পাইলট সংকট

নৌপথে ঝুঁকি নিয়ে চলছে ৬ হাজার জাহাজ

ইকবাল হোসেন

59

নৌ-পথে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিমুক্ত রাখতে পাইলট নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও পাইলট সংকটে হুমকিতে পড়েছে নৌ-পরিবহন। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলছে দেশের বিভিন্ন নৌ-রুটে ৬ হাজারের বেশি জাহাজ। তন্মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যায় প্রায় দুই হাজার জাহাজ।
জানা যায়, বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআইডবিøউটিএ) কর্তৃক দেশের নৌপথে যাত্রী ও পণ্য নিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে পাইলট সরবরাহ করার কথা। সারাদেশের নৌপথগুলোতে ৬ হাজারের অধিক জাহাজ চলাচল করলেও পাইলট রয়েছে মাত্র ২০০-২৫০ জন। একইভাবে বিআইডবিøউটিএ-এর কনজারভেন্সি ও পাইলটেজ বিভাগে চট্টগ্রাম রুটে (পূর্ব জোন) বর্তমানে পাইলট রয়েছেন মাত্র ২০ জন। ১৯৭১ সালে মাত্র ৫৩টি জাহাজ থাকলেও বর্তমানে চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। ওইসময়ে ৫৩টি জাহাজ চলাচলের জন্য ৩৭ জন পাইলট ছিল। পরবর্তীতে অনেকে অবসরে চলে গেলেও নতুন কোনো নিয়োগ না থাকায় বর্তমানে পাইলট রয়েছেন মাত্র ২০ জন।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) তিনটি যাত্রীবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে চলাচল করে। যাত্রীবাহী এ তিনটি জাহাজসহ নেভি, কোস্টগার্ডের জাহাজগুলোর জন্য বিআইডব্লিউটিএ-কে ৩-৫ জন পাইলট বরাদ্দ রাখতে হয়। চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি খাদ্যবাহী ৪০টি লাইটার জাহাজ চলাচল করে। এ জাহাজগুলোর জন্য ৫-৭ জন পাইলট বরাদ্দ দেয়া হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে তৈলবাহী প্রায় চারশ জাহাজ (অয়েল ট্যাংকার) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে। এসব জাহাজের জন্য পাইলট বরাদ্দ রাখা হয় মাত্র ৪-৫ জন। তাছাড়া চট্টগ্রাম থেকে প্রায় দেড় হাজার জাহাজ সাধারণ পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গমন করে। এসব জাহাজের জন্য পাইলট থাকে মাত্র ৭-৮ জন।
সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-চর গজারিয়া, চর গজারিয়া-চাঁদপুর, চাঁদপুর-বরিশাল, বরিশাল-কাউখালী, কাউখালী-মংলা, মংলা-খুলনা, চাঁদপুর-মাওয়া, মাওয়া-আরিচা, আরিচা-বাঘাবাড়ি এবং বাংলাদেশ-ভারত অভ্যন্তরীণ নৌ-পথ অতিক্রমণ ও বাণিজ্য প্রটোকলের (প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট এন্ড ট্রেড) আওতায় মংলা-শেখবাড়িয়া ও মংলা-আংটিয়ারা রুটে পাইলটিং স্টেশন রয়েছে। সবমিলিয়ে সারাদেশের নৌ-রুটগুলোতে প্রায় ৬ হাজারের অধিক জাহাজ চলাচল করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাইলট দেয়া হয় না জাহাজগুলোতে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে একই স্থান থেকে ছেড়ে যাওয়া ১০-২০টি জাহাজের বহরের সামনে ও পেছনে পাইলট দেয়া হয়।
এদিকে পর্যাপ্ত পাইলট বাড়ানোর জন্য বিআইডবিøউটিএ’র চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন। ওই পত্রে উল্লেখ করা হয় ১৯৭৬ সালের আভ্যন্তরীণ নৌ অধ্যাদেশ দ্বারা পাইলটেজ শাখা চলে আসছে। বিগত ৪০ বছরে জাহাজ বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে থাকলেও পাইলট বাড়েনি।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে পণ্যবাহী প্রায় দেড় হাজার জাহাজে কোনো পাইলট দেয়া হয় না। অয়েল ট্যাংকারগুলোতে পাঁচ শতাংশও পাইলট দেয়া সম্ভব হয় না। ১৯৭৩ সালে যে পাইলট ছিল, বর্তমানে কয়েকগুণ জাহাজ বাড়লেও অবসরসহ নানা কারণে পাইলটের সংখ্যা কমেছে। অথচ জাহাজ চলাচলে পাইলট নেয়া বাধ্যতামূলক।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে দুই হাজারসহ সারাদেশে ছয় হাজারের অধিক জাহাজ চলে। কিন্তু পাইলট রয়েছে মাত্র ২০০-২৫০ জন। আমরা দীর্ঘদিন থেকে পাইলটের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। যে কারণে নৌ রুটগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে জাহাজগুলোকে চলাচল করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অধীনে এক হাজারের মতো পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। তাছাড়া মেঘনা গ্রæপ, সিটি গ্রæপের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে আরো ৫-৬শ লাইটার জাহাজ। যেগুলো চট্টগ্রাম থেকে পণ্য বহন করে।’
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) আওতাধীন কোয়াবের আহবায়ক গাজী বেলায়েত হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, ‘জাহাজ অপেক্ষা পাইলটের সংখ্যা একেবারে অপ্রতুল। পাইলট বাধ্যতামূলক থাকলেও সব জাহাজে পাইলট দিতে পারে না বিআইডব্লিউটিএ। তবে ১০-২০টি জাহাজের এক বহরের সামনে পেছনে একজন করে পাইলট দেয়া হয়।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র সচিব কাজী ওয়াকিল আহমেদ পাইলট সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে পূর্বদেশকে বলেন, ‘যেখানে ৬-৭ হাজার জাহাজ রয়েছে সেখানে পাইলট রয়েছেন মাত্র দুই-আড়াইশ। আমরা নতুন করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাইলট নিয়োগের জন্য একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে পাইলট নিয়োগের পদক্ষেপ নেয়া হবে।’