পাকিস্তান : সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশ

আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলী

10

[আন্তর্জাতিক রিপোর্ট-৭১: ‘দি ইকনমিস্ট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদ]
বাংলাদেশ নামক দেশটি এখন পশ্চিম বঙ্গে। গত সপ্তাহান্তে সীমান্তের ওপারে আম বাগানের ছায়ায় এই বাংলাদেশ নামক দেশটির অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। রিপোর্টে জানা যায় এই সপ্তাহে ৪০০ প্রতিরোধকারী সৈন্য ২০০০০০ লক্ষ শরণার্থী সেখানে আশ্রয় নেয়। পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলায় তারা এখানে পালিয়ে আসে। গত সপ্তাহ দুয়েক এর মধ্যে সেখানে বড় ধরনের কোন যুদ্ধ সংগঠিত হয়নি। বিপর্যস্থ বাঙালিরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসার পূর্বেই ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে নিজ শহর এমনকি তাদের অস্থায়ী সরকারের হেড কোয়ার্টার ত্যাগ করেন। সপ্তাহের শেষে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের সব শহর সড়ক নদীপথসহ সকল যোগাযোগ মাধ্যম দখল করে নেয়। পূর্ব বাংলার আসামের নিকটবর্তী সিলেটের কিছু এলাকা বাঙালির দখলে আছে বলছে। কিন্তু এটা দিয়ে প্রমাণ করা যায় না বাঙালিরা পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার মুখে ঐ সমস্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ বা দখলে রাখতে পারবে। বাঙালি প্রতিরোধকারীরা দেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্ততি নিচ্ছে। তবে এখনো তাদের অস্ত্র, মনোবল ও নেতৃত্ব এবং এটা তারা করতে পারবে কী না এ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা দুষ্কর। সামরিক অভিযান ও যুদ্ধে জয়লাভের লক্ষ্যে পাকিস্তানি সরকার শুরুতে রাজনৈতিক সংলাপের যে সুযোগ দিয়েছিল এখন তারা আর তা দেবে না। পাকিস্তানি রেডিও নিয়মিতভাবে সামান্য কিছু বিদ্রোহী বাঙালি ‘দুষ্কৃতকারী’দের ভারত উস্কানি দিচ্ছে বলে প্রচার করে চলেছে। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে সেনাবাহিনী ও বেসরকারি চাকরি থেকে বাঙালিদের বের করে দেয়া হচ্ছে এবং ভারতের সাথে চক্রান্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করার চক্রান্তের জন্য বন্দী আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার বিচারের প্রস্ততি নিচ্ছে পাকিস্তান সরকার। পকিস্তানের গৃহযুদ্ধে ভারতের নিরপেক্ষ ভূমিকা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ভারত সরকার ১৬ এপ্রিল এক জোরালো বিবৃতি প্রদান করে। বিবৃতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরিকল্পিত গণহত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য পোষনকারী কোলকাতায় নিযুক্ত পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনারকে বহিষ্কারের জন্য পাকিস্তানের দাবি ভারত প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী ঔ কর্মকর্তা বাংলাদেশ মিশনকে বাংলাদেশ সরকারের হেড কোয়ার্টার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইতিমধ্যে মেহেরপুর সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান জোরদার করা হয়েছে, যেখানে শরণার্থীদের ভারতে প্রবেশের সংখ্যা অগণিত। তবে এখনো পাকিস্তানিরা ভারতীয় সৈন্যদের সীমান্ত এলাকা অতিক্রম করে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করার অভিযোগ উত্থাপন করেনি। ইন্দিরা গান্ধীর মতো পশ্চিম বঙ্গ সরকার নিজেদের দূরে না রেখে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা কোলকাতার একটি সরকারি হোস্টেলে অবস্থান করছেন এবং তাঁদের ভারতীয় তথ্য কর্মকর্তারা সহযোগিতা করছেন। পশ্চিম বঙ্গের উপমুখ্য মন্ত্রী বিজয় সিংহ নাহার বলেন ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় যা এখনো কেন্দ্রীয় সরকার দেয়নি।’ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে স্বীকৃতি নয়, শরণার্থী সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গবাসী সীমান্ত এলাকায় শরণার্থীদের সাময়িক আশ্রয় দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টায় রত এবং কলেরা ভেকসিন প্রোগ্রামের মাধ্যমে শরণার্থীদের কলেরা ভেকসিন দিয়ে কলেরা প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইন্দ্রিরা গান্ধী সরকার তরিৎ পদক্ষেপ না নিলে শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গের গেরিলা কার্যক্রমের শিবিরে পরিণত হবে।
