পাহাড়ে আবারও উচ্ছেদ অভিযান

এ গল্পের শেষ হওয়া জরুরি

16

আষাঢ়ের বর্ষণ শুরু হয়েছে দেরিতে, তাই পাহাড় থেকে অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে দেরিতে হচ্ছে! এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। মূলত চট্টগ্রামে পাহাড়ে ঝুঁকিতে থাকা বসতি উচ্ছেদে তোড়জোড় শুরু হয়েছে গত মে মাস থেকে। এপ্রিলে বসে জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বর্ষার আগেই পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে প্রশাসন। প্রশাসন ঢাকঢোল পিটিয়ে বিভাগীয় কমিশনারকে সাথে নিয়ে নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় অভিযান শুরু করেন, কিন্তু এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দলবল নিয়ে প্রতিরোধের মুখে রণভঙ্গ দিয়ে প্রশাসন ফিরে আসে। এরপর গত জুনমাসজুড়ে আর কোন অভিযানের কথা আমাদের জ্ঞাতে নেই তবে আষাঢ়ের ভারি বর্ষণের মাঝে প্রশাসন পাহাড়তলী, আকবরশাহ, খুলশি, বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে গড়ে উঠা খেটেখাওয়া মানুষের বসতি উচ্ছেদে নেমেছে। বেশকয়েকটি পরিবারকে এখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। যদিও এ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে বিকল্প কোন ব্যবস্থা প্রশাসন নেয় নি।
আমরা লক্ষ্য করে আসছি, প্রতিবছর বর্ষার শুরুতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। গেল বর্ষায়ও ঢাকঢ়োল পিটিয়ে অভিযানে নামে জেলা প্রশাসন। বিভিন্ন পাহাড়ে কিছু বসতি উচ্ছেদও হয়। অভিযান থেমে যেতেই ফের গড়ে ওঠে অবৈধ বসতি।
জেলা প্রশাসনের হিসেবে সরকারি-বেসরকারি ২৮ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড়েই’ বসবাস করছে ৮৩৫ পরিবার। পরিবারগুলোর বসবাস অবৈধ স্থাপনায় অথচ রয়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। পাহাড়খেকো ভ‚মিদস্যুরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব বসতি গড়ে তোলে। অবৈধ বসতিতে দেয়া হয় গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড়ধসে বেঘোরে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বৃষ্টি শুরু হতেই উচ্ছেদ অভিযানে নামে প্রশাসন। কিছু বসতবাড়ি উচ্ছেদ হয়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির। তবে যারা এসব অবৈধ কর্মকান্ডে জড়িত তাদের কিছুই হয় না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত বেশিদূর যায় না। ফলে বেপরোয়া পাহাড় দখল থামানো যাচ্ছে না। নগরীর প্রতিটি পাহাড়-টিলা বেদখল হয়ে গেছে অনেক আগে। পাহাড়ের যেসব অংশে বসতি নেই সেগুলো কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনের আলোতে চলছে পাহাড় নিধন। শুধু নগর নয়; আশপাশে এমনকি বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ও এখন আর অক্ষত নেই। সেসব পাহাড়-টিলায়ও গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি। পাহাড়-টিলা ধ্বংস করে বাড়িঘর তৈরি করা হচ্ছে। মাটি কেটে নিয়ে ভরাট করা হচ্ছে পুকুর-ডোবা-জলাশয়। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে কিছু জরিমানা আর পরিবেশ আইনে মামলা করেই দায় শেষ করছে। ফলে বন্ধ করা যাচ্ছে না পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড় দখলের সাথে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা জড়িত। তাদের এ শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে পারে না প্রশাসন।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বর্ষা সামনে রেখে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখার বিষয়। তবে আমরা মনে করি, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের নেতৃতে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে পাহাড়ে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি কিছুটা হলেও হ্রাস পেত। কিন্তু সেই সময়ের ভয়াবহ পাহাড় ধস ও প্রাণহানির ঘটনার পরও প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের কেউ তা থেকে কোন শিক্ষা নেয়নি, ফলে প্রতিবছরই বর্ষায় পাহাড়ধস আর গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। পাহাড় নিধনের ফলে পরিবশে ধ্বংস হচ্ছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা মাটিতে নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে পানিবদ্ধতা আরও প্রকট হচ্ছে। শুধুমাত্র পানিবদ্ধতাই নগরীতে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে কাউকে আমরা খেলা করতে দেবো না। বর্ষা আসলে উচ্ছেদ পরে আবার বসতি এটা চলতে পারে না। এর স্থায়ী সমাধান দরকার। ’ আমরা জেলা প্রশাসনের এ বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। আমরাও চাই উচ্ছেদ উচ্ছেদ অভিযানের নামে আষাঢ়ি গল্প আর নয়; বরং সত্যিকার উচ্ছেদ এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।