পাহাড়ধসে আবারো প্রাণহানি

পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে

7

আবারো পাহাড়ধসে বেশ কয়েকটি তরতাজা প্রাণবধ’র ঘটনা ঘটল আমাদের এ চট্টগ্রামে। পাশাপাশি দেয়াল ধসের একটি ঘটনাও ঘটেছে। এ দুই ঘটনায় একই পরিবারের ৩ জনসহ ৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। শনিবার মধ্যরাত ও রবিবার ভোরে নগরীর পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর ও ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড় ও দেয়ালধসে নির্মম এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা গেলেই ‘সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাওয়ার’ অবস্থা হয় চট্টগ্রামবাসীর। কারণ অতিবৃষ্টি হলেই নির্ঘাত জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটবেই। আর তাতে সারি সারি লাশের স্তূপ জমবে। নিত্যচলা এ দুর্যোগের জন্য শুধু কি প্রকৃতিদায়ী ? নাকি আমাদের মনুষ্যত্বহীন আচরণই দায়ী-এর একটি বিহীত করা জরুরি।
ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে গত মঙ্গলবার হতে শনিবার পর্যন্ত টানা পাঁচদিন ভারি বর্ষণ হয়েছে চট্টগ্রামে । একটানা বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর পাহাড়গুলোর মাটি নরম হয়ে যায়। এরপর জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। সংস্থাগুলোর চেষ্টা ছিল পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে লোকজনকে সরিয়ে দেয়া। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়। এরপরও অনেকেই থেকে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে ঘটে গেল পাহাড়ধসের ঘটনা। বর্ষা মৌসুম বা যেকোন মৌসুমে অতি বৃষ্টির কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামজুড়ে পাহাড় ধসে সাধারণ মানুষের মৃত্যু কোনভাবেই যেন থামানো যাচ্ছে না। প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতির ঢাকঢোলের মধ্যেও হতদরিদ্র অনেক পরিবার পাহাড়ের চূড়া বা ঢালু ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে না যাওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের। দীর্ঘ দেড় যুগের অধিক সময় ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম নগরী, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পাহাড়ধসে প্রাণহানি-ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনকে বেশ তৎপর দেখা গেলেও পাহাড়ধস ঠেকানোর ব্যাপারে পরিকল্পিত ও গ্রহণযোগ্য কোন উদ্যোগ তেমন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে বিন্নাঘাস লাগিয়ে পাহাড়ধস থামানোর প্রয়াস নিয়েছে বটে নগর পরিকল্পক প্রকৌশলীরা। এতে পাহাড়ধস ঠেকানো যাবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। কারণ আমাদের জানা থাকার কথা যে, শুধু প্রাকৃতিক কারণেই চট্টগ্রাম মহানগরসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে পড়ছে তা কিন্তু নয়। নিয়ন্ত্রণহীন পাহাড় কাটা, পাহাড়ে স্থাপনা নির্মাণসহ আরো কিছু অপরিণামদর্শী মনুষ্য তৎপরতার পরিণামে ধসে পড়ছে পাহাড়। সুতরাং পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে হলে আগে পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এ না হলে অন্যকোন বিকল্প ব্যবস্থায় পাহাড়ধস বন্ধ করা যাবে না বলে আমাদের ধারণা।
অতি বৃষ্টিতে প্রাণহানিতো ঘটছেই; এর বাইরে পরিবেশ-প্রকৃতিতে এর ভয়ঙ্কর বিরূপ প্রভাব নিয়ে কারো কোনো চিন্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না। নির্বিচারে পাহাড় কেটে অসংখ্য ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। পাহাড় কেটে চলছে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির রমরমা বাণিজ্য। এমনকি সরকারি সংস্থা ও সিটি কর্পোরেশন এবং বেসরকারি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উন্নয়ন কর্মকাÐের নামে পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর বাটালি হিল, ম্যাজিস্ট্রেট হিল, পার্সিভেল হিল, দেব পাহাড়, খুলশী, পাহাড়তলী ও বায়েজিদ এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে যে প্রাসাদ ও অট্টালিকা গড়ে তোলা হয়েছে-তাতে দেখা যাবে সরকারি-বেসরকারি সকলেই সমানে এ পাহাড় কর্তনে নিয়োজিত। মূলত দীর্ঘকাল ধরে পাহাড় কাটা, স্থাপনা নির্মাণ, পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছপালা উজাড়ের ফলে পাহাড়ের অবশিষ্ট মাটি আলগা হয়ে যায়। যার ফলে বৃষ্টি হলে পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে নেমে আসা ঢল আলগা মাটি ধুয়ে নিয়ে নিচে নামতে থাকে। পাহাড় হয়ে পড়ে দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ। ঘটে পাহাড়ধস। মারা যায় পাহাড়ের চূড়ায় বা ঢালে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষ। শুধু বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের ঢালের বসতি উচ্ছেদের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, উচ্ছেদকৃত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ধস ঠেকানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা থেকে পাহাড়ধসের জন্য দায়ী যেসব কারণ চিহ্নিত করে প্রস্তাবনাসহ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো বিবেচনা করে কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।