পাহাড়জুড়ে খুশির জোয়ার

বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি প্রতিনিধি

15

আলো দাও, আলোকিত হবো; মুছে যাক গ্লানি- এমন নানা স্লোগান, বাহারী পোশাক আর ঐতিহ্যবাহী সাজ ও বর্ণিল আয়োজনে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চলছে ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উৎসব। এতে অংশ নিচ্ছেন হাজারো মানুষ। তারা মেতে উঠেছেন আনন্দ-উচ্ছ¡াসে। তাদের পদভারে মুখর পাহাড়ি জনপদ।
বান্দরবান : পার্বত্যমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি বলেছেন, বৈসাবি উৎসবের মধ্যদিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে এই পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি স্থাপনে শান্তিচুক্তি হয়েছিল। তাঁর হাত ধরে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে পুরো পার্বত্য এলাকা।
মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার সাথে সাথে পাহাড়ের প্রতিটা অঞ্চলের মানুষের জন্য সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধ, ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করবো।
গতকাল শনিবার সাংগ্রাই মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষে পাহাড়ি গুণিজনদের মাঝে সম্মাননা প্রদানকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সাংগ্রাই উৎসবে স্থানীয় রাজার মাঠে বয়োজ্যেষ্ঠ পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং গুণিজনদেরকে সম্মাননাও প্রদান করেন পার্বত্য মন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শফিউল আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল মো. ইয়াছির আরাফাত, পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য লক্ষীপদ দাশ, সদস্য কাঞ্চনজয় তঞ্চঙ্গ্যা, সদস্য সিং ইয়ং ম্রো, সদস্য ম্রাসা খেয়াংসহ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ও ১২ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ।
এদিকে উৎসব ঘিরে শনিবার সকালে বান্দরবান স্থানীয় রাজার মাঠ থেকে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় পাহাড়ি-বাঙালি তরুণ-তরুণীরা ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানান।
নতুন বছরকে বরণ করতে প্রতিবছর পার্বত্য এলাকার মারমা সম্প্রদায়ের জনসাধারণ উদযাপন করে উৎসব। ১৩ এপ্রিল শুরু হয়ে এই উৎসব চলে ৪ দিনব্যাপী। আজ ১৪ এপ্রিল বিকেলে পবিত্র বুদ্ধমূর্তি ম্লান, রাতব্যাপী পিঠা তৈরি উৎসব, ১৫ এপ্রিল বিকালে মৈত্রি পানি বর্ষণ, ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা, তৈলাক্ত বাঁশে আরোহন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় বিহারে বিহারে সমবেত প্রার্থনার মধ্যদিয়ে শেষ হবে উৎসব।
খাগড়াছড়ি : জেলার গুইমারাতে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে শোভাযাত্রা করা হয়েছে। বিকেলে মারমা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ উৎসব সাংগ্রাই উপলক্ষে ‘গুইমারা সাংগ্রাই উদ্যাপন কমিটির’ উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। উপজেলার রামসু বাজার এলাকা থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরীর নেতৃত্বে শোভাযাত্রাটি গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম সাজেদুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি সবাইকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বৈসাবি ও বৈশাখীর শুভেচ্ছা জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সিন্দুকছড়ি সেনা জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল রুবায়েত মাহমুদ হাসিব, গুইমারা উপজেলা চেয়ারম্যান উষেপ্রু মারমা, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ঝর্ণা ত্রিপুরা, গুইমারা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিদ্যুৎ কুমার বড়ুয়াসহ বিভিন্ন দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কারবারী ও নানা বয়সের নারী-পুরুষ অংশ নেন।
রীতি অনুযায়ী ১৪ এপ্রিল পানি বর্ষণ করে পুরাতন বছরের দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলে নতুন বছরকে আবাহন জানানো হয়। যুবক-যুবতীরা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে পরস্পরকে পবিত্র করে নেবে। এভাবেই তারা পুরাতন বছরকে বিদায় জানায়।
রাঙামাটি : জেলার ঘরে ঘরে উদ্যাপন হচ্ছে প্রাণের উৎসব বৈসাবি। এখানে বহুকাল ধরে হয়ে আসছে পাহাড়িদের প্রধান সামাজিক উৎসবটি। বর্ষবিদায় ও বরণ উপলক্ষে ত্রিপুরা স¤প্রদায় বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাই আর চাকমারা পালন করে বিজু উৎসব নামে। এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বৈসাবি।
শুক্রবার পানিতে ফুল ভাসিয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের উৎসব। গতকাল শনিবার ছিল উৎসবের মূল দিবস। এদিনকে চাকমারা বলে মূলবিজু। এদিন যার যা সামর্থ্য দিয়ে করে আপ্যায়নের আয়োজন। আজ পহেলা বৈশাখ নতুন বছরের মঙ্গল প্রার্থনার মধ্যদিয়ে শেষ হচ্ছে তিনদিনের বৈসাবি বা বিজু উৎসব। উৎসবে মেতেছে রাঙামাটিসহ পাহাড়ের মানুষ।
বাহারি খাবার আপ্যায়নে মেতেছে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের নারী-পুরুষ।
রাঙামাটিতে সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার, সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা নিজ নিজ বাসভবনে আপ্যায়নের মধ্যদিয়ে সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় করেছেন।
এদিকে উৎসবে চাকমাদের গেঙখুলি গীতের (লোকজ পালা গান) আসর, বাঁশ নৃত্য, মারমাদের জলকেলি এবং ত্রিপুরাদের গৈড়াইয়া নৃত্য মাতিয়েছে পাহাড়কে।
আজ রবিবার বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন ও উৎসবের তৃতীয় দিন শেষ হবে তিনদিনের বৈসাবি উৎসব। এদিন মন্দিরে মন্দিরে আয়োজন হবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের। পাশাপাশি বাংলা নববর্ষ বরণে আয়োজন করা হয়েছে বৈশাখী উৎসবের। সোমবার থেকে শুরু হবে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি উৎসব।