পাকিস্তান কখনো বাংলাদেশের কাতারে আসতে পারবে না

ফজলুল হক

37

পাকিস্তান আমাদের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে- ভিন্ন একটি রাষ্ট্র। আমাদের সাথে তার কোন জাতিগত, সংস্কৃতিগত মিল নাই। তারা খায় রুটি, ছাতু আমরা খাই ভাত। পাকিস্তানকে নিয়ে লেখালেখি করা কোন স্বাভাবিক কাজ নয়। যেমন, আমরা জাম্বিয়া, ঘানা কিংবা সিয়েরা লিওনের রাজনীতি নিয়ে চর্চা করি না। কিন্তু আমি (১৯৪৯ সাল থেকে) আমার জন্মের পর থেকে পাকিস্তানের নাগরিক ছিলাম। স্কুলের এসেম্বলিতে ‘পাকসার জমিন সাদবাদ-’ গাইতাম। কায়েদে আযমকে জাতির পিতা মানতাম। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়। দ্বিজাতি তত্তে¡র ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হয়। আমরা পূর্ব পাকিস্তান নামে তার অন্তর্ভুক্ত হই। ১৯৪৭ এর পর থেকে পাকিস্তান দীর্ঘ সময় সেনা নায়কদের শাসনাধীন ছিল। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ দীর্ঘ দশ বছর এক অবর্ণনীয় নৈরাজ্যের মধ্যে আমাদের শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত তিন বছর আরো অরাজক সেনা শাসন ছিল। আমি আমার জন্মের পর থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানে খুব কম সময় গণতন্ত্র দেখেছি। দীর্ঘ সময় সামরিক বাহিনীর অর্বাচীন কমান্ডারদের পদতলে আমরা পিষ্ট হয়েছি। সামরিক বাহিনী ও জনগণ মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, তার উদাহরণ হলো- পাকিস্তান। জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ- সেই পাকিস্তান সেনা বাহিনীরই মেজর বা ক্যাপ্টেন ছিলেন। পাকিস্তান সেনা বাহিনীর জেনারেলরা পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয় নাই। এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও মূল পাকিস্তানের রাজনীতি সেনা নায়কদের হস্তক্ষেপ মুক্ত হয়নি।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৈন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালী এবং দীর্ঘ ঐতিহ্যবহনকারী হলেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৈন্যের কারণে তার পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয় রাজনীতিতে। পুরনো রীতি ভেঙে মানুষ বেরিয়ে আসতে চায় খোলা হাওয়ায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৈন্য পাকিস্তানকে পেছন থেকে কেবল টেনে ধরেছে। পাকিস্তান সামনে এগুতে পারেনি। এটা আমাদের সৌভাগ্য ছিল যে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হলেও- আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে তার বস্তা পচা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে লাথি মেরে নতুন এক রাজনৈতিক আবহ তৈরি করতে পেরেছিলাম। আমরা নতুন এক অর্থনৈতিক অভিযাত্রায় শরীক হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু একেবারে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সেদিন নিয়েছিলেন। আজ আমরা নিজেদের পরিচয়ে পরিচিত।
আসুন, আমরা পাকিস্তানের ভোঁতা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করি। এটাও বোঝার চেষ্টা করি যে, পাকিস্তান এখনো কি রকম রাজনৈতিক দৈন্য দশার মধ্যে রয়েছে। আপনারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন, পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীগণ ইমরান খানকে বলেছেন,পাকিস্তানকে বাংলাদেশ বানিয়ে দিতে। পাকিস্তান কখনো বাংলাদেশের সাথে এক কাতারে আসতে পারবে না। রাষ্ট্র মেকিং বা নির্মাণের কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থাকে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পলিসি মেকারদের মাঝে এক ধরনের আন্ডারস্টান্ডিং (সমঝোতা) বা এলায়েন্স থাকতে হয়। দেশ নির্মাণে (সধশরহম ড়ভ ধ পড়ঁহঃৎু) শাসকদের দূরদৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শাসন ব্যবস্থার