অস্ত্রের মুখে ঐক্য : প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মরিয়া হয়ে উঠে। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার দল আওয়ামী লীগকে ছত্রভঙ্গ করার মাধ্যমে পাকিস্তানের সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে চায়। যদিও তখনো পর্যন্ত কেউ ভাবতে পারেনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এ রকম মরণপণ সিদ্ধান্ত নিবে এবং যদি নিয়েও থাকেন তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো ক্ষীণ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যে, সেনাবাহিনী তার কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। বিদেশী সাংবাদিক যাদেরকে সেনাবাহিনী তাড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলো তাদের প্রতিবেদন থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, সেনাবাহিনী ঢাকায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার যে দাবি করছে, সেটাই সত্য। পরবর্তীতে প্রাদেশিক প্রধান বন্দর চট্টগ্রামেও এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেয়। সেনাবাহিনী তার চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং অপ্রস্তুত আওয়ামী লীগ এবং ঢাকার জনগণের উপর হামলা চালায় এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে আটক করে। নিরীহ বাঙালি জনগণকে ভয় দেখিয়ে এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদেরকে আটক করার মাধ্যমে যদিও প্রধান শহরগুলোতে বিদ্রোহ দমাতে পারে বলে প্রেসিডেন্ট মনে করে কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় ইয়াহিয়া সাহেবের সমস্যা সবে শুরু হচ্ছে।
একদিকে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের সহমর্মিতা ও ভালোবাসা, অন্যদিকে ভিনদেশি সৈন্যদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্রæপাত্মক মনোভাব; তাছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের অসংখ্য নদী-নালার বিস্তৃতি, এই সবকিছুর মাঝে পুলিশরা সেখানে টিকে থাকাতে হিমশিম খায় এবং ইয়াহিয়া সাহেব সেটা বুঝতে পারেন।
প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার ন্যায়, পূর্ব পাকিস্তানিরাও পেকিং পূর্ববর্তী সামান্ত বিপ্লবে অবদান রাখে। যতদিন পর্যন্ত শেখ মুজিব ওয়াদা করে যে, আলোচনার মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আনা হবে তারা নিজেদেরকে দুর্বল ভাবে এবং মুজিবের কাছে পরাস্ত হয়।
কিন্তু সেনাবাহিনী কঠোরভাবে মোকাবিলা করে এবং যুক্তি দেখায় যে, হিং¯্রতা দিয়ে হিং¯্রতা ঠেকাতে হয়। কিন্তু বাঙালির রক্তে আগুন। মে, জুনের বর্ষায় গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি যেভাবে বিপদসীমা অতিক্রম করে, তেমনিভাবে বাড়তে থাকে বাঙালি বিদ্রোহীদের সংখ্যা। ভাতের জন্য, অধিকার আদায়ের জন্য নেমে আসে রাজপথে। বিদ্রোহী আত্মার যে ¯্রােত সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে যেকোন বাহিনীর পক্ষে এটা ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। গেরিলারা যে সমন্বয়হীনতায় আছে এতে কারো সন্দেহ নাই কারণ তাদের অনেক নেতা সামরিক বাহিনীর কাছে বন্দি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের যে ৭০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য রয়েছে এই অসংগঠিত প্রতিরোধ বাহিনী ও সমানভাবে তাদের মোকাবেলা করতে সফল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রধান সমস্যা হলো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রসদ সরবরাহ সৈন্যবাহিনী শক্তি বৃদ্ধি করা। গেরিলা যুদ্ধের হুমকি ছাড়াও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আরো বহুবিধ সমস্যা রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে বিরাজমান বর্তমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নতুন করে সামরিক শাসনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা বিরক্ত। বেসামরিক লোকজন হতাহত হওয়ার তিক্ততা আরো বেড়েই চলেছে। যদিও কিন্তু বাঙালিকে সামরিক সরকারের সহযোগিতায় পাওয়া যাবে তবে অধিকাংশই তাদের সহযোগিতা করবেনা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন চালানোর জন্য পাঞ্জাবিদের আনতে হবে এবং অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদানের জন্য সৈন্যদের ব্যবহার করতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তান ও যে শান্ত থাকবে এমন নিশ্চয়তা নাই। হয়তো সাময়িকভাবে শান্ত থাকতে পারে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে শেখ মুজিবের চিন্তাধারার প্রতি বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানুষের সহানুভূতি আছে। সাম%B