পরীর পাহাড়ে শতবর্ষের আদালত ভবন

ওয়াসিম আহমেদ

54

পাহাড়সমান দায়িত্ব ও কর্মচাঞ্চল্য নিয়ে পরীর পাহাড়ের চূড়ায় শত বছরের আদালত ভবন এখনো মাতা উঁচু করে দ-ায়মান। ন্যায়বিচার প্রতিষ্টা আর নগরীর প্রশাসনিক কার্যে প্রতিদিন মুখরিত হয় আদালত ভবনের প্রতিটি কড়্গ। সেই ইংরেজ আমল, পাকিসত্মান আমল ও বর্তমানের স্বাধীন বাংলাদেশের কতই-না ইতিহাসের স্বাড়্গী এই আদালত ভবন। এই আদালত ভবনের প্রাঙ্গণ নতুন রূপ ধারন করে কালো-সাদা জামা পরিহিত আইনজীবীদের পদচারণায়। ভবনের সামনে গাছের সারিতে সুসজ্জিত গাড়ি পার্কিং শৃঙ্খলার জানান দিলেও অবৈধ দখলদারির অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে গড়ে উঠেছে টংয়ের দোকানসহ নানা ভাম্যমান দোকানপাট। যেগুলো আদালত ভবনের পেশাদরিত্বের সাথে স্বাভাবিকভাবেই বেমানান ও অসৌন্দর্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই আদালত ভবনের পাহাড়টি পরীর পাহাড় নামে খ্যাত ছিলো। একে বর্তমানে কাচারি পাহাড় নামে আবার বেশিভাগই কোর্ট বিল্ডিং নামে পরিচিত। লাল রংয়ের হওয়ায় অনেকে লাল বিল্ডিং নামে অভিহিত করেন। এই পাহাড়ের চূড়ায় চট্টগ্রাম জেলার ও বিভাগীয় প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সুন্দর আদালত ভবনটি অবস্থিত। পাহাড় সমান দায়িত্ব ও কর্মচাঞ্চল্য নিয়ে শতাব্দীকাল ধরে সমগ্র চট্টগ্রাম জেলার এমনকি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যাবলি এখান থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৮৯৩ সালের দিকে ইংরেজ শাসনামলে শহরের উত্তর এলাকায় অবস্থিত ‘মাদ্রাসা পাহাড়’ থেকে আদালত ও প্রশাসনিক দপ্তরটি এই পরীর পাহাড়ে স্থানানত্মর করা হয়। ফলে এই ভবনের ভিত্তিভূমি পাহাড়টিও কাচারি পাহাড় বা কোর্ট বিল্ডিং নামে পরিচিত লাভ করে।
মোগল আমলে চট্টগ্রাম শহর বলতে কতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, চকবাজার, চন্দনপুরা ও আন্দরকিলস্না এলাকাকে বুঝানো হত। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি শাসন ও রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে চকবাজারের দড়্গিণ-পশ্চিম পার্শ্বস্থ পাহাড়ের শীর্ষে চট্টগ্রামের পাহাড়ের কেন্দ্র ছিল। মাদ্রাসা পাহাড়ে ছিলো চট্টগ্রামের আলা সদর আমিন রোড়। মাদ্রাসা পাহাড় সংলগ্ন পশ্চিমের পাহাড় ছিলো মুন্সেফি ও অন্য আলাসদর আদালতটি।
পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম শহরের বৃদ্ধি, কর্মব্যসত্মতা ও অন্যান্য কারণে শহর আরো সম্প্রসারিত হয় এবং দড়্গিণ দিকে নতুন শহর গড়ে উঠে। ব্রিটিশ সরকার এই নতুন শহর এলাকাতেই প্রশাসনিক দপ্তর স্থানানত্মরের সিন্ধানত্ম নেয়। এই উদ্দেশ্যে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৯ সালে জমিদার অখিলচন্দ্র সেনের কাছ থেকে পরীর পাহাড়টি হুকুম দখল করে নেয়। ইংরেজ রাজত্বকালে রপীর পাগাড়টি ফেয়ারি হিল’ নামে পরিচিত ছিলো। জঙ্গলাকীর্ণ পরীর পাহাড়ে একখানি কুটির ছিলো। এই কুটিরে পুর্তগিজদের ডাক্তারখানা অবস্থিত ছিলো। ১৮৯৩-৯৪ সালে তৎকালীন ৬ লড়্গ টাকা ব্যয়ে বিশাল সুদৃশ্য আদালত ভবনটি নির্মাণ করে এবং ঐ সময়ে সরকারি অফিস-আদালতসমূহ নতুন ভবনে স্থানানত্মরিত করা হয়। তখন থেকে পরীর পাহাড় ও পাহাড়ের উপর গড়া এই ভবন যথাক্রমে কাচারি পাহাড় ও কাচারি ভবন নামে অভিহিত হয়ে থাকে। পাকিস্থান আমলে আয়ুব খাঁর সামরিক শসনামলে প্রয়োজনের তাগিদে পরীর পাহাড়ের দ্বিতল থেকে ত্রি-তল কোর্ট নির্মাণ করা হয়।
উনবিংশ শতাব্দির শেষ দিকে কবি নবীন চন্দ্র সেন চট্টগ্রাম কমিশনারের পার্সোনাল এসিস্টেন্ট ছিলেন। তিনি পরীর পাহাড়ে কোর্ট বিল্ডিং স্থাপনে অত্যনত্ম উৎসাহী ছিলেন। তাঁর রচিত আমার জীবনে লিপিবদ্ধ আছেঃ ‘আমার চৌদ্ধ বৎসর পূর্বের কল্পণা এখন কার্যে পরিণত হইয়াছে। আমি প্রাচীন আদালত চট্টগ্রাম শহরের উপরস্থ এক উচ্চ পর্বত হইতে আনিয়া কমিশনার ও জজের একটি সম্মিলিত কোর্ট অট্টালিকা মঞ্জুর করাইবার সময়ে গভর্নমেন্টে লিখিয়াছিলাম যে, ইহাতেও সুবিধা হইবে না। বিশেষত উপস্থিত অট্টরিকতাতে কালেক্টর-ম্যাজিস্টেটের সমাবেশ হইবে না। অতএব, ফেয়ারি হিলের উপরস্থ সমসত্ম অফিসের জন্য একটি সম্মিলিত অট্টালিকার নির্মাণ হইলে সবার জন্য সুবিধা হ্‌্‌্‌্‌ইবে।” চট্টগ্রাম আদালত ভবনের স্থান নির্বাচন নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ শাসকের প্রখর ও পরিচ্ছন্ন রম্নচি বোধ এবং আইন আদালতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার স্বাড়্গর বহন করে। বিশাল সুপরিসর দালানটি স্থাপত্য শৈলির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এতে শিল্প নৈপুণ্য ও দূরদর্শিতার স্বাড়্গর রয়েছে। তাই দেখা যায়, ১০০ বছর পরও দালানটির ব্যবহার-উপযোগিতার অভাব ঘটেনি। এই ঐতিহাসিক দালানে মোগল আমলের স্থাপত্যরীতি ও পাশ্চত্য অনুকরণে কয়েকটি গম্বুজ শোভিত হয়েছে। প্রতিটি কড়্গে বিশাল ও সুপরিসর কও এেই দ্বিতল ভবনটি বিটিশ আমলে তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে পাকিস্থান আমলে ভবনটি ত্রি-তল করা হয়। ভবনটির সামনে একটি স্মৃতিসৌধ আদালত ভবনটিকে আরো ঐতিহ্যম-িত করেছে।
নগরীর প্রাণকেন্দ্র এই আদালত ভবনের চারপাশের পরিবেশটা অনেকটা অগোছালো রয়ে গেছে। কিছু অসাধু মানুষের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে দিন দিন পরিবেশটা তার ভাব গাম্ভির্য হারাতে বসেছে। তাছাড়াও নির্যাতিতরা ন্যায় বিচারের আশায় এই আদালত ভবনের হাজির হলেও তাদের যথেষ্ট হয়রানিন শিকার হতে হয়। অশিড়্গিত গ্রাম থেকে আসা মানুষের বিভিন্ন ফাঁদে ফেলতে আদালতের এক শ্রেণির অসাধু লোক উৎ পেতে থাকে। এই ব্যাপারে সচেতনতার সৃষ্টির লড়্গ্যে ভবনের দেয়ালে লেখা আছে ‘টাউট হতে সাবধান’।
তরম্নণ আইনজীবীদের কাছে এই আদালত ও আদালত পবিত্রস্থান। তাদের প্রতিদিনের গনত্মব্য এই আদালাত ভবন। নিজেদের পেশাগত দিক থেকে অনেকে এই আদালত ভবনের ইতিহাস ও গুরম্নত্ব নিয়ে কথা বলেন। অ্যাডভোকেট আবু হেনা ইমন বলেন, আদালত ভবনের পবিত্রতা রয়েছে। এখানে দোষী ও র্নিদোষীদেও মানদ- হিসেবে দোষীদের শাসিত্ম দেয়া হয়। আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্টার ড়্গেত্রে এমন ন্যায় ্‌্‌্‌ঐতিহ্যবাহী আদালত ভবনের গুরম্নত্ব অনস্বীকার্য। তরম্নণ অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ রম্নমি বলেন, আদালত ভবনের একটি সুন্দর ইতিহাস রয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের জীবন রচিত হয় এই আদালত ভবনকে কেন্দ্র করে। তবে আদালত ভবনের কর্মকা- আরো আধুনিকায়নের প্রয়োজন বোধ করছেন তিনি। সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. জিলস্নুর রহমান চৌধুরী বলেন, কিছু অসুস্থ মানুষের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে আদালত ভবনের প্রাঙ্গণে অবৈধ দোকানপাট গড়ে উঠেছে এবং শীঘ্রই সংশিস্নষ্ট সকলের সাথে বসে এগুলো উচ্ছেদ করে সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়াও ভবনের মেয়াদ শেষ হলে আদালত ভবন ভেঙ্গে নতুন ভবন তৈরি করার কথা জানান তিনি।