চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচন

নৌকার মোছলেম জয়ী

রাহুল দাশ নয়ন

কালুরঘাট সেতু নির্মাণের জন্য হলেও মোছলেম উদ্দিন আহমেদের বিজয়ী হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন গোমদন্ডী এলাকার ভোটার আফছার উদ্দিন। উপজেলার একটি চায়ের দোকানে চমুচা খেতে খেতে পাশে বসা অপরজনকে এমন বাসনার কথাই জানাচ্ছিলেন তিনি।
ভোটার আফছারের মতে, এ দাবি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জন্য কোন ভোটারের নয়, বোয়ালখালীর আপামর জনতার দাবি সরকার দলীয় প্রার্থী বিজয়ী না হলে কালুরঘাট সেতুর স্বপ্ন অপূর্ণই থাকবে। আপাতত কালুরঘাট সেতু নির্মাণের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছে বোয়ালখালী তথা চট্টগ্রাম-৮ আসনের মানুষ। বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। এ বিজয়ের মধ্যদিয়ে ১৯৭৩ সালের পর প্রথমবারের মতো এ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলো।
বিজয়ী হয়ে নৌকার প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৮ আসনের ভোটাররা আমাকে ঋণী করেছেন। ভোটাররা আমার প্রতি যে আস্থা রেখেছেন তার প্রতিদান দিব। জীবনের শেষ সময় পার করছি। নেত্রী আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। এখন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন করা হবে আমার প্রথম কাজ। এক বছরের মধ্যেই এ সেতু দৃশ্যমান করব। এ জয়ের মাধ্যমে বিএনপি যে জনগণের দল নয়, তা প্রমাণ হয়েছে। বিএনপি প্রার্থী সারাদিন নালিশ করেই গেছেন। কারণ বিএনপি এখন সাধারণ মানুষের দল নয়, নালিশ পার্টি হিসেবেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।’
গতকাল এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেশিয়ামে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ) আসনের উপ-নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন নিকটতম প্রার্থী বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের আবু সুফিয়ানকে ৬৯ হাজার ৩১১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এ আসনে নৌকা প্রার্থী মোছলেম উদ্দিনের প্রাপ্ত ভোট ৮৭ হাজার ২৪৬ ও ধানের শীষ প্রতীকের আবু সুফিয়ানের প্রাপ্ত ভোট ১৭ হাজার ৯৩৫ ভোট। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে টেলিভিশন প্রতীকের বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এসএম আবুল কালাম আজাদ এক হাজার ১৮৫, চেয়ার প্রতীকের ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সৈয়দ মোহাম্মদ ফরিদ আহমদ ৯৯২, কুঁড়েঘর প্রতীকের ন্যাপের বাপন দাশগুপ্ত ৬৫৬ ও আপেল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক পেয়েছেন ৫৬৭ ভোট। এ আসনে মোট ভোট পড়েছে ২২.৯৪ শতাংশ।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, এ আসনে পুরুষ দুই লক্ষ ৪১ হাজার ১৯৮ জন ও মহিলা দুই লক্ষ ৩৩ হাজার ২৮৭ জন মিলিয়ে মোট ভোটার চার লক্ষ ৭৪ হাজার ৪৮৫জন। এরমধ্যে চান্দগাঁও থানাধীন (৪, ৫, ৬ নং ওয়ার্ড) ও পাঁচলাইশ থানার (৩, ৭ নং ওয়ার্ড) মোট ভোটার তিন লক্ষ ১০ হাজার ৩৫৪ জন।
নগরীর অংশে ১০১টি ও বোয়ালখালী অংশের ৬৯টি মিলিয়ে ১৭০টি ভোট কেন্দ্রের এক হাজার ১৯৬টি কক্ষে ভোটাররা ভোট প্রদান করেছে। ভোটগ্রহণ শেষে প্রাপ্ত ফলাফলে বৈধ ভোটের সংখ্যা এক লক্ষ আট হাজার ৫৮১ ভোট।
এক নজরে মোছলেম উদ্দিন : বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম কধুরখীল গ্রামের কাজী মো. নকী বাড়ির মরহুম মোশারফ উদ্দিন আহমদের সন্তান মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। ১৯৪৮ সালের ১ জুন জন্মগ্রহণ করা মোছলেম উদ্দিনের রাজনৈতিক মাঠের কর্মী হিসেবেই পরিচিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ সরকারি মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্রবস্থায় প্রথমবার কারাবরণ করেন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম শহর শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা (দক্ষিণ) যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন মোছলেম উদ্দিন। ১৯৮৭ সালে বোয়ালখালী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে চারদফা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সাল থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে এখনো সে পদে বহাল আছেন। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দুই দফা ওয়ার্ড কমিশনার হওয়া ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে পরবর্তীতে জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন ছিল মোছলেম উদ্দিনের। এর আগে দুদফা জাতীয় নির্বাচনে পটিয়া আসন থেকে মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে না পারার দুঃখ দীর্ঘদিন পুড়িয়েছে বর্ষীয়ান এই নেতাকে। শেষ দুটি নির্বাচনে বোয়ালখালী আসন থেকে মনোনয়ন চাইলেও ব্যর্থ হন। এবার সাংসদ বাদলের মৃত্যুতে মনোনয়ন পাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা মোছলেম উদ্দিনের উপর আস্থা রাখেন।
গতকাল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়া নিশ্চিত হয়েছে মোছলেম উদ্দিনের।
প্রসঙ্গত, গত ৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যু হলে আসনটি শূন্য হয়। পরে গত ১ ডিসেম্বর শূন্য পদে উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।