চবি শিক্ষকের গবেষণা

পুরুষের শৈশবের পরিস্থিতিই স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ

32

পরিণত বয়সের কোনো পুরুষের শারীরিক অবস্থা কিংবা অসুস্থতার ব্যাপারে পরিপূর্ণ চিত্র পেতে হলে তার শৈশবকালীন পরিবেশ প্রতিবেশ সম্পর্কে জানা খুব জরুরি। যেখানে আগে মনে করা হতো এই পুরো বিষয়টিই পারিবারিকভাবে (বায়োলজিক্যাল) ঘটে।
এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনটি তুলে ধরেছেন চারজনের একদল গবেষক। বিশ্বের নামকরা জার্নাল ‘নেচার’ এ স¤প্রতি এই গবেষণা প্রবন্ধটি ছাপা হয়। এরপর থেকেই এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানে দ্রæত সাড়া ফেলে। দ্য টেলিগ্রাফ, দ্যা ডেইলি মেইলসহ বিশ্বের ৬৫টি আন্তর্জাতিক মিডিয়া আউটলেটে গুরুত্বের সঙ্গে এই প্রবন্ধের ফলাফল প্রকাশিত হয়। এরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারে এটি বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে। ন্যাচার ইকোলজি এন্ড ইভালুয়েশন জার্নালে সমসাময়িক প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে এটি বর্তমানে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।
আর এই গবেষণাকর্মের অন্যতম একজন ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. ফরিদ উদ্দিন আহামেদ। অপর তিনজন হলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ক্যাসন মাগিড, যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিনিয়ান বেনটিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট চেটারটন।
গবেষণাকর্মটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইকোনমিক এ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (ইএসআরসি)’, ‘দ্যা রয়্যাল সোসাইট এ্যান্ড প্রোস্টেট ক্যান্সার ইউকে’ এবং গবেষকদের নিজস্ব অর্থায়নে সম্পাদিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ও নৃতাত্তি¡ক গবেষণায় এই ফলাফল ‘এক নতুন সংযোজন’।
গবেষণা প্রবন্ধে উঠে আসে যেসব পুরুষ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত স্বচ্ছল পরিবার এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগমুক্ত শৈশব কাটিয়ে বেড়ে উঠে তাদের টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেশি হয়। এরা দ্রæত বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায় এবং দ্রæত দীর্ঘ দৈহিক গড়নের অধিকারী হয়। তবে পরিণত বয়সে তাদের প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে যেসব পুরুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নানা ধরণের সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হতে শৈশব পার করে পরিণত বয়সে আসে, তাদের টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণ কম হয়। এই কম টেস্টোস্টেরন উৎপাদন মানবশরীরের দীর্ঘস্থায়ী (ক্রোনিক) অসুস্থতার জন্য দায়ী। এভাবেই শৈশবের পরিবেশ ও প্রতিবেশ পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
নৃ-বিজ্ঞানী ড. ফরিদ উদ্দিন আহামেদ জানান ‘জার্নালটি ছাপা হওয়ার পর থেকেই তা দ্রæত বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। একজন পুরুষ মানুষের হরমোন নিঃসরণের পরিপূর্ণ মাত্রা তার বংশ-পরম্পরা কিংবা পরিণত বয়সে, সে যেখানে বসবাস করে এর উপর নির্ভর করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নির্ভর করে তার শৈশবকালীন পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর। এটাই এ গবেষণার অন্যতম বড় একটি প্রাপ্তি।’
তিনি জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ৩৫৯ জন ছেলেশিশু ও পরিণত বয়সী পুরুষের উচ্চতা, ওজন, বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছার বয়স, টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত তথ্য নিয়ে ওই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। মোট চারটি ভাগে গবেষণা-নমুনাকে ভাগ করা হয়। এক. সেইসব পুরুষ যারা বাংলাদেশের সিলেটের স্থায়ী বাসিন্দা। দুই. যারা বয়স ৮ বছর হওয়ার আগেই লন্ডনে চলে গেছে এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছে। তিন. যারা পরিণত বয়সে সিলেট ছেড়ে লন্ডনে গেছে এবং চার. বাংলাদেশে থেকে লন্ডনে অভিগমনকারী মা-বাবার সন্তান।
গবেষণায় দেখা গেছে যারা বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে উঠেছে তাদের তুলনায় যারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে যুক্তরাজ্যের পরিবেশ ও প্রতিবেশে বেড়ে উঠেছে তাদের টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেশি।
ড. ফরিদ বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে পুরুষ দেহের শক্তি খরচের মাত্রা নির্ভর করে এর পরিবেশের ওপরও। যে পরিবেশে অসুস্থতা ও রোগসংক্রমণ বেশি এবং যারা খাবার থেকে কম পুষ্টি পায় সেই পরিবেশে দেহকে টিকে থাকার জন্য বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। এ কারণে তখন শরীর কম টেস্টোস্টেরন উৎপাদন করে। শরীরে কম টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের হার আবার মানবশরীরের দীর্ঘস্থায়ী (ক্রোনিক) অসুস্থতার জন্য দায়ী।
অন্যদিকে যারা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবার এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগমুক্ত শৈশব কাটিয়ে বেড়ে উঠেছে তাদের টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেশি থাকে। একইসঙ্গে সুস্থ থাকার জন্য তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয় না বলে তাদের শরীরে বেশি টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসৃত হয় যা তাদের দ্রæত দীর্ঘ দৈহিক গড়নের অধিকারী করে তোলে। তবে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে যাদের এই টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেশি থাকে পরিণত বয়সে তাদের প্রোস্টেট ক্যান্সার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। খবর বাংলানিউজের