নগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা

নৌকার প্রার্থীদের জয়ী করতে নেতারা ঐক্যবদ্ধ

রতন কান্তি দেবাশীষ

41

নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের জয়ী করতে একাট্টা নগর আওয়ামী লীগ নেতারা। অতীতের সকল ভেদাভেদ ভুলে প্রার্থীদের পক্ষে একযোগে কাজ করার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। নগরের চার আসনে নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থীদের হাতে হাত রেখে তাদের জেতাতে সকল ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার নগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় এ ঘোষণা দেন নেতারা।
এর আগে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে জাসদ একাংশের প্রার্থী মাঈনুদ্দিন খান বাদল সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় মেয়র তাদের জেতাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। নওফেল নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। নেতারা একাট্টা হওয়ায় তৃণমূল চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
গতকাল বিকালে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বর্ধিত সভায় সভাপতিত্ব করেন নগর আওয়ামী লীগের
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। এতে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ নগর, থানা ও ওয়ার্ড কমিটির নেতারা।
উপস্থিত ছিলেন নৌকা প্রতীকের চার প্রার্থী চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে জাসদ একাংশের নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদল, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর) আসনের ডা. আফসারুল আমিন ও চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের এম এ লতিফ।
বর্ধিত সভা শুরুর আগে নৌকা প্রতীকের চার প্রার্থী একে অপরের হাতে হাত রাখেন। একই সঙ্গে হাত মেলান উপস্থিত সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ উপস্থিত নেতারা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, আগের বর্ধিত সভাসমূহে নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও গতকালের সভাটি ছিল ব্যতিক্রম। কারো বিরুদ্ধে কোনোধরনের অভিযোগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেননি কেউ। সকলের মুখে ছিল একই সুর। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া। কিভাবে নৌকার প্রার্থীদের জেতানো যায়-সেটাই ছিল মূল আলোচনার বিষয়। বক্তব্য দানকালে নেতারা একযোগে মাঠে নামার প্রতিশ্রুতি দেন। সকল ভেদাভেদ ভুলে যেকোনো মূল্যে প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতি দেন।
বক্তারা বলেন, আমাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভুলবুঝাবুঝি নাই। আমরা এক। নৌকাই আমাদের প্রতীক। এই প্রতীকের প্রার্থীকে জেতাতে আমরা ভোটারদের ঘরে ঘরে যাব। ফসল আমাদের ঘরে উঠবেই।
সিটি মেয়র আ জ ম নাছির বলেন, নগরীসহ আশপাশের মোট ছয়টি আসনে প্রধানমন্ত্রী যাকেই মনোনয়ন দিয়েছেন তাকেই বিজয়ী করতে হবে। আল্লাহর ওয়াস্তে কোনোধরনের বিরোধ রাখবেন না। নেতাদের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের কেউ কেউ আমাদের ভুল বুঝে থাকতে পারেন। সব মতানৈক্য ভুলে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে।
মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারাও নেতাকর্মীদের সবাইকে নিয়ে কাজ করবেন, এই মনোভাব থাকতে হবে। তাহলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হবেন।
তিনি বলেন, বিজয়ের ভাগিদার সবাই হতে চায়। কিন্তু ব্যর্থতার ভাগ কেউ নিতে চায় না। মনের কথা বলছি। আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে চাই না, সম্মান ও মর্যাদা চাই। জীবনবাজি রেখে সব প্রার্থীকে জিতিয়ে আনব।
আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে এবং কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান সিটি মেয়র নাছির।
চট্টগ্রাম-৯ আসনে মনোনয়ন পাওয়া ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, নগর আওয়ামী লীগের এই বর্ধিত সভায় যারাই উপস্থিত আছেন, সবাই আমার পিতৃতুল্য। আমার প্রয়াত বাবা আপনাদের নিয়েই চট্টগ্রামে রাজনীতি করতেন। বাবার উত্তরসূরী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। করজোড়ে আপনাদের কাছে নৌকা প্রতীকে ভোট প্রত্যাশা করছি। সকল সংকীর্ণতাকে ঊর্ধ্বে রেখে ৩০ ডিসেম্বর নৌকাকে বিজয়ী করতে হবে। নগরের ৪টিসহ চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে নৌকার প্রার্থীদের বিজয়ী করতে হবে। যাতে ৩১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৌকা বিজয়ের মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে পারি।’
সকলের মতামত ও পরামর্শে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হবে জানিয়ে নওফেল আরও বলেন, চট্টগ্রামে শুধুমাত্র কোতোয়ালী আসনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হবে। সেই লক্ষে ভোটারদের প্রস্তুত করতে হবে। যাতে আওয়ামী লীগের নৌকার নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ভিশন বাস্তবায়িত হয়।
বর্ধিত সভায় আসা আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকপ্রাপ্ত নগরের ৪ আসনে প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগরের আসনগুলোতে যে ৪ জনকে নৌকার প্রার্থী করেছেন, তাদের বিজয়ী করতে হবে। সেই লক্ষে আমাদের কাজ করতে হবে।
মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, আমরা যারা বয়স্ক হয়ে গেছি, আমাদের নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। এই নির্বাচন হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাছে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সুযোগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া জাতির সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দিতে হলে নৌকাকে বিজয়ী করতে হবে।
সভায় ডা. আফছারুল আমিন ও এম এ লতিফ উভয়ই শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য নৌকা প্রতীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহব্বান জানান।
আফছারুল আমিন বলেন, ‘প্রত্যেক আসনের প্রার্থীরা একেকজন শেখ হাসিনার প্রতিচ্ছবি। শেখ হাসিনার জন্য এক হয়ে কাজ করতে হবে।’
এদিকে এর আগে দলের মনোনয়ন নিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে মহানগর আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। নগর ভবনে গিয়ে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে কথা বলে চট্টগ্রাম-৯ (কোতয়ালী-বাকলিয়া) আসনে বিজয়ের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রতিশ্রæতি এনেছেন নওফেল। হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে মেয়রের সঙ্গে প্রায় আধঘন্টা আলাপ করেছেন নওফেল। এসময় চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদলও ছিলেন।
মঙ্গলবার সকালে নওফেল চট্টগ্রামে আসেন। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী ও পিতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কবর জেয়ারত করে তিনি নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর বাসায় যান। এরপর দুপুর ২টা ৪১ মিনিটের দিকে যান নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নগর ভবনের কার্যালয়ে। প্রায় একই সময়ে বাদলও পৌঁছান সেখানে।
আলাপের সূত্রপাত ঘটিয়ে বাদল বলেন, মেয়রকে দেখতে এসেছি। একজন বললেন আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে। আমি বললাম- লঙ্ঘন কেন হবে? উনি তো চট্টগ্রামের মেয়র।’ তখন মেয়র বলেন, ‘আপনারা তো এখনও মনোনয়নপত্র জমা দেননি, আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে না। এটা তো সৌজন্য সাক্ষাৎ।’
মেয়র বাদলকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার মার্কা তো নৌকা।’। নওফেল বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন উনি (বাদল) সরাসরি নৌকার প্রার্থী।’
মেয়র বলেন, আগামীকাল (আজ বুধবার) সকালে জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসায় আসেন। সেখান থেকে সকাল ১১টায় আপনাদের নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাব।
বোয়ালখালী-চান্দগাঁও, কোতোয়ালী-বাকলিয়া, ডবলমুরিং-হালিশহর, বন্দর-পতেঙ্গা, সীতাকুন্ড-পাহাড়তলী এবং হাটহাজারী-পাহাড়তলী আসনের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনীত প্রার্থীদের নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাবার কথা বলেন মেয়র।
একপর্যায়ে নওফেল ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে চট্টগ্রাম-৯ আসনে এবারের নির্বাচনের প্রসঙ্গ তোলেন। মেয়র বলেন, ইভিএম নিয়ে আমার কোনো আইডিয়া নেই।
বাদল বলেন, জনগণকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একটা ভোট দিতে ২০ সেকেন্ড সময় লাগে।’ নওফেল বলেন- ‘এটা নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরাই চেয়েছিলাম। চট্টগ্রাম-৯ আসনে জিততে হবে। প্রমাণ করতে হবে ইভিএম আমলে আমরা জিতেছি। কুমিল্লায় ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হয়েছিল, আমরা হেরেছিলাম।
মেয়র বলেন- ‘কুমিল্লা আর চট্টগ্রাম এক না। চট্টগ্রাম-৯ আসনে আমরা অবশ্যই জিতবো।’ বাদল বলেন, ‘অবশ্যই জিতবো। এবারের নির্বাচন অনেক স্মুথ হবে।’
নওফেল রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির প্রসঙ্গ তুললে মেয়র বলেন, ‘আমি ওয়াসার চেয়ারম্যানকে বলেছি ৩০ নভেম্বরের পর যেন আর রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি না করে। কিন্তু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ নাকি শুরু হয়েছে। এখন উনাকে (সিডিএ চেয়ারম্যান) কে বোঝাবে ?’
বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে বাদল ও নওফেল মেয়রের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসেন।
এসময় মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেহেতু নির্বাচন, আমি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। উনি (নওফেল) তো ঢাকায় থাকেন। চট্টগ্রামে আসার পর নির্বাচন নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছিলেন।’
মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উন্নয়ন করেছেন, তাতে জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। চট্টগ্রামের সব আসনে আমরা জিতব, আমাদের সৎ সাহস আছে। আমি সেক্রেটারি সাহেবের (আ জ ম নাছির উদ্দীন) সঙ্গে দেখা করেছি। নেতাকর্মীরা অনেক উজ্জীবিত। চট্টগ্রাম-৯ আসন নেত্রীকে উপহার দেব।’
মঈনউদ্দিন খান বাদল বলেন, এবার দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা হচ্ছে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা এবং আরেকটি নতুন প্রজন্মের হাতে আগামী দিনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া। দুশ্চরিত্ররা যদি চক্রান্ত না করে তাহলে অবশ্যই আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে।