পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক নীতি ও বাঙালি বিদ্বেষ

এস এম মনসুর নাদিম

6

চট্টগ্রামের একটা প্রবাদ আছে- ‘ভাইঙ্গি চুইজ্জি ফাইট্টী মাথা, তও নগেল দে বিবি মল্লিকের মার বড়াইয়ে হতা’। (ভেঙেচুরে ফেটেছে মাথা, তবু গেল না বিবি মল্লিকার মায়ের অহংকারী কথা) এই প্রবাদটা পাকিস্তানিদের বেলায় শতভাগ সত্য। পাকিস্তানিদের মধ্যে শতকরা পঁচানব্বই ভাগের রয়েছে ‘হামবড়া’ ভাব। তাদের চলনে বলনে মনে হয় এক এক জন মিয়া নাওয়াজ শরীফ অথবা নবাব জাদা নুসরত উল্ল্যাহ খান। ডাল দিয়ে রুটি খেয়ে চিকেন টিক্কা, তন্দুরি চিকেন, কিংবা মটন কড়াই, শামী কাবাব এর চমৎকার কাহিনী বলাতে জন্ম থেকেই পারঙ্গম এই নোংরা স¤প্রদায়টা।বাঙালিদের তারা মোটেই সহ্য করতে পারে না। শিক্ষা ও ভাষায় দুর্বল বাঙালি হলেতো কথাই নেই। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাগুলো নিয়ে একাধিক রাষ্ট্র গঠন করার কথা থাকলেও কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করে একটি মাত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান জন্ম হবে বলে ঘোষণা করেন। তার এই ঘোষণা বাঙালি নেতাদের মনে কষ্টের দানা বাঁধে। বাঙালি মুসলমানরা চেয়েছিলেন ভারতের পূর্বাংশ নিয়ে একটি স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠন করা হবে। কিন্তু ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লিতে মুসলিম লীগের দলীয় আইন সভার সদস্যদের এক কনভেনশনে নীতি বহির্ভূতভাবে জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাব সংশোধনের নামে ভিন্ন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সুতরাং বলা যেতে পারে, ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে নয়, ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল উত্থাপিত দিল্লি প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। এরপর থেকে শুরু হয়েছিল বৈষম্যের সাত কাহন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে চলতে থাকে ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র। পুরো পাকিস্তানের ৫৬.৪০ % লোকের মুখের ভাষা বাংলা থাকা সত্তে¡ও মাত্র ৩.২৭ % উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়। শুরু থেকেই পাকিস্তানের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তারা। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের মন্ত্রণালয়গুলোতে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ৯৫৪ জনের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ১১৯ জন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২০০০ কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৯০০। পাকিস্তানের মোট ৫ লাখ সেনা সদস্যের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ২০ হাজার জন। অর্থাৎ ৪ %। দুর্নীতি আর অনিয়মের মডেল হল পাকিস্তান। আইয়ুব খানের শাসনকালে মোট বাজেটের ৬০ % সামরিক বাজেট ছিল। যার বেশির ভাগ বহন করত পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব আয় থেকে। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার প্রতি ছিল চরম অবহেলা। ১৯৫৫ – ১৯৬৭ সালের মধ্যে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দের পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ছিল ২০৮৪ মিলিয়ন রুপি এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছিল ৭৯৭ মিলিয়ন রুপি। পাকিস্তানের ৩৫টি বৃত্তির মধ্যে ৩০টি বৃত্তি নিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান, মাত্র ৫টি বরাদ্দ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। আর সংখ্যালঘুরা সেখানে কেমন আছে জানতে চান ? তবে শুনুন- শোনা যায়, ওদেশে নাকি মুসলমান ভাইয়েরা তিনটে অপশন দিয়ে থাকেন হিন্দুদের। যখন ঝামেলা শুরু হয় জোরদার। ১ মুসলিম হয়ে যাও, ২ পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাও (তা বলে জিনিসপত্র কিছু নিয়ে যেতে পারবে না ! ওটা থাকবে পাক – মানুষের দখলে। প্রাণটা নিয়ে যেতে পারছো, সেটাই কি বড় ব্যাপার নয় ?), ৩ এখানে পড়ে পড়ে মার খাও, মার খেয়ে মানুষ থেকে লাশ হয়ে যাও ! সেখানে সংখ্যালঘুরা নাকি দ্বিতীয় অপশনটাই বেছে নিতেন।
কারণ, ইতোপূর্বে দেখেছি সিন্ধ এবং খাইবার – পাখতুনখোয়া থেকে একসময় অনেকে চলে এসেছিলেন ভারতে। সেই দলে দেব আনন্দ, রাজ কাপুর, মনোজ কুমার, যশ চোপড়া, বলরাজ সাহনি এঁরাও ছিলেন। উল্টো পিঠে , প্রায় সমপরিমাণ মুসলমান চলে যান পাকিস্তানে। আমার দুই যুগের বেশি সময় প্রবাসে থাকাবস্থায় পাকিস্তানিদের খুবই কাছ থেকে দেখেছি। ওরা মুখে মুখে খুবই ধর্মভিরু। খুবই ইসলামপ্রেমি। কিন্তু তাদের আমল দেখলে অবাক হতে হয়। আমার পাকিস্তানি কলিগদের আমি ছেড়ে কথা বলতামনা, তারা আমাকে সবসময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। কিংবা ভয় পেতো আমার মুখোমুখি হতে। কী ধর্ম, কী রাজনীতি কোনটাতে আমি বিন্দুমাত্র ছাড় দিতামনা। একদা এক পাকিস্তানি কলিগ গল্প করতে করতে রাজনীতি টেনে আনলেন এবং বললেন, তোমারা মুজিবর রহমান নে পাকিস্তান কো টুকরা কিয়া। ওহ গাদ্দার হ্যায়। (তোমাদের মুজিবর রহমানই পাকিস্তানকে বিভক্ত করেছে। ও গোঁয়ার ছিল।) আর যায় কোথায় বেটা পাইক্কা। আমি বললাম- তোমাকে দেখে শিক্ষিত মনে করেছিলাম। এখন দেখছি তুমিও তোমার অন্য পাকিস্তানিদের মতো মাকাল ফল। তুমি ইতিহাস পড় নাই ? ৭১ থেকে বলবো, নাকি ৪৭ থেকে বলবো ? আর একটা কথা মনে রেখো, শেখ মুজিবুর রহমান আমার নেতা। আমার জাতির পিতা। তাঁর সম্পর্কে একটুও বাজে মন্তব্য করলে আমি কিন্তু সহ্য করবোনা। তখন পাইক্ক্যাটা কিংকর্তব্য বিমূঢ। গোল গোল চোখে হাঁদারামের মতো চেয়ে আছে আমার দিকে। এই মুহ‚র্তে ইচ্ছা করছে তার ফর্সা গালে কষে একটা চপেটাঘাত করি। বঙ্গবন্ধু এই কওমটাকে খুবই ভালো করে চিনেছিলেন। চিনেছিলেন মাওলানা ভাসানি। চিনতে পারিনি আমরা বোকা বাঙালির একটি অংশ। মিথ্যাবাদিতায় যদি নোবেল পাওয়া যেতো, তবে পাকিস্তানই সেই নোবেল বিজয়ী একক দেশ হতো এতে কোন সন্দেহ নেই। দুবাইতে দেখেছি, পাকিস্তান থেকে দুবাইতে কদম রাখতেই, বলে ম্যায় এফ এ (ইন্টারমিডিয়েট) পাস হু। নাম লিখতে দিলে, উর্দ্দুতে নাম লিখে দেয়। বিল, ইনভয়েস পড়তে দিলে পড়তে পারে না। তখন অন্যরা হাসলেও আমি হাসিনা। আমি জিজ্ঞেস করি- আপ তো বোলা আপ এফ এ পাস হ্যায়, ইয়ে এড্রেস পড়কে বাতায়ে। (আপনি তো বলেছেন, আপনি এফ এ পাস। এই ঠিকানাটা পড়ে শোনান) অমনি দাম্ভিকতার সাথে বলেন, ম্যায় তো জী উর্দুমে এফএ পাস কিয়া। (আমি তো জনাব উর্দুতেই এফ এ পাস করেছি) আমি বলি, আমিও বাংলাতেই বিএ পাস করেছি। কিন্তু ইংরেজি নাম-ঠিকানা নয় শুধু আরও কিছুও লিখতে পারি। তোমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এতোই খারাপ। ভাগ্য ভালো আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করে তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলাম। নতুবা আমিও উর্দুতে এফ এ পাস করে এসে তোমার মতো অসহায় হয়ে থাকতাম। আমি এই কথাগুলি এই জন্যই বলতাম, আমার আশেপাশে পাকিস্তানি কলিগদের শোনানোর জন্য। যারা বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে, ঝড়-তুফান বন্যা নিয়ে হাসাহাসি করতো। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় হলে তারা আমার কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলতো, আফসোস হ্যায়, বহুত লোগ তুফান মে হালাক হো গিয়া। আল্লাহ্ মাফ করে, আল্লাহ্ কি গজব ছে ডরনে চাহিয়ে। (দুঃখ হচ্ছে। অনেক লোক তুফানে মরে গেছে। আল্লাহ্ ক্ষমা করুক। আল্লাহর গজব থেকে ভয় করা উচিৎ।) তাদের কথায় বোঝা যায়, তারা শোক প্রকাশ করতে নয়, বরং আমাদেরকে পাপী, অভিশপ্ত জাতি রূপে পরিচিতি দেয়ার জন্যই এই মায়াকান্না দেখাতো। আমি তো নাছোড়বান্ধা। সাথে সাথে বলতাম- আপনার তো ইসলাম সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই। আপনি কি মুসলমান ? আপনি কী জানেন, রহমত কাকে বলে আর গজব কাকে বলে ? না জেনে থাকলে শুনে রাখুন, কোন কিছু বুঝে উঠার আগে হঠাৎ যে দুর্ঘটনা ঘটে সেটাকেই গজব বলে।
বাংলাদেশে যেটা হয়েছে সেটা আমাদের ভৌগলিক অবস্থানহেতু আবহাওয়াজনিত। এটার জন্য এক সপ্তাহ আগে থেকে রেডিও, টি ভি তে ঘোষণা করা হচ্ছে। পেপার-পত্রিকায় সতর্কবাণী ছাপানো হচ্ছে। এটাকে আপনি গজব কি করে বললেন ? পাইক্ক্যা মুফতির হাওয়া বন্ধ। (তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট)

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক, কলামিস্ট