নির্ভীক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী স্মরণে

এএম জিয়া হাবীব আহসান

20

আজ ১১ জানুয়ারি ২০১৯ দেশপ্রেমের বাতিঘরখ্যাত নির্ভীক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীর ২৫তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এদিনে জাতির বিবেক, দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীর অভিভাবক বিচারপতি চৌধুরী ইন্তেকাল করেন। তিনি একাধারে মানবাধিকার আন্দোলনের সোচ্চার কণ্ঠস্বর, ভাষাসৈনিক, অনলবর্ষী বক্তা, সুলেখক, বিচক্ষণ ও নির্ভীক বিচারপতি ছিলেন। নতুন প্রজন্ম এ ধরনের দেশপ্রেমিক মহামানবদের ভুলে গেলে তা হবে জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। জনাব চৌধুরীর জীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি বরিশালের জমিদার খাঁন বাহাদুর আব্দুল লতিফ চৌধুরী সাহেবের পুত্র-যিনি কাউন্সিল অফ স্টেট অফ ইন্ডিয়া এবং বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল এর সদস্য ছিলেন। বিচারপতি চৌধুরী ১৯২৬ সালের ১ ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুল থেকে জুনিয়র কেম্ব্রিজ এবং ১৯৪২ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে স্টার মার্কসহ প্রথম বিভাগে ইংরেজিতে প্রথম হওয়ার জন্য ‘ডিসিলিভা’ স্বর্ণপদকসহ ম্যাট্রিক পাস করেন। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই.এ এবং বি.এ পাস করে। ১৯৪৬ মুসলিম হলের ভিপি ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের স্থপতি অধ্যক্ষ আবুল কাশেমের ঘনিষ্ঠ ও ¯েœহভাজন ছিলেন। ভাষার দাবিতে অনুষ্ঠিত ছাত্র যুবসম্মেলনে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। একই বছরে ১৯৫৫ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সাল হতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তিনি ১৯৬৬-১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১৯৬১ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে তিনি ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশনের পরিচালক নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৩ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই পদে বহাল থাকেন। তৎকালীন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াকু সৈনিক বিচারপতি চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত সরকারের রোষানলে পড়ে চাকরি হারাতে হয়। বিচারপতি ১৯৭৭-৭৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়। জাপানের মত একটি শক্তিশালী দেশকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিচারপতি চৌধুরী মুখ্য ভ‚মিকা পালন করে। দেশের আদর্শ সচেতন বুদ্ধিজীবী, ক‚টনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে তিনি ‘লিবার্টি ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১ম চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারপতি চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান রাইতোস এ্যান্ড লিগ্যাল এ্যাফেয়ার্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। তিনি বসনিয়া সলিডারিটি ফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হন। তিনি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ একাডেমীর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আরবিট্রশনে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের একজন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁকে বাংলাদেশের বিবেক বলা হত। সত্য ও ন্যায়ের কথা উচ্চারিত কণ্ঠে নির্ভয়ে যাঁরা বলে গেছেন মরহুম চৌধুরী তাদের অন্যতম। সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলার অদম্য সাহস ছিল এ অসাধারণ ব্যক্তিত্বের। এ সাহস সবার থাকে না। বহু বিশাল ব্যক্তিত্বকেও অন্যায়ের সাথে, মিথ্যার সাথে আপস কিংবা আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। মরহুম বিচারপতি রহমান ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ জন্যই তার প্রতি জাতির এত শ্রদ্ধাবোধ ও গভীর ভালোবাসা। রোগাক্রন্ত অবস্থায়ও মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বলে গেছেন সত্যের কথা দেশপ্রেম, ইমাম, ইসলাম, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের কথা। চেসনিয়া, বসনিয়া, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তানসহ দেশে-বিদেশে সকল প্রকার নির্যাতন, মানবাধিকার লঙনের ঘটনায় তিনি ছিলেন সোচ্চার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। আজীবন তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের সাধক। ছাত্রজীবন থেকে তিনি ছিলেন সত্য উচ্চারণে উদ্দীপ্ত। তারপর কর্মক্ষেত্রে এসেও মরহুম চৌধুরী একজন সফল আইনজীবী ও পরবর্তীতে সফল বিচারপতি হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় ভ‚মিকা রাখেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রফেসর নুরুল ইসলাম (পরবর্তীতে জাতীয় অধ্যাপক) বনাম বাংলাদেশ সরকার শীর্ষক মামলায় তাঁর প্রদত্ত রায় দেশে বিদেশে ব্যাপক সাড়া তোলে। ভারতের বহু কোর্টে তা পরবর্তীতে অনুসরণ করা হয়। সরকার পিজি হাসপাতালের পরিচালক পদ থেকে প্রফেসর নুরুল ইসলামকে অপসারণ কররে দীর্ঘ শুনানি শেষে তাঁকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। উক্ত মামলায় সাংবিধানিক বহু প্রশ্ন ও বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা। তাঁর প্রদত্ত রায়গুলোর মধ্যে রক্ষাবাহিনী, কিং ফিসারিজ, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, ডিআইটি প্রভুতি মামলার রায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মরহুম বিচারপতি জীবনে কখনো কোনা মৃত্যুদন্ডের রায় দেননি বা বহাল রাখেননি। কেননা বহু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় তিনি দেখছেন সাজানো সাক্ষীর কারণে অনেকের মৃত্যুদন্ড হয়। তিনি বিচারের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বেশি বিবেচনায় আনতেন।
