হিজরি বর্ষবরণ হোক সর্বত্র

পালিত হোক রাষ্ট্রীয় আয়োজনে

মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার

14

হিজরি সন আমাদের জন্য অপরিহার্য, একে অবহেলা করার সুযোগ নাই, কারণ এর কোন বিকল্পও নাই। জাতীয়ভাবে পালিত আমাদের যে সব দিবস বাংলা সন, বা খ্রিস্টাব্দ অনুসরণ করা হচ্ছে এসবের বিকল্প আছে। যেমন, পহেলা বৈশাখ প্রতিবছর পালিত হয় ১৪ এপ্রিল তারিখে। ২১ ফেব্রæয়ারি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যদিও এটি মায়ের ভাষা বাংলার পরিবর্তে খ্রিস্টাব্দের অনুসরণে ইংরেজি তারিখে পালিত হয়। ইচ্ছে করলে একে ৮ বা ৯ ফাল্গুনে পালন করা যাবে। এভাবে প্রত্যেকটা বাংলা তারিখের যেমন বিকল্প ইংরেজি তারিখ রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে ইংরেজি তারিখের বিকল্প বাংলা তারিখ। কিন্তু এমন কোন বিকল্প চলে না আমাদের হিজরি ক্যালেন্ডারের আরবি তারিখে। যেমন, কোনদিন হিজরি নববর্ষ শুরু সেটা চাঁদ ওঠার উপর নির্ভরশীল, এর বিকল্প কোন নিশ্চিত বাংলা বা ইংরেজি তারিখ ঘোষণা করা যায় না। কোন সরকারেরও সাধ্য নেই যে, অমুক দিন থেকে রোজা শুরু বা ঈদ অমুক তারিখ এ কথা বলে দেওয়ার। মোট কথা, আমাদের ইসলামের যেমন বিকল্প নাই, তেমনি বিকল্প নাই ইসলামের দান এ হিজরি ক্যালেন্ডারের, আলহামদুলিল্লাহ্। সুতরাং মুসলমান মাত্রই এই হিজরি সনের অনুসারি, পক্ষান্তরে বলা যায়, এ সন বর্জন করে মুসলমানিত্ব বজায় রাখা সম্ভব না।
রোজা, ঈদ, কোরবানি, হজ পালন থেকে শুরু করে সব ইসলামি কর্মকান্ড ও অনুষ্ঠানে এটাই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। সুতরাং হিজরি সন যেহেতু অপরিহার্য, তাই মুসলমানদের কাছে বর্ষ বরণের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব পাবার কথা সর্বাধিক। কিন্তু আজ বাংলাদেশে এর প্রকৃত চিত্র উল্টোটাই। ইসলাম যে আজ সবক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের শিকার তা বুঝবার জন্য এ হিজরি নববর্ষ পালনের বাস্তব চিত্র অপরাপর বর্ষ বরণের সাথে তুলনা করলেই পরিষ্কার ফুটে ওঠবে। থার্টিফাস্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষ বরণ একটা বিজাতীয় সংস্কৃতি শুধু নয়, বরং এটি এ পর্যন্ত অশ্লীলতা ও বিশৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। এ রাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয় প্রতিবছর। কত নারী প্রকাশ্যে ইজ্জত হারিয়েছে এ রাতে তা জাতির অজানা নয়। এরপরও অপসংস্কৃতি আমদানিতে ব্যস্ত কিছু বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতি কর্মী, সাংবাদিক কোন অদৃশ্য ইশারায় ইংরেজি নববর্ষ পালনকে সুকৌশলে, এমনকি প্রকাশ্যে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। অথচ, এরা সবাই কিন্তু পরিচয়ে অমুসলিম নয়। বেশিরভাগই মুসলিম পরিচয় বহনকারী। ওরা কি জানে হিজরি নববর্ষ কখন আসে, কখন যায় ? আমাদের জাতীয় টেলিভিশনের কি কোন গরজ নাই এ দিনটিকে আমল দেবার! আমাদের জাতীয় পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন যেভাবে ইংরেজদের কালচার নিয়ে মেতে ওঠে, মনেই হবে না যে, আজ থেকে সত্তর বছরেরও কম সময় আগে এই সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের আমরা পালাতে বাধ্য করেছিলাম। অথচ, এরা সবাই নিরব থাকে হিজরি নববর্ষ প্রবেশের সময়। মোট কথা, ইসলাম ও মুসলমানরা আজ সর্বাত্মক আগ্রাসনের শিকার। এখান থেকে বের হওয়া জরুরি। হিজরি নববর্ষ উদযাপনে আজ দরকার জাতীয় ঐক্য। এ নববর্ষ পালন করতে হবে মহাধুমধাম করে সব জেলায় জেলায়। প্রয়োজনে বিশাল বাজেট নিয়ে মাঠে নামতে হবে বৈচিত্র্যময় চোখ ঝলসানো কর্মসূচি ও বিনোদনমূলক আয়োজন দিয়ে। চট্টগ্রাম থেকে এর যাত্রা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে সাংগঠনিক সুন্নিদের সচেতন পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ছে স¤প্রতি। চট্টগ্রামের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ হচ্ছে এখানকার বর্ষবরণ, যদিও এর আরো ব্যাপক আকর্ষণের উপর নির্ভর করে জাতীয়ভাবে পুনর্জীবন। তবে আশার কথা যে, চট্টগ্রামের হিজরি নববর্ষ উদ্যাপন জনপ্রিয় হয়ে ওঠার প্রেক্ষিতে এখানকার জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকাগুলোতেও হিজরি নববর্ষ গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ, প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের কূটনীতিকদের সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে একদিন এর জাতীয় মর্যাদা ফিরে আসবে। এ জন্য পরিকল্পিত উপায়ে হিজরি নববর্ষ উদ্যাপন জোরদার করতে হবে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সব জেলা-উপজেলায়। জাতীয় পর্যায়ে একে উদ্যাপনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, গোলটেবিল আলোচনাসহ সম্ভাব্য সব কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। মহরম মাসের ওয়াজ-মাহফিলের আলোচনায় হিজরি নববর্ষ গুরুত্বসহ স্থান পেতে হবে। যেখানে সম্ভব হয়, স্থানীয় স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ে এ উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে। হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে একদিন ছুটি থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছুটি থাকা যদি যৌক্তিক হয়, একে উদযাপনের যৌক্তিকতা আরো বেশি হবার কথা। কিন্তু নানা রঙবেরঙের অনুষ্ঠান সেখানে প্রতিনিয়ত আয়োজিত হলেও হিজরি বর্ষ নিয়ে কিছু থাকে না, তাই শিক্ষার্থীরাও জানেনা তাদের স্কুল ছুটির কারণ কি ? হিজরি নববর্ষই বা কি ? এমনকি শিক্ষকদের কয়জন এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল এ প্রশ্নও আজ অনেকের। যা, ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য অবশ্যই অবমাননাকর, তাই এই প্রাচীর অবশ্যই ভাঙ্গতে হবে।
সাধারণ, ঐচ্ছিক ও নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটির তালিকানুসারে দেশে এখনো বেশিরভাগ সরকারি ছুটি দেওয়া হচ্ছে এই হিজরি সন অনুসারে। সে হিসেবেও হিজরি সনের ব্যবহার অন্য সনের চেয়ে বেশিই চলছে। এর বয়সও কম নয়। বরং সবচেয়ে পুরোনো। বাংলা সন সম্রাট আকবরের দান, তিনি চলমান হিজরি সন অনুসরণ করে বাংলা সন চালু করেন। এর বয়স চারশ। ইংরেজরাই দিয়েছে তাদের সন খ্রিস্টাব্দ, সে হিসেবে দুইশ বছর। আর, হিজরি সন এসেছে মুসলিম বিজয়ী, দরবেশ ফকিরদের হাতে। তাই এর বয়স হাজারেরও বেশি। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় ৭১২ খ্রিস্টাব্দে, তখন ছিল হিজরি ৯২ সন। সে হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে হিজরি সনের বয়স তেরশ’র বেশি। আর ড. গোলাম সাকলাইন এর ‘বাংলাদেশ’র সূফি সাধক’ গ্রন্থের তথ্যমতে, লালমনিরহাট-কুঁড়িগ্রাম সীমান্তের পঞ্চগ্রামে মাটির নিচে এমন একটি মসজিদের হদিস পাওয়া গেছে যেটির নির্মাণ সন আরবিতে ৬৯ হিজরি লিখা ছিল। সে হিসেবে ১৩৭০ বছর আগেও এখানে হিজরি সনের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্যবহারের দিক থেকে এবং প্রাচীনত্বের দিক থেকেও এই সনটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি গণতন্ত্রের মূল কথা হয়, তবে এটি বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষের অপরিহার্য সন। এরপরও একে অবহেলার কারণ রহস্যজনক।
হিজরত ও হিজরি সন ইসলামের চেতনার স্মারক, ইসলামের পূর্ণতার মিনার। একে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিতেই হবে। Islam is the complete code of life এই দাবিটার বিরোধিদের হাতের বড় অস্ত্র হতে পারত, যদি ইসলামের কোন নিজস্ব ক্যালেন্ডার না থাকত। মুসলমানরা যেন সন গণনাতেও অন্যের কাছে হাত পাততে না হয় সে ব্যবস্থা করে গেছেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুখ (রা.) এবং তাঁর দুই শীর্ষ সহযোগী হযরত ওসমান জিন নুরাইন (রা.) ও শেরে খোদা মাওলা আলী (ক.)। হিজরি সন প্রতিষ্ঠিত হয় ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে, দ্বিতীয় খলিফার সময়ে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দলিল, চিঠিপত্র ইত্যাদির সনওয়ারি সংরক্ষণের প্রয়োজন পূরণের জন্য। আরবি চান্দ্রমাস মহরম, সফর, রবিউল আউয়াল ইত্যাদি আগেও ছিল। কিন্তু কোন বর্ষ গণনা রীতির অনুপস্থিতির কারণে, রাষ্ট্রীয় দলিল সংরক্ষণের তারিখ নিয়ে পরবর্তীকালে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা ছিল, যেমন ১০ মহরম তারিখটা প্রতিবছর আসবে, কিন্তু কারবালার ঘটনাটা কোন বছরের ? এমন প্রশ্নের সুস্পষ্টতার জন্য দরকার হয় এর সাথে সংশ্লিষ্ট বর্ষের। যেমন, এখন আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি, কারবালা হয় ৬১ হিজরির ১০ মহরম, যা হিজরি সনের কল্যানেই সম্ভব হয়েছে। এর আগে আরবি মাস ছিল বলেই আমরা ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে ঈদে মীলাদুন্নবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পালন করি, কিন্তু তখন আরবে প্রচলিত বর্ষ গণনা পদ্ধতিসমূহ আমাদের ছিল না বলেই বলতে হয়, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল তারিখটা। ইতোপূর্বে, আরবে প্রচলিত অপরাপর সন গণনার যেমন কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না, তেমন এসবের ছিল না কোন সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, যেমন নূহ (আ)’র বন্যা সন, হস্তি সন, হবুতি সন, খসরু সন ইত্যাদি আরো বহু রকম। যেমন মীলাদুন্নবী (দরুদ)’র উক্ত তারিখ বুঝাতে ব্যবহৃত হস্তি সনের বর্ণনার একটি উদাহরণ হল, Mohammed was born the year of the Elephant, the year of Abraha’s unsuccessful expedition against Mecca. (W.M.Watt, Mohammed at Mecca, P-33, )

