নেইমার জাদুতে কোয়ার্টারে ব্রাজিল

পূর্বদেশ ক্রীড়া ডেস্ক

30

রাশিয়া বিশ্বকাপে ঝরে পড়া বড় দলগুলোর তালিকায় যোগ হলো না ব্রাজিলের নাম। দলের প্রাণভোমরা নেইমারের নৈপুণ্যে জায়ান্ট কিলার মেক্সিকোকে ২-০ গোলে হারিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠে গেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। নেইমার প্রথম গোলটি করেছেন। পরে ফিরমিনোকে দিয়ে করিয়েছেন দ্বিতীয় গোলটি।
ব্যবধান আরও বাড়েনি গোলরক্ষক গিলের্মো ওচোয়ার নৈপুণ্যে। অন্যপ্রান্তে ব্রাজিলের গোল পোস্টে বেগই পেতে হয়নি আলিসনকে। এখন পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যেসব ম্যাচে নেইমার গোল করেছেন তার কোনোটি হারেনি ব্রাজিল। আবার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে কখনো জিততে পারেনি মেক্সিকো। শুধু তাই না, এই আসরের জায়ান্ট কিলার এবং প্রতিভাবান দলটি কোনো বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে পিছিয়ে পড়ে কখনো জিততে পারেনি। গেল ৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোল থেকেই বাদ পড়েছে তারা। এবারও তাই হলো।
মেক্সিকোর কাছেই হারা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি বাদ পড়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকে। শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা, স্পেন, পর্তুগাল। আর কোনো চমক হতে দেয় নি ফেভারিটের তকমা বয়ে চলা ব্রাজিল। সোমবার ভলগা নদীর কাছের শহর সামারায় হাড্ডাহাড্ডি একটা ম্যাচ যে হবে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল আগেরদিন থেকেই। দুদলের পক্ষ থেকেই ছিল মাঠের খেলায় আক্রমণাত্মক হওয়ার হুঙ্কার। ম্যাচের শুরু থেকেই মিলল সেটার নমুনা। ব্রাজিল শুরুতে খানিকটা খেই হারালেও আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে খেলা জমে ওঠে দ্রুতই। তবে প্রথমার্ধে আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে থাকে গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে হারানো মেক্সিকো। তাদের মুহুর্মুহু কাউন্টার আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। বারবার ডি বক্সের ভেতর বল পেলেও নিখুঁত ফিনিশিং এবং যোগ্য স্ট্রাইকারের অভাবে গোল বঞ্চিত হতে থাকে মেক্সিকানরা।
প্রথমার্ধের ২০/২৫ মিনিটের খেলা দেখে মনে হয়েছে মেক্সিকানরা যে প্রবল গতিতে শুরু করেছিলেন সেটারই জবাব ভিন্ন কৌশলে দিলেন ব্রাজিলিয়ানরা। সামারায় গরম খুব, আর্দ্রতাও বেশি। ব্রাজিল অপেক্ষাকৃত কম গতিতে আক্রমণে গিয়ে বল দখলে রাখছিল বেশি। মেক্সিকানদের দ্রুত ক্লান্ত করে দিয়ে তারপর যা করার কৌশল।
ম্যাচের প্রথম সুযোগটা মেক্সিকোই তৈরি করে। আন্দ্রেস গুয়ারদাদোর তোলা ক্রস পাঞ্চ করে লোজানোর নাগালের বাইরে পাঠান ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক আলিসন। প্রায় সাথে সাথেই জবাব দেন ব্রাজিলিয়ানরা।
ম্যাচের ২৫ মিনিটে ডি বক্সের ভেতর দুজনকে কাঁটিয়ে জোরালো শট নেন নেইমার কিন্তু ওচোয়া আরো একবার বাধা হয়ে দাঁড়ান ব্রাজিলের সামনে। এর ঠিক দু’মিনিট পর কৌতিনহোর দূরপাল্লার শট গোলবারের উপর দিয়ে চলে যায়। ৩২ মিনিটে কৌতিনহোর শট রুখে দেন ২০১৪ সালে ব্রাজিলকে একাই রুখে দেওয়া ওচোয়া। আস্তে আস্তে ম্যাচে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে ব্রাজিল। ৩৯ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে নেইমারকে ফাউল করলে রেফারি ফ্রি-কিকের সিদ্ধান্ত দেন। ডি বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া নেইমারের ফ্রি-কিকটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে হাপ ছেড়ে বাঁচে মেক্সিকো। ম্যাচে আর কোন আক্রমণ না হলে গোলশূন্য থেকেই শেষ হয় প্রথমার্ধ।
প্রথমার্ধের শুরু থেকে দুর্ধর্ষ গতিতে আক্রমণ করে যাওয়া মেক্সিকানদের কিছুটা ক্লান্ত করে তবেই চূড়ান্ত আক্রমণে গিয়েছিলেন নেইমাররা। সারা মাঠ চষে বেড়ানো উইলিয়ানের পর দ্বিতীয়ার্ধে নেইমার যাদুতে মুখ থুবড়ে পরে মেক্সিকান রক্ষণভাগ। কয়েকটি সুযোগ তাতে তৈরি হলেও গোল হয়নি। কিন্তু এবারের আসরে অনেকটা অনুজ্জ্বল উইলিয়ান পেনাল্টি বক্সের মধ্যে দুর্দান্ত একটু সুযোগ তৈরি করলেন। গোলমুখে অপেক্ষমান নেইমারকে নিচু করে বল ঠেলে দিলেন দ্রুত। চোখের পলকে গোলকিপার ওচোয়াকে সুযোগ না দিয়ে সেই বল জালে জড়িয়ে ১-০ গোলের লিড এনে দিলেন নেইমার। তাতে নেইমার ব্রাজিলের ইতিহাসের একটি অংশ হলেন, ঢুকলেন রেকর্ডের পাতায়। এটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ২২৭তম গোল। এতদিন টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের মালিক জার্মানিকে (২২৬ গোল) নেইমারের গোলেই ছাড়িয়ে গেল ব্রাজিল।
এরপর আরো আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ চলল। মেক্সিকানরাও গোলের সুযোগ তৈরি করে কাজে লাগাতে পারলো না। আরো গোল পাওয়ার কাছাকাছি গেল ব্রাজিল। কিন্তু তাদের দ্বিতীয় গোলটি এল কৌটিনহোর জায়গায় ৮৬ মিনিটে খেলতে নামা ফিরমিনহোর কাছ থেকে। নেইমার নিজেই চেষ্টা করেছিলেন গোলের। কিন্তু এই ম্যাচে অসাধারণ কিছু সেভ করা মেক্সিকান গোলকিপার ওচোয়া কোনো মতে ঠেকালেও নেইমারের নিখুঁত থ্রু পাসের বলটাকে ফিরমিনো জাল চিনিয়ে দিলেন (২-০)। এরপর কি আর ফেরার উপায় থাকে মেক্সিকোর! টানা সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোল থেকে তাদের বিদায়! বেলজিয়াম ও জাপানের মধ্যকার জয়ী দলের সঙ্গেই কোয়ার্টারে খেলবে ব্রাজিল।