অগাধ জ্ঞান ও সুতীক্ষন বাগ্মীতার অধিকারী বিচারপতি চৌধুরী প্রচুর পড়াশোনা করতেন। আপন বলয়ের বাইরের প্রতিপক্ষের বলয়েও বিচারপতি ছিলেন সমান আলোচিত-সমালোচিত সদালাপী সুসংস্কৃত এবং বন্ধুবৎসল। বিচারপতি চৌধুরী তাঁর অদ্ভুত পান্ডিত্যে বিচিত্র শব্দচয়নে উচ্চমানের হিউমার রচনা করে কথা বলতেন। ঘরোয়া মজলিসে কিংবা সভা সেমিনারে তিনি শ্রোতাদের যেমন উদ্দীপ্ত করতে পারতেন তেমনি হাসাতেও পারতেন সমান দক্ষতায়। গুরুগম্ভীর বক্তৃতায় হাস্যরসের মিশেল দিয়ে তিনি শ্রোতাবর্গকে ধরে রাখতে জানতেন। রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠার সুযোগ লাভ করেছিলেন। এমনকি তার বোনেরাও উচ্চ শিক্ষা লাভে অনুমতি পেয়েছিল পরিবার থেকে। আধুনিক শিক্ষার প্রভাব এবং পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বিচারপতি চৌধুরী মন মানসিকতাকে বিশাল করে তুলেছিলেন। পারিবারিক দিক দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ধনাঢ্য-বনেদী-সংস্কৃতিমনা, সমাজ সচেতন উলানিয়ার জমিদার বাড়ির সন্তান হিসেবে তিনি বেড়ে উঠলেও পারিপার্শ্বিকতাবোধ, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক অনুভ‚তি কখনো তাঁর ব্যক্তিত্বের ভারিক্কিকে আচ্ছন্ন করেনি।
পরিণত বয়সে তিনি বহুবার চট্টগ্রামের আসলে লেখকের সাথে তার দেখা ও পরিচয়ের সূত্রপাত হয়। চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি ছিলো তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। চট্টগ্রামে যখনই তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে তিনি চট্টগ্রাম বাসির ডাকে সাড়া দিয়েছেন। চট্টগ্রামে বহু সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে তাঁর মূল্যবান বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম থেকেই প্রকাশিত হয় বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী স্মারক গ্রন্থ ও স্মরণ সভা কমিটির একজন ক্ষুদে সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আজকের দিনে তাঁর কথা বার বার মনে পড়ছে। ১৯৯৪ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি ঢাকার সিএমইচ- এ মৃত্যুবরণ করেন। তাকে বনানী গোরবস্থানে দাফন করা হয়। তার স্ত্রী মিসেস সিতারা বেগম সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ জানে আলমের একমাত্র কন্যা। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, দুই কন্যা, অসংখ্য আদর্শ সচেতন গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বর্তমানে তাঁর সুযোগ্য পুত্র জাস্টিস জুবাইর রহমান চৌধুরী মহামান্য হাইকোর্টের সম্মানিত বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বড় কন্যা মিসেস রুসেলী রহমান চৌধুরী ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগ হতে এম.এস.সি পাস করেন। তিনি চট্টগ্রাম মহিলা কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ গ্রাজুয়েট উইমেন ইন্টারন্যাশনাল এর সভাপতি এবং ইনার হুইল ক্লাব চট্টগ্রাম মেট্রো শাখার সাবেক প্রেসিডেন্টও হিসেবে জনহিতকর কর্মকান্ডে ব্যাপক অবদান রেখে যাচ্ছেন। রুসেলি রহমান চৌধুরীর সাথে আমার নিজ গ্রাম হাটহাজারী গুমানমর্দন ইউনিয়নের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব মরহুম সিরাজুল ইসলাম মাহমুদের পুত্র ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এর ছোট ভাই ডা. মাইনুল ইসলাম মাহমুদ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রুসেলী মাহমুদ ইঞ্জিনিয়ার শাদার মাহমুদ ও ব্যারিস্টার সাজিদ মাহমুদের জননী। আমাদের দুর্ভাগ্য জাতীয় জীবনে তাঁর মত প্রজ্ঞা ও সাহসী ব্যক্তিত্বের যে নেতৃত্ব আমাদের প্রয়োজন ছিল তা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম।
ভাষা আন্দোলনে তাঁরা ভ‚মিকা ও অবদানের জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বর সড়কটি ‘ভাষাসৈনিক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী সড়ক’ নামকরণ করেন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে বিরাট অবদান সত্ত্বেও তিনি অদ্যাবধি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হোক।
একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এ দেশের মানবাধিকার কর্মকান্ডে সোচ্চার কণ্ঠস্বর মরহুম জাস্টিস রহমানকে তার ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশেষভাবে স্মরণ করছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই মহান ব্যক্তিত্বের সকল খেদমত কবুল করুন। আমিন।

লেখক : আইনজীবী