নিজস্ব মাস ছিল, কিন্তু বছর গণনা রীতি চালু না থাকায় এভাবে ইতোপূর্বে বিদ্যমান ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু এভাবে চিরদিন যেতে পারে না। তাই, ইসলাম তার আভিজাত্যের জানান দিল সন গণনায় নিজস্ব রীতি চালু করে। এতে স্মারক কি হবে, আর কোন মাস দিয়ে শুরু হবে এ প্রশ্নদ্বয়ের বিভিন্ন পরামর্শ যাচাই-বাছাই করে, সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হল মাওলা আলী (ক.)’র প্রস্তাব হিজরতকে স্মারক ধরে হিজরি সন নাম দেওয়ার বিষয়টি। আর ওসমান জিন নুরাইন (রা.) বলেন যে, মহরম মাস সব স¤প্রদায়ের কাছে পবিত্র মাস হিসেবে গণ্য হয়, সুতরাং এ মাস হোক হিজরি সনের প্রথম মাস। সবাই একমত হলেন। তাই হিজরি সন শুরু হয় মহরম দিয়ে। অথচ হিজরতের ঘটনা মহরমে নয়, ১২ রবিউল আউয়ালে হয়েছিল। কিন্তু হিজরি সন শুরু হয় মহরম মাস দিয়ে। অর্থাৎ হিজরি সন গণনায় হিজরতের বছর ৬২২ খ্রিস্টাব্দ হতে ধরা হয় বটে, কিন্তু মাস ধরা হয় রবিউল আউয়ালের পরিবর্তে দুই মাস পিছিয়ে মহরম থেকে। এ চান্দ্রমাসভিত্তিক হিজরি সনের গণনায় কোরআনের অনুসরণে ইতোপূর্বে প্রচলিত মল মাস বা অতিরিক্ত মাস (ক্বোরআন ৯:৩৭) বর্জন করা হয়, এবং বার মাসে (ক্বোরআন, ৯:৩৬, সূরা তওবা) বছর ধরা হয় বিধায় এখানে বছর হয় ৩৫৪ দিনে এবং কোন অতিবর্ষ গণনার বিধান নাই। ইসলামের এ আধুনিক সন গণনা রীতি আমাদের আভিজাত্য ও গর্বের ধন। এর আগমন হয় পহেলা মহরম। এ দিন, বা আগের দিন পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশ, বিশেষত আরব বিশ্বে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ নানা বৈচিত্র্যময় আয়োজনে হিজরি নববর্ষ আয়োজিত হয়। আসুন, আমরাও করি নানা আয়োজন। দাবি জানাই সরকারি আয়োজনের। দাবি জানাই, দিনটির ঐচ্ছিক ছুটিকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার। সবাইকে ১৪৪০ হিজরির শুভেচ্ছা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, আইনজীবী