পরিপ্রেক্ষিত

9

আবদুল হাই

লাঠিতে ভর করে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধবাবা। খুব কষ্ট করে হাত প্রসারিত করে সাহায্য চাচ্ছে। বান্দরবানে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে প্রতিকুল অবস্থায় বসবাস। হাড্ডি চামড়া মোড়ানো কঙ্কালসার দেহ। তারপরও হাল্কা হৃদস্পদন নিয়ে বেঁচে আছে। কৃত্রিম যন্ত্রের সাহায্যে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার প্রয়োজন পড়েনা আজ অবধি। এ বৃদ্ধকে পরিচর্যার কোন ব্যবস্থা নেই। যদি থাকতো ভিক্ষার আবেদনে উন্মুক্ত আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সাহায্যের আবেদনের ঐ আলোকচিত্র কেন বৃদ্ধবাবাকে গৃহ সন্নিকটে ত্রাণ সামগ্রীর একটা ব্যাগ বিপদমুক্ত দূরত্বে রেখে তিনজন সেনাসদস্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। এ সাহায্য মানবতার অত্যন্ত উৎকৃষ্ট উদাহরণ এ কঠিন কাজগুলো করে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় সেনা সদস্যরা। মনে হয় এক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছেনা। সততা ও নিষ্ঠার সাথে ত্রাণ বিলি বন্টন হচ্ছে। দৃষ্টি গোচর হওয়া ছবিটি ৬ মে দৈনিক পূর্বদেশের পচ্ছাদপৃষ্ঠার।
একই পৃষ্ঠার এককোণে সংবাদ শিরোনামে স্থান পেয়েছে ‘চাল আত্মসাৎ করা আরো তিনজনপ্রতিনিধি বরখাস্ত’ অর্থাৎ ত্রাণের চাল চুরির দায়ে তিনজনপ্রতিনিধি বরখাস্ত। কি দৃষ্টিকটু এসংবাদ! এ দুসংবাদ দৃষ্টি কটূ তো বটে, দেশ ও দশের খেদমত করার অঙ্গীকারাবদ্ধ এসব তথাকথিত খাদেমদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। এসব লোক মানুষের রিজিকচোর আঠারো কোটি মানুষের হক চোর। কেয়ামতের দিনে এরা আঠারো কোটি মানুষের হক চুরির দায়ে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হবে।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমরা এক পা দু-পা করে এগুতে এগুতে অনেকদূর এগিয়ে এসেছিলাম। উন্নয়নের পরম প্রাপ্তির পরশ পেতে। খাদ্যের ক্ষেত্রে স্বয়ং সম্পূর্ণতা, বৈদেশিক বাণিজ্যে উন্নতি, কর্মসংস্থানের পরিধিবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহ, রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্টসহ যাবতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষারহার বৃদ্ধি, বয়স্কভাতা প্রদান, বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধ, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল, ড্রেন খনন ও সংস্কার সাধন জ্যামঝট রোধে বিকল্প সড়ক ও উড়াল সেতু নির্মাণ, ট্যানেল নির্মাণ কাজ প্রায় সবকিছুই ছিলো সমাপ্তির পথে। আমাদের দেশটা প্রায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো। একথা অস্বীকার করা যায়না। মানুষের জীবন জীবিকার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিলো। মানুষ পেটভরে খেতে পেরেছিলো। দেশের সর্বত্র ছিলো কর্মচাঞ্চল্যতা। সুখে ছিলো আমজনতা। আমার ভাবনা, হঠাৎ স্থবিরতা। হঠাৎ নীরবতা। রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা। ভীত মানুষগুলো কর্মত্যাগী হয়ে আজ গৃহবন্দি। বাড়ছে করোনার পরিধি। বাড়ছে মৃত্যুর অংক। বাড়ছে শঙ্কা। বেকার হয়ে পড়েছে কর্মীর হাত। দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে সাহায্যের হাত। বাড়ছে লাজুক ভিক্ষুক। ওরা মধ্যবিত্ত, ওরা আত্মসম্মান আঁকড়িয়ে ধরতে পারছেনা এবং পারবেনা ওরা পাচ্ছেনা মাহিনা, ঘামঝরা কর্মের পর। তারপরও রোজা রাখা। বোধহয় কেনকাটা তেমনটি হবেনা, সামনে ঈদ। মাথায় হাত আনন্দের খরা, কতদিন খাতবে আল্লাহর গজব নামের করোনা।
ঠিক এমন সময়ে পাখির স্নেহের বিস্তৃত পাখনার মতো পরম যতেœ বুকে জড়িয়ে ধরেছে স্বীয় জাতিকে আমাদের শেখ হাসিনা। উনি যেন আজ দিশেহারা দেশের সর্বত্র করোনার থাবা। নেই কোন ক্লান্তি। বিসর্জন দিয়েছেন সব শান্তি।
আমার ভাবনা, করোনা রোগীর যন্ত্রনা তার থেকে দূরে থাকা, এমনকি স্বজনরা। আমার ভাবনা, মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফন জানাজা নিয়ে সৃষ্ট বিড়ম্বনা। আজ কেবল সরকার নয়। দেশের সুস্থ, অসুস্থ, বিপর্যস্ত মানুষের পাশে সামর্থবান মানুুষগুলো মানবতারপ্রশ্নে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করে, দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে জাতি এটাই প্রত্যাশা করে। আমার ভাবনা অনিশ্চয়তায় পড়া ২০ হাজার ট্রেক্সি চালকের জীবন জীবিকা নিয়ে। অনিশ্চয়তা ও দৈব দুর্ঘটনা সামাল দিতে মাসিক ৫০ টাকা করে শ্রমিক ইউনিয়নের ফান্ডের টাকা থেকে সবাই সহযোগিতা পায়নি। অথচ সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ২ লক্ষ টাকা। এমন করুন মুহূর্তে তাদের জন্য করুনার ঘাটতি। কি দুর্বিসহ ?