ত্রুটি থাকলে, ত্রুটি সারানোর দরকারও আছে। রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্র মেরামতের প্রয়োজন হলে- সে প্রক্রিয়ার মূল শক্তি হলো জনগণ। রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণ রাষ্ট্র গঠন করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন করতে আমাদেরকে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে হয়েছে। এমনকি সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হয়েছে। এসবে নেতৃত্ব দেন রাজনীতিবিদরা। তারা আদর্শিকভাবে দিক-নির্দেশনা দেন। কিন্তু এখানে নীতি নির্ধারণ করতে হয়, পরিকল্পনা করতে হয়, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাঠামো গড়ে তোলা (রহভৎধংঃৎঁপঃঁৎব) প্রয়োজন। বিভিন্নধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়। এই সব কাজ রাজনীতিবিদরা করতে পারেন না। রাজনৈতিক সচেতনতা ও দিক-নির্দেশনায় কাজ করলেও কিছু লোক তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের কাজে নিয়োজিত হন। তারা পলিটিশিয়ান নন। সব শক্তিকে একটা এলায়েন্সের মধ্যে আনার জন্য রাজনৈতিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়। পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থার অভ্যন্তরে আমার যতটুকু দৃষ্টি দেয়ার সুযোগ হয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের দেশ শাসনের কাজে- পাকিস্তান আর্মির ব্যাপক হস্তক্ষেপ, পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলা এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কার্যকর এলায়েন্স তৈরি হয় নাই। ১৯৫৮ সালের পর থেকে পাকিস্তানের জনগণ এবং শাসকদের মধ্যে গ্যাপ বিদ্যমান ছিল।
আপনি পাকিস্তানের অতি সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকিয়ে দেখুন। এই রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারকে ব্যাক করে সামরিক শক্তি। যাকে ওরা বলে ‘ডিপ- স্টেট’। এটা সরকারের ভেতরে আরেক শক্তিধর সরকার। গত ৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনের একটি হাসপাতালে কুলসুম নওয়াজ গলার ক্যানসারে ভুগে হাসপাতালে মারা গেলেন। তিনি পাকিস্তানের সাবেক ফার্স্ট লেডি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের স্ত্রী। পাকিস্তানে শাসন ব্যবস্থা যে অস্বচ্ছ এবং অস্পষ্ট তা কুলসুমের সাথে পাকিস্তান সরকারের আচরণ দেখে আপনি বুঝতে পারবেন। পাকিস্তান হোক বা অন্য যেকোন দেশের ক্ষেত্রে হোক- সরকারকে সব সময় স্বচ্ছ থাকতে হবে। জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সরকারকে জনগণই নিয়োগ করে। সরকার উৎপীড়ক কিংবা অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে না। হলে, শেষ রক্ষা হয় না। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী শুধু ১৯৭১ সালে তার জনগণের উপর চড়াও হয়নি। এখনো তার দেশে সে উৎপীড়কের ভ‚মিকা পালন করে। নওয়াজের স্ত্রী- কুলসুমের সাথে সরকারের আচরণ পর্যালোচনা করলে- আপনি আমার কথার সত্যতা বুঝতে পারবেন।
কুলসুমের জন্ম ১৯৫০ সালে লাহোরে (আমার কয়েক মাসের ছোট) লাহোরের ফোরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক শেষ করার পর পি এইচডি করেন। দর্শন এবং সাহিত্যে কুলসুমের আগ্রহ ছিল। জেনারেল পারভেজ মোশারফের সামরিক শাসন জগদ্দল পাথরের মতো পাকিস্তানের জনগণের বুকে চেপে বসেছিল। পারভেজ মোশারফের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে কুলসুম পাকিস্তানিদের কাছে গণতন্ত্রপন্থী একজন আইকন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
