পাহাড়ে আবারও রক্তাক্ত সংঘাত কখন আসবে শান্তি?

15

আবারও সন্ত্রাসীদের আধিপতে বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত হল সবুজ পাহাড়ি জনপদ বান্দবারবন। পর্যটকদের কাছে অত্যান্ত আকর্ষনীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গের এ জনপদে অশান্তির বীজ যেন কিছুদিন পর পরই অঙ্কুরিত হয়ে উঠছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সিনেমাটিকভাবে ঘটছে একের পর এক হত্যাকান্ড। হামলার পর পড়ে থাকে লাশের পর লাশ। ৫ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্যের লড়াইয়ের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষও। জেএসএস সন্তু লারমার অনুসারীদের ব্রাশফায়ারে সংস্কারপন্থী ৬ শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পর আবারো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশংকায় ভীত সন্ত্রস্ত স্থানীয়রা। নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করতে সংস্কারপন্থীরা যেমন রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি থেকে অনুসারীদের বান্দরবানে জড়ো করছে, তেমনি তাদের প্রতিহত করতে সশস্ত্র অবস্থানে রয়েছে সন্তু লারমার অনুসারীরা।
আমরা লক্ষ করে আসছি, কয়েক বছর আগেও বান্দরবানে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর অনুসারী সন্ত্রাসী গ্রপগুলোর তেমন তৎপরতা ছিলো না। কিন্তু সা¤প্রতিক সময়ে জেএসএস সন্তু লারমা, জেএসএস সংস্কারপন্থী এমএন লারমা গ্রুপ, ইউপিডিএফ এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গ্রæপের সদস্যরা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মগ পার্টি নামে আরো একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। বান্দরবান সদর থানার অফিসার ইনচার্জ শহীদুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, নিজের এলাকা ছেড়ে যখন অন্য এলাকায় গিয়ে পাহাড়ের আঞ্চলিক বিবাদমান দলগুলো আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে তখনই দেখা দেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের। স্থানীয়দের মতে, আঞ্চলিক দলগুলো বান্দরবানে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বাকি দু’পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি থেকে নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে আসছে।
ব্রাশফায়ারে নিহত রতন তঞ্চঙ্গ্যা যেমন খাগড়াছড়ি থেকে ৫ শীর্ষ নেতাকে তার বাসায় এনে রেখেছিলেন। আর টার্গেটকৃত এই ৬ জনকে হত্যা করতে রাঙ্গামাটি থেকে এসেছিলো সন্তু লারমার অনুসারীরা। গত মঙ্গলবার ভোরে বান্দরবানের বাঘমারা বাজার পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহতদের মধ্যে জেএসএস এম এন লারমা গ্রæপের বান্দরবান শাখার সভাপতি রতন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা রয়েছেন। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে ব্যাপারে পুলিশ এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পায়নি। তবে এম এন লারমা গ্রæপের সাধারণ সম্পাদক উবা মং দাবি করেছেন, জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রæপই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এর আগে চাঁদাবাজি এবং এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও দিনের আলোতে অস্ত্র হাতে গ্রামে ঢুকে ৬ জনকে হত্যার ঘটনা বান্দরবানে এটাই প্রথম।
গ্রামবাসী আশঙ্কা করছেন, এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে আরো পাল্টা সহিংসতা হতে পারে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে। এ অবস্থার দ্রুত অবসান জরুরি। আমরা লক্ষ করছি, কিছুদিন পরপরই অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্যাঞ্চল। পার্বত্যাঞ্চলে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের নামে সক্রিয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলো নিজেরাই পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকছে সবসময়। আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিনিয়ত চলছে বন্দুকযুদ্ধ ও অপহরণের ঘটনা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ঐকমত্যের সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় সে সময়কার বিচ্ছিন্নতাবাদী শান্তি বাহিনীর ২ হাজার সশস্ত্র কর্মী অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। অবসান ঘটে অব্যাহত রক্তপাতের।
দুঃখজনক ব্যাপার, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এখনো এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের দিকে সব সময় বন্দুক তাক করে থাকছে। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে পাহাড়ি জনপদে অপহরণ, রক্তাক্ত সংঘর্ষ, জমি দখলের খবর। পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। আঞ্চলিক গ্রুপগুলোর সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে হবে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করে এর সুফল দৃশ্যমান করতে হবে পার্বত্যবাসীর কাছে।