পাহাড়ে আবারও উচ্ছেদ অভিযান যত গর্জন তত বর্ষণ হবে তো?

15

গ্রীষ্মের পরেই বর্ষা। কিন্তু বৈশাখের তাপদাহ থামাতে অকালে বৃষ্টি ঝড়া উষ্ঠাগত প্রাণের আরাধনা থাকে। এসময়ও অনেক অঘটন ঘটে যায়। অঘটনের আরেক নাম পাহাড় ধস। সেই অঘটনে অতীতে চট্টগ্রাম নগরসহ কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটিতে অবৈধ বসবাসকারীদের মৃত্যুর মিছিল হয়েছে। যা নিয়ে গনমাধ্যমগুলো বেশ সরব হয়ে উঠেছিল, প্রশাসনের তোড়জোড়েরও কমতি ছিল না। কিন্তু দিনের শেষে দেখা যায় যে লাউ সেই কদু। এবার অবশ্যই আগে থেকেই প্রশাসনের নড়াচড়া লক্ষ্য করার মত। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসন গত কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রামে পাহাড়ে মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা বসতি উচ্ছেদের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১৯তম সভায় এ উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়। জানা যায়, সভায় ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড় আগামী এক মাসের মধ্যে অবৈধ দখলমুক্ত করতে মালিকদের নির্দেশ দেন বিভাগীয় কমিশনার। একই সঙ্গে ওইসব পাহাড়ে বসবাসকারীদের জন্য অবৈধ গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় । এসব পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং বাকি সাতটির মালিক সিটি কর্পোরেশন, রেলওয়ে, চট্টগ্রাম ওয়াসা, গণপূর্ত ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, আগামী ১৫ মের মধ্যে এসব পাহাড় অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে। সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের নিজ উদ্যোগেই পাহাড়কে অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়গুলোকে তাদের অবৈধ বসতি সরিয়ে নিতে চিঠি দেওয়া হবে। পাহাড় দখলমুক্ত ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসন সহায়ত করবে বলেও সভায় সিদ্ধান্ত হয়।
বর্ষার আগেই প্রশাসনের এ ধরণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়, যদিও অতীতে এমনটি উদ্যোগের বেশিদিন স্থায়ী হতে দেখা যায় নি। গেল বর্ষায়ও ডাকঢোল পিটিয়ে অভিযানে নামে জেলা প্রশাসন। বিভিন্ন পাহাড়ে কিছু বসতি উচ্ছেদও হয়। অভিযান থেমে যেতেই ফের গড়ে ওঠে অবৈধ বসতি। ফলে বিষয়টি ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ প্রবাদে পরিনত হয়। আমরা মনে করি, অভিযান ও উচ্ছেদের পর পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং বসতি বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নচেৎ সরকারের কোষাগারের অর্থ ও শ্রমের ক্ষয় ছাড়া আর কোন উপকার আসবে না।
উল্লেখ্য যে, জেলা প্রশাসনের হিসেবে সরকারি-বেসরকারি ২৮ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড়েই’ বসবাস করছে ৮৩৫ পরিবার। পরিবারগুলোর বসবাস অবৈধ স্থাপনায় অথচ রয়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। পাহাড়খেকো ভ‚মিদস্যুরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব বসতি গড়ে তোলে। অবৈধ বসতিতে দেয়া হয় গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড় ধসে বেঘোরে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বৃষ্টি শুরু হতেই উচ্ছেদ অভিযানে নামে প্রশাসন। কিছু বসতবাড়ি উচ্ছেদ হয়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির। তবে যারা এসব অবৈধ কর্মকান্ডে জড়িত তাদের কিছুই হয় না।
পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত বেশিদূর যায় না। ফলে বেপরোয়া পাহাড় দখল থামানো যাচ্ছে না। মহানগরীর প্রতিটি পাহাড়-টিলা বেদখল হয়ে গেছে অনেক আগে। পাহাড়ের যেসব অংশে বসতি নেই সেগুলো কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনের আলোতে চলছে পাহাড় নিধন। মহানগরীর আশপাশে এমনকি বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ও এখন আর অক্ষত নেই। সেসব পাহাড়-টিলায়ও গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি। পাহাড়-টিলা ধ্বংস করে বাড়িঘর তৈরি করা হচ্ছে। মাটি কেটে নিয়ে ভরাট করা হচ্ছে পুকুর-ডোবা-জলাশয়। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে কিছু জরিমানা আর পরিবেশ আইনে মামলা করেই দায় শেষ করছে। ফলে বন্ধ করা যাচ্ছে না পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড় দখলের সাথে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা জড়িত। তাদের এ শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে পারে না প্রশাসন। সুতরাং গোড়াই গলদ রেখে আগাই পানি দেয়ার ফল কখনো ভালো হয় না।
বলাবাহুল্য, ২০০৭ সালের ১১ জুলাই একদিনের টানা ভারী বর্ষণে মহানগরী ও এর আশপাশের এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার পর পাহাড় সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি পাহাড় সুরক্ষায় বেশকিছু সুপারিশ পেশ করেন। তবে এসব সুপারিশের কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। রোধ করা যায়নি বেপরোয়া পাহাড় নিধন। ফলে প্রতিবছরই বর্ষায় পাহাড় ধস আর গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। পাহাড় নিধনের ফলে পরিবশে ধ্বংস হচ্ছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা মাটিতে নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে পানিবদ্ধতা আরও প্রকট হচ্ছে। শুধুমাত্র জলাবদ্ধতাই নগরীতে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।