রাজনীতি unpredictable সাবজেক্ট। সুদিনে দুধের মাছি, ফুলের মৌমাছিরা আসে। দুর্দিনে এরাই টা টা দেয়। ১৯৯৯ সালে জেনারেল মোশারফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নওয়াজকে উৎখাত করেন। নওয়াজ ও তার ভাই শাহবাজকে জেলে ঢোকান। সেনা শাসকদের ভয়ে ওই সময় নাওয়াজের রাজনৈতিক সহযোগীদের অনেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। নওয়াজ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। ওই কঠিন সময়ে দলের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নেন কুলসুম। পাকিস্তানজুড়ে সেনা শাসন বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন কুলসুম। তখন নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান কুলসুমকে সাহায্য করেছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও এক কাতারে আনতে পেরেছিলেন কুলসুম। গ্রান্ড ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স নামে এক ধরনের মহাজোট গঠন করেছিলেন। কুলসুমের দুর্বার আন্দোলনের মুখে মোশারফ সরকার নওয়াজের সাথে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নওয়াজ সৌদি আরবে রাজনৈতিক আশ্রয়ে যান।
আমরা একটু পেছনের দিকে যাই। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে তাকান। পুরো ষাটের দশক হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর অবর্ণনীয় শোষণের স্টোরি। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে বঞ্চিত হচ্ছে, তা ৫০ এর দশক থেকে বাঙালি রাজনৈতিক নেতারা যেমন বুঝতে পারছেন তেমনি অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, সংস্কৃতি কর্মীরাও বুঝতে পারছিলেন। বঞ্চনা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হচ্ছিল। ভাষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও হচ্ছিল। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিককর্মী সবাই অংশ নেন। বাঙালি যে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদের চিন্তায় যেমন আসে, তেমনি বিশেষজ্ঞদের চিন্তায়ও আসে। টু-ইকনমির ধারণা প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও অন্যান্য প্রগতিশীল অধ্যাপকদের অবদান। যাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। ওই সময়টাতে এক বিগ এলায়েন্স আমরা লক্ষ্য করি। অর্থনৈতিক তত্তে¡র যুক্তি এবং জনগণের চাওয়া পাওয়াকে বঙ্গবন্ধু এক জায়গাতে আনতে পেরেছিলেন বলে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি আমাদের কিছুই করতে পারেনি। পাকিস্তানের শাসকরা কখনো জনগণকে আস্থায় নেননি।
সুপ্রীম কোর্ট দুর্নীতির অভিযোগে নওয়াজ শরীফকে রাজনীতিতে অযোগ্য ঘোষণার পর কুলসুম আবারো পাকিস্তানের মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। পার্লামেন্টে নওয়াজ শরীফের শূন্য আসনের নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ঠিক এমন সময় তার কণ্ঠনালীতে ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে যান। তার অনুপস্থিতিতেই তিনি বিপুল ভোটে ওই আসনে জিতে যান। অসুস্থতার জন্য তিনি শপথ নিতে পার্লামেন্টে হাজির হতে পারেননি। মনে করা হয়, নওয়াজ শরীফ আবারও কুলসুমকে দলের প্রেসিডেন্ট পদে বসানোর চিন্তা করেছিলেন। অসুস্থতা বাধ সাধে।
জীবনের শেষ দিনগুলিতে কুলসুম কেবল ক্যান্সারের সাথে লড়াই করেছেন, তা নয়, এই সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখে এমন কথাও শুনতে হয়েছে যে, কুলসুমের আসলে ক্যান্সার হয়নি। মামলার মুখে থাকা স্বামী ও কন্যার প্রতি আদালত ও সরকারের সহানুভ‚তি তৈরি করার জন্য কুলসুম অসুস্থতার নাটক সাজিয়েছেন। একটা সভ্য রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের এই আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। পাকিস্তান কখনো বাংলাদেশের কাতারে আসতে পারবে না। আমাদের রাজনীতিবিদদের সব সময় জনগণ ও তার জন্য কাজ করে এমন শক্তির সাথে ঐক্য গড়ে চলতে হবে। জনগণ ছুটে গেলে অগণতান্ত্রিক শক্তি এসে আপনার টুটি চেপে ধরতে পারে। পাকিস্তানে তাই হচ্ছে।

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
ঊ-সধরষ: ভধুষঁষযড়য়ঁবথ৭@ুধযড়ড়.পড়স