওয়াল্ডম্যান বলছেন, এই যান ওই গ্রহের আবহাওয়ামÐল পরীক্ষা করে দেখবে সেখানে কোনোরকম জীবিত প্রাণী গ্যাস সৃষ্টি করতে পারে কিনা।
তিনি আরও বলেন, বিজ্ঞানের জন্য এটাই অন্যতম সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্ন আমাদের সবসময় ভাবিয়েছে যে, মহাজগতে আমরাই কি একমাত্র প্রাণী? মহাজগতের বায়ুমÐলে প্রাণের কারণে অন্য কোনো ধরনের রাসায়নিক নির্গত হয় কিনা, সে সম্পর্কে আগামী দশ বছরের মধ্যে আমরা জানতে পারব।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই গ্রহ আবিষ্কারের পেছনে যে দলটি কাজ করেছে তারা ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে আবিষ্কৃত গ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। গ্রহগুলো যখন তাদের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তখন তাদের আলোয় কী ধরনের পরিবর্তন হয় তা দেখে তারা এসব গ্রহের বায়ুমÐলে রাসয়নিকের উপস্থিতি গবেষণা করে দেখেন। এগুলোর মধ্যে একমাত্র কেটু-১৮বি গ্রহে পানির অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কম্প্যুটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, নতুন এই গ্রহের বায়ুমÐলের ৫০ শতাংশই পানি।
বৈজ্ঞানিক দলের একজন ড. এঞ্জেলস সিয়ারাস। তিনি বলেন, সৌরজগতের বাইরে বাসযোগ্য একটি গ্রহের বায়ুমÐলে পানির অস্তিত্ব আবিষ্কার ‘রীতিমত উত্তেজনাকর’। এই আবিষ্কারের ফলে একটা মৌলিক প্রশ্ন এখন আমাদের সামনে- পৃথিবী কি একমাত্র গ্রহ যেখানে জীবন আছে?
তবে এভাবে এগোনোর একটা সমস্যা হলো- মহাকাশ বিজ্ঞানীরা একটা বিষয়ে একমত হতে পারেননি, সেটা হলো কোন গ্যাসের উপস্থিতি প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত বহন করবে। এ বিষয়ে একমত হতে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
একজন বিজ্ঞানী বলছেন, কয়েকশ গ্রহে গ্যাসের রাসয়নিক উপাদান, কীভাবে এসব গ্যাস সৃষ্টি হয়ে এবং তারপর এই গ্যাস কীভাবে বায়ুমÐলে থাকে, তা নিয়ে একটি সমীক্ষার প্রয়োজন। আমাদের সৌর মÐলে পৃথিবীর অবস্থান অনন্য। পৃথিবীর বায়ুমÐলে রয়েছে অক্সিজেন, পানি এবং ওজোন। কিন্তু এখন যদি মহাজগতে অনেক দূরে অন্য কোনো তারকার কক্ষপথে এমন কোনো গ্রহের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে এই সবই রয়েছে তাহলেও সেগুলো ওই গ্রহে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য কি না, সেটা কিছুটা সাবধানতার সঙ্গেই বলতে হবে। কাজেই মহাকাশের হাতে গোণা কয়েকটি গ্রহ নয়, বরং কয়েকশ গ্রহ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর বায়ুমÐল নিয়ে গবেষণারত জশ লথরিঙ্গার টুইটারে লিখেছেন, ‘সূর্য থেকে পৃথিবীতে যতটা তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ পৌঁছায়, সেই তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ বেশি তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের সংস্পর্শে আসে কে ২-১৮বি। ফলে সেখানকার তাপমাত্রা মোটামুটি ২৬৫ কেলভিনের (-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) আশপাশেই ঘোরাফেরা করে। তবে, সেখানে মেঘের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, বা সেখানকার বায়ুমÐলে পানির পরিমাণই বা কতো, তা জানতে আরও গবেষণা চালাতে হবে।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রনমির ড. বেথ বিলর বলেন, দূরের এক তারার আশপাশের এক গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে তথ্যপ্রমাণ শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে বলে তার বিশ্বাস। এটা হলে মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে একটা বড়ধরনের মতবদল ঘটবে। সেটা যখন হবে, তখন এককথায় সেটা হবে যুগান্তকারী একটা মাইলফলক।