পূবালী বাতাসে মাঘেই বসন্তের আগমনী বার্তা ফেব্রুয়ারিতে বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস

119

বর্ষপঞ্জিতে এখনও ভরা মাঘ মাস। কনকনে শীতে কাবু থাকার কথা সবকিছু। কিন্তু, বদলে যাওয়া প্রকৃতি জানান দিচ্ছে ভিন্ন আমেজের। মধ্য মাঘেই যেন এবার নাতিদীর্ঘ শীতকে বিদায়ের দরজা দেখিয়ে পূবালী বাতাসে সওয়ার হয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। তবে, কী আগেভাগেই বসন্ত জাগ্রত দ্বারে!
বাংলা ক্যালেন্ডারে বসন্তের সূচনা ফাল্গুনে। সমাপ্তি চৈত্র সংক্রান্তিতে। কিন্তু এবার মাঘের প্রায় পক্ষকাল বাকি থাকতে থাকতেই বসন্ত-সমাগম টের পাওয়া যাচ্ছে। বেলা যত বাড়ছে, রোদের মেজাজও চড়ছে। রাতে ঠান্ডা উত্তরের হাওয়ার বদলে বইতে শুরু করেছে পূবালী বাতাস। আর বদলে যাওয়া প্রকৃতির এসব আলামত দেখেই আগাম বসন্তের আগমনী বার্তা দিচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা।
তারা বলছেন, দেশে দিনের বেলা তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠলেই পূবালী বাতাস ঢুকে পড়ে। আর তাতেই শোনা যায় বসন্তের আগমনী। দেশের দুয়েকটি অঞ্চল বাদে চট্টগ্রামসহ অধিকাংশ এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ এর ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। বিশেষ করে, চট্টগ্রামেই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে। গতকাল শুক্রবার যা ছিল টেকনাফে ২৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তবে, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনার কয়েকটি এলাকায় এখনও মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল দেশের সর্বনি্ম তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে রংপুরের রাজারহাটে। এ পরিস্থিতি আরও ক’দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ ডিগ্রি নেমে গেলে আবহাওয়া বিজ্ঞানের পরিভাষায় সেটাকে বলা হয় শৈত্যপ্রবাহ। একইভাবে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে পাঁচ ডিগ্রি উপরে উঠলে তাপপ্রবাহ বলা হয়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাড়ছে ভূমিকম্প, বজ্রপাত। তারই জের ধরে এবার অসময়ে আসছে বজ্রঝড়। ফেব্রæয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বজ্রঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে, যার স্থায়িত্ব হতে পারে এক থেকে দু’দিন। বজ্রঝড় এক ধরনের ক্রান্তীয় ঝড়। বজ্রপাত ও বিজলি চমকানো সহযোগে ঝড়ের সঙ্গে হয় ভারী বর্ষণ অথবা শিলাবৃষ্টি। বাংলাদেশের পরিবর্তিত ঋতুচক্রে মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে এবং বর্ষা মৌসুমের শেষে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সন্ধ্যার দিকে তীব্র বজ্রঝড়ের শঙ্কা থাকে। তবে, এবার তা একমাস এগিয়ে এসেছে বলে আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
সাধারণত গ্রীষ্মের প্রথম ভাগে বজ্রঝড় ‘কালবৈশাখী’ নামে এবং বর্ষা ঋতুর শেষভাগে ‘আশ্বিনের ঝড়’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। তবে, এবার ফাল্গুন মাসে মানে বসন্তের শুরুতেই বজ্রঝড় আঘাত হানতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. হাবিবুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘বজ্রঝড় হলে বজ্রপাতের সঙ্গে ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে থাকে। আমাদের দেশে প্রাক-বর্ষা ঋতুর সময় বজ্রঝড়ের আশঙ্কা থাকে। তবে, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুচক্রের এই হিসাব পাল্টে যাচ্ছে। কারণ, গত বছর বজ্রঝড় দাপট দেখিয়েছে। অনেকের প্রাণ সংহার করেছে। সরকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকাভুক্ত হয়েছে বজ্রপাত। আমাদের পর্যবেক্ষণে সা¤প্রতিক সময়ে বজ্রঝড়ের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে গেছে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, আশির দশকে মে মাসে গড়ে ৯ দিন বজ্রপাত হত। অথচ, বিগত ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারাদেশে সাত হাজার নয়শ’ ৭২টি বজ্রপাত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে নয়শ’ ৭৮টি, ২০১২ সালে এক হাজার দুইশ’ ১০টি, ২০১৩ সালে এক হাজার চারশ’ ৫২টি, ২০১৪ সালে নয়শ’ ৫১টি এবং ২০১৫ সালে এক হাজার দুইশ’ ১৮টি বজ্রপাতের কথা বলা হয়েছে। পরিবর্তিত জলবায়ু ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চলে বজ্রঝড়ের আশঙ্কা বেশি।
স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত দশ বছরের তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ায় বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের নোয়াখালীর অবস্থান পঞ্চম।
অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়াও মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।