নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত হোক প্রাথমিক শিক্ষা

সাইদা আলম

38

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না এমন বাক্য ছোট বেলা থেকেই আমরা বুঝে বা না বুঝে মুখস্থ করে এসেছি এবং এগুলো অতিশয় সত্য বাণীও বটে। আর এ মেরুদণ্ড যে কারখানায় তৈরি হয় তার নাম প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটি শিশু ভবিষ্যতে কতটুকু ন্যায় নীতিবান, আদর্শবান,চরিত্রবান হবে কিংবা দেশ, জাতি, সমাজের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল হবে এটি অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁর প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার উপর। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তাই অপরিসীম। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে কি করা উচিত, এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষকের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সমস্যা এবং তা উত্তরণে কিইবা করণীয় সে সব বিষয় নিয়ে আলোকপাত করাই এই লেখাটির মুখ্য উদ্দেশ্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক জীবনধারণের উপকরণ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ১৭ (ক), (খ) ও (গ) অনুচ্ছেদে বালক-বালিকাদের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাসহ নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। এ জন্য ১৯৯২ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয় এবং সরকার প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তিসহ নানা ধরনের উৎসাহমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করে। এ ছাড়া শিক্ষাকে এখন প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য নানা ধরনের সংগঠনসহ বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। কি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, কি জাতি গঠন বা জাতীয় উন্নয়ন, সব ক্ষেত্রেই প্রাথমিক শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা নানাভাবে সমস্যায় জর্জরিত। পদে পদে প্রাথমিক শিক্ষা আজ বাধাগ্রস্ত। আমরা জাতির উত্থানের কথা ভাবি কিন্তু পতনের কথা ভাবি না। তাই বলে কি একটি জাতি উত্থানের পর পতন হয় না? একটা জাতি কিসের ওপর ভিত্তি করে উত্থান ঘটবে? তা নির্ধারিত হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের ওপর। একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন গোটা জাতিকেই পরিবর্তন করতে। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে সেই আদর্শ শিক্ষকই যেন আজ সোনার হরিণ। গোটা সমাজ খুঁজেও একজন সত্যিকারের আদর্শ শিক্ষক খুঁজে পাওয়া ভার।
এবার আসা যাক যিনি কাদামাটি-তুল্য শিশুদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সোপান তৈরি করেন, সেই আদর্শ শিক্ষক বলতে আসলে আমরা কাকে বুঝি সে প্রসঙ্গে। কে হবেন আদর্শ শিক্ষক, তাঁর ভেতর কী কী গুণাবলি থাকা উচিত? সাধারণভাবেই বলা যায়, আদর্শ শিক্ষক তিনিই, যিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকবেন, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকবেন, ছাত্রছাত্রীদের প্রতি স্নেহ ও দায়িত্বশীল হবেন, পড়ানোর পূর্বে পাঠ সম্পর্কে অবগত হবেন, পাঠ্যের বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে যার পড়াশোনা থাকবে।
আমরা জানি, এক দশক আগেও বাংলাদেশে স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীর হার ছিল খুব কম এবং মেয়েদের হার ছিল আরও কম। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ যেমন সময়মত বই বিতরণ, বিনা বেতনে শিক্ষা, ফ্রি টিফিনের ব্যবস্থা, বাল্য বিবাহ রোধ প্রভৃতি কারণে স্কুলগামী ছেলেমেয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি শিক্ষার হারও প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে অপরিহার্য স্তম্ভ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। একটা ভালো বীজ থেকে যেমন একটা গাছ মহীরুহ হয়ে ওঠে, তেমনি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ গঠন ও উন্নয়নের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়। কারণ প্রাথমিক শিক্ষাই চলমান মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার বীজ।
সুতরাং আসুন শিক্ষিত জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত শক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সবাই যে যার জায়গা থেকে নিঃস্বার্থ সেবাদান করে ইতিহাসের অংশ হই।