এই করোনা, একদিনের বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড় না, প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, নয় কোন ক্ষণিকের বন্যা, জলোচ্ছ¡াস, অস্থায়ী কান্না হাহুতাশ, একটি দেশের সমস্যা, মানবতা নামক আর একটি দেশের সাহায্যের আশ্বাস নেই। এ করোনা যেন বিশ্বের প্রতি মানুষের কান্না। সক্ষম মানুষদের অক্ষম করে দেয়া দীর্ঘকালীন ঘটনা মানুষ থেকে মানুষ আক্রান্ত হওয়া অশান্তমহামারী বন্ধ হওয়া একে অন্যের কাছে আসা যাওয়া। স্বীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্কের ব্যবহার পিপিতে মোড়ানো অঙ্গ।
সঙ্গহীন বন্ধু ঘরের কয়েদী। দীর্ঘ তিন মাসের পিঞ্জিরাতে বন্দী, দুঃখের সাথে আতঙ্কের সন্ধি। আলস্যের সকাল কর্মহীন মানুষের ফিরে আসা বিকাল, তারপর রাত, চিন্তাগ্রস্ত মানুষের মাথায় হাত। নিদান কালের অফুরান ঘুম। নেই কোন কাজ কর্মের ধুম। রাস্তা ফাঁকা। নেই কোন হাঁটা চলা। দুএকটা গাড়ীর আনাগোনা ভ্যানগাড়ী ওয়ালা, মুখটি কালা, সারাটাদিন ঝুটেনি কোন ভাড়া চলেনি ভ্যানের চাকা, একাপ চা একটি রুটি কিনে খেতে চাইলেও দমিয়ে রাখা ইচ্ছা। বন্ধ হওয়া বিদ্যালয় নেই শিক্ষার্থীর আসা যাওয়া বন্ধুতে বন্ধুতে গলাগলি নেই কোন দুষ্টামী কিংবা কথা কওয়া। রাস্তার পাশে দোকানের বন্ধ থাকা ঝাপ দরোজা। খোলা রাখা দোকানে মোবাইল কোর্টের ফাইল, এযেন চলমান আইন। মসজিদের আযান, তালবদ্ধ দরোজা।
রাস্তায় গার্মেন্টস কর্মীর দ্রæতপথচলা সময়ের সাথে পাল্লা। ধাক্কা ধাক্কির প্রতিযোগিতা করে গণপরিবহণে উঠে শীট ধরার দৃশ্য থেমে যাওয়া। গাড়ীর নিঃশব্দ আর হরলে নিস্তব্ধ। ঈদের কেনাকাটা আনন্দের ভাটা। হাত ধরা উৎফুল্ল শিশু কিশোর অদৃশ্য নেই নতুন কাপড় জুতার বায়না। দোকানীদের বন্ধ কারবার। স্বপ্নগুলো দুস্বপ্নে ছাড়কার। ত্রাণের শেষ হওয়া মাল, চুলোতে উঠেনি হাঁড়ি; একি শুরু হলো একোন আকাল। চোখঘুরে যতটুকু দেখি ফুটপাতগুলো সবখালি। হকারগুলো পণ্য নিয়ে বসেনা আগের মতো, চাঁদার লেনদেন নেই। নেই কাঁচা আয়ের দৌরাত্ম্য। বহুদিন অবধি পথ প্রান্তরে পরিষ্কার বায়ু নিখাদ নিশ্বাসে প্রশ্বাসে বাড়বার কথা মানুষের আয়ু। এখন মধুমাস যথেষ্ট হয়েছে তরমুজ বাঁকী, আম, জাম, কাঁঠালের ফলন। ট্রাকভর্তি ফল আসে আড়তে আড়তে। ক্রেতারা আসেনা পণ্য কিনতে। মানুষের আগ্রহে খরা, এযেন উচ্ছিষ্ট মরা, টক্ আঙ্গুর ফলের মতো। চীনের মানুষরা সর্বভুখ প্রাণী জীবন বাঁচাতে গাছের পাতাপুতি থেকে শুরু করে সাপ, বিচ্চু, ব্যাঙ, পোকা মাকড়, তেলাপোকা, টিকটিকি, না খায় কি ? হারাম আর হালাল চিন্তা করে কোন আকাল দিনে তাল সামাল দেওয়া কষ্টকর হবে। বর্ধিত জনসংখ্যার আবাসন বাড়াতে গিয়ে ফসলি জমি থেকে শুরু করে পাহাড় কর্তন করে পরিবেশের ভারসাম্য অসাম্য করে ফেলেছি। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত পরিবেশের হুমকিতে আছি। কোথাও কিঞ্চিৎ ভূমি খালি নেই। আবাসস্থলে সব দখল হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি চোষণ করতে একচিলতে মাটি নেই। তাই ভূ-অভ্যন্তরে পানির স্তরে পানি নেই। তড়িৎগতিতে প্রধানমন্ত্রী পানির ব্যবস্থা না করতেন তবে আমরা মরুবাসীতে পরিণত হতাম। নেত্রী মনখুলে বিদ্যুৎ সরবরাহেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। না হলে আমাদের বেহালদশা সামাল দেওয়া সম্ভব হতোনা। রমজান মাস এর ওপর লকডাউন তা ব্রেক ডাউন করার উপায় নেই এরপরও দ্রব্যমূল্য স্থির রাখতে পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ ভ্রাম্যমান টিসিবির ন্যায় মূল্যে পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা যেন তাঁর প্রতি গণআস্তা সৃষ্টি করেছে। অন্তত মজুদদার মুনাফাখোরদের কূটচাল ও জনদুর্ভোগ থেকে তিনি আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।
তারপরও মানুষের ভয় বিদ্যমান। লক ডাউন যখন প্রত্যাহার হবে তখন হয়তঃ দেখা যাবে অনেক মানুষ চাকুরী হারিয়েছে। ব্যবসা হারিয়েছে রুজি রোজগারহীন হয়ে পড়েছে। তখন বাজেট পেশ হবে তখন জনগণের ওপর দায়দেনার চাপ আসতে পারে। যেমন বিদ্যুৎ বিল, গ্যাসবিল, পানির বিল, পৌরকর, ভূমি উন্নয়ন কর, বকেয়ার কারণে সারচার্জ, ক্ষুদ্র ঋণের টাকার বকেয়া পরিশোধের চাপ ব্যাঙ্কের ঋণ পরিশোধের চাপ, ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল কলেজের বেতনপত্র, এসএসসি পাস করা ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি ফি। অর্থাৎ এসব কিছুর তাল সামাল দেওয়া যেন বেতাল পরিস্থিতি সৃজন করতে পারে। সরকার মানবিক দিক বিবেচনা করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে উদ্যোগী হয়ে এবার নমনীয়তা প্রদর্শন করবেন জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে।
প্রত্যেক বাজেট শুভ-অশুভ দু’টো দিক নিয়ে হাজির হয়। সরকার বলেন, বাজেট জনকল্যাণকর বিরোধী পক্ষ (যে দলই হউক না কেন) বলেন এ বাজেট গরীবমারার বাজেট। সামনে বাজেট ট্যাক্স এবং ভ্যাট বান্ধব না হয়ে যদি জনবান্ধব বাজেট হয় মানুষের জন্য তা হবে স্বস্থিদায়ক বাজেট। এবার সরকার অবশ্যই কৃচ্ছতা সাধনে অভ্যস্থ হবেন এটাই প্রত্যাশা। আমাদেরকে এবার বড়ো চ্যালেঞ্জের পথ ধরে এগুতে হবে। আমরা জীবন-জীবিকার একযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি যে কোন উপায়ে। আমাদের রপ্তানী আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাকখাত থেকে এরপর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। এই দুইখাতে ভীতিকর অবস্থা বিদ্যমান। আমদানী ব্যয়কে অতিক্রম করা বা সমতা রক্ষা করার মতো শক্তি সামর্থ নেই রপ্তানী আয়ের। সুতরাং আগের মত বেহিসেবী হলে চলবেনা। কৃচ্ছতার সাধনা ছাড়া কোন উপায় নেই। কারণ বৈশ্বিক মহামারীর আয়ুস্কাল কতদিনের। এতদ্ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত নয়। এখন থেকে সুদূরপ্রসারী জনকল্যাণকর আগাম ব্যবস্থা নিয়ে রাখতে হবে। জীবন জীবিকার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হতে হবে।
শিক্ষাসেবাকে দ্রুত ও সুলভ পর্যায়ে আনতে সরকারের যথষ্টে পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের সহায় হউক।

লেখক : কলামিস্ট