মেসি
রোনালদোকে
ছাড়িয়ে নেইমার

পূর্বদেশ ক্রীড়া ডেস্ক
?রাশিয়া বিশ্বকাপের হিসাব আমলে নিলে মেসি ও রোনালদোর সঙ্গে নেইমারের তুলনা চলে না। দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়েছে আর্জেন্টিনা ও পতুর্গাল। এখন দর্শক হিসেবে বাকি বিশ্বকাপটা দেখতে হবে এই দুই বড় তারকাকে। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ভালো হলেও দলকে উপরে টেনে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন মেসি ও রোনালদো। অন্যদিকে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে প্রায় ব্রাজিলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দিয়েছেন নেইমার।
মেক্সিকোর বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতেছে ব্রাজিল। এক গোল করার পাশাপাশি ফিরমিনোকে দিয়ে গোলও করিয়েছেন নেইমার। এনিয়ে বিশ্বকাপে ব্রাজিল তারকার গোল হলো ছয়টি। এই গোল করতে নেইমার গোলপোস্টে শট নিয়েছেন মাত্র ৩৮টি। এতো কম শট নিয়ে ছয় গোলের রেকর্ড ফুটবল বিশ্বে বিরল।
বিশ্বকাপে গোল সংখ্যায় কাল মেসিকে ছাড়িয়ে গেলেন নেইমার। চারটি বিশ্বকাপ খেলে ছয়টি গোল করেন আর্জেন্টাইন তারকা। নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপেই সাবেক ক্লাব সতীর্থকে ছাড়িয়ে গেলেন নেইমার। মেসিকে ছাড়িয়ে এখন রোনালদোর পাশে বসার অপেক্ষায় ব্রাজিল তারকা। বিশ্বকাপে রোনালদোর গোল সাতটি।
একটা জায়গায় অবশ্য মেসি রোনালদোকে ছাড়িয়ে গেলেন নেইমার। ছয়টি গোল করতে মেসিকে গোলমুখে ৬৭টি শট নিতে হয়েছে। অন্যদিকে মেসির সমান গোল করতে রোনালদো শট নিয়েছেন ৭৪টি। সেই তুলনায় অর্ধেকেরও কম শট নিয়ে সিনিয়র দুই গ্রেটকে ছাড়িয়ে গেলেন ব্রাজিল সেনসেশন। ছয় গোল করতে ৩৮টি শট নিতে হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি এই ফুটবলারকে।