নির্ভরতার অনুর্বর ভূমি

জি.এম সামদানী

7

আমাদের কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডের জন্য নির্ভরতার উর্বর ভূমিটা দিন দিন অনুর্বর হতে চলেছে। “কারো উপর নির্ভর করা যায় না।”- একথা বলেন, মাননীয় সিইসি এ কে এম নূরুল হুদা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮, সদ্য সমাপ্ত একাদশ নির্বাচনের পরদিন সংবাদ সম্মেলনে ল্যাপটপ দেখে বক্তব্য পাঠ করতে গিয়ে। তাঁর মতো আমরা প্রত্যেকেই প্রতিক্ষণ এমন শব্দবোমা ফাটাচ্ছি। ব্যক্তি পরিবার সমাজ সংগঠন এমনকি রাষ্ট্র ও বিশ্বরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে কেহই স্বনির্ভর নয়, অন্যের উপর প্রত্যেককে নির্ভর করতে হয়, যতবড় শক্তিশালীই হোক না কেন। নির্ভরতা নির্ভর করে ভালো সম্পর্কের উপর আর ভালো সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা বিশ্বাস ও ভালোবাসার উপর। সম্পর্কের ভিত তৈরি হয় পরিবারে। তাই আস্থা বিশ্বাস ও ভালোবাসা পারিবারিক পরিমন্ডলে তৈরি না হলে সমাজ সংগঠন ও রাষ্ট্রে এর সংকট হওয়াই স্বাভাবিক। অর্থের সাগরে ভাসমান জীবনে আস্থা বিশ্বাস ও ভালোবাসা হাবুডুবু খেয়ে মরতে বসেছে। তাই নির্ভরতার উর্বর ভূমিটা সন্দেহ অবিশ্বাস ও অনাস্থার করাল গ্রাসে বিলীন হতে চলেছে, সেদিকে আমাদের নজর নেহায়েতই নগন্য। এ সুযোগে হতাশা দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা আমাদের সকল সুস্থ ভাবনার বীজতলাকে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। নির্ভরতার সিড়িতে পা রেখেই একদিন সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং বর্তমান সভ্য সমাজেও এর গুরুত্ব এতটুকু কমেনি বরং বেড়েছে। নির্ভরতার সুযোগকে অর্থোপার্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করায় বিশ্বমানবতা আজ মরতে বসেছে। নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কীভাবে গলাটিপে শ্বাসরুদ্ধ করে মারছে “Dependency theory” তে আমরা এর ভিডিও ফুটেজ দেখতে পাই। পরিবার থেকেই জীবনের যাত্রা। তাই নির্ভরতার অবস্থান নির্ণয় করার জন্য পরিবার থেকে বিশ্বপরিবার সমগ্র গ্যালারী পরিভ্রমণ করে আসা দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে পারিবারিক কাঠামো বদলে যায়। স্বামী-স্ত্রী উভয় অর্থোপার্জনে মাঠে নামে। স্ত্রী আর্থিক অবদানের মাধ্যমে পরিবারে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাটি পাকাপুক্ত করে নেয়। স্বামী এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারায়। বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্ত্রী পরামর্শকের ভূমিকায় থাকতেও রাজি নয়, বরং তাঁর সিদ্ধান্ত স্বামীর উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বামীর একক কর্তৃত্ব আর কাজ করছে না। যা স্বামীর শিল্পযুগে ছিল। কর্তৃত্ব নিয়ে উভয়ের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। বিশ্বাস আস্থা ও ভালোবাসা সে যুদ্ধ সামাল দিতে পারছে না। ব্যক্তি স্বতন্ত্র্যবোধ ও কর্তৃত্বপরায়ণতা আস্থা বিশ্বাস ও ভালোবাসার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের উপর নির্ভর করতে পারছে না। স্বামী স্ত্রীর জন্য করে না এমন কোনো কাজ নেই। নিজের মা বাবা ভাই-বোনকে পেছনের সিটে বসিয়েও স্ত্রীর ঘ্যানঘ্যানানিতে স্বামী ঠান্ডা মাথায় সংসারের গাড়িটা চালাতে পারছে না। “আর্থিক অবদান রাখছে বলে স্বামীর কোনো অবদানই স্ত্রীর চোখে পড়ে না।”- একথা বলেন আমার এক বন্ধু আবহাওয়া কর্মকর্তা। এমনকি যারা আর্থিক অবদান রাখছে না তাদের দাপটও কম নয়। মোট কথা হলো, কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের টানাটানিতে পারিবারিক শাসনের রশিটা ছিড়ে যাবার উপক্রম প্রায়। এই অবস্থায়ও আমরা পেছন ফিরে তাকাতে রাজি নই। অর্থায়নের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করে নারীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে আদা জল খেয়ে নেমেছি। তবে এজন্য নারীর চেয়ে পুরুষই বেশি দায়ী। আমরা শিক্ষিত বাবারা মেয়েদের শিক্ষা দিচ্ছি না কীভাবে তাকে সংসারী হতে হবে, স্বামীর অনুগত হয়ে চলতে হবে, বরং কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বামীর উপর নির্ভর করতে না হয় এর সকল ব্যবস্থা করছি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানামানির চর্চা না থাকায় সন্তানরাও ভুলে যাচ্ছে বড়দের মান্য করতে, অন্যদের শ্রদ্ধা করতে। “তুমি তো আব্বুকে মান না”- টিভির এ বিজ্ঞাপনটিও আমাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না । গুরু দক্ষিণা আজ তলানীতে এসে ঠেকেছে। গরু মেরে জুতো দান ব্যবস্থার প্রচলন আমরাই ঘটিয়েছি। তাই পরিবারেই আমরা কেউ কারো উপর নির্ভর করতে পারছি না। পরিবারের এই স্রোত বিশ্বায়নের সুবাদে বিশ্ব পরিবারের প্রতিটি ঘরে ঘরে ঢেউ তুলেছে। সমাজে অন্যের উপর নির্ভর করতে পারছি না বলেই পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ কারো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ছি না, যা আমাদের সন্তানদের বিপথগামী হবার পথকে সুগম করছে। বিপথগামী হওয়া থেকে প্রতিবেশিরা আমাদের সন্তানদের বাধা দিবে, এটা আশা করতে পারি না। আমার মেয়েকে বখাটেরা ধর্ষণ করলে সবাই দৌঁড়ে আসবে তাকে রক্ষা করতে, এ আশা ছেড়ে দিয়েছি। নির্ভর করতে পারছি না আমরা নিজের উপরও। আজ যা বলি কাল তার উল্টোটা করি, কথা কাজে ঠিক থাকি না। অথচ নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে অন্যের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই, কিন্তু অন্যের উপর ভরসা করতে পারি কতটুকু? ভাবী, যাব কোথায়, সবাই অপেক্ষায় আছে ছিল্লা কাইটা লবন লাগাবার তালে। এই যন্ত্রনায় সবাই জ্বলছি। নির্ভর করতে পারলে নির্ভয়ে অন্যের জন্য সবকিছু করতে আমরা রাজি। পরস্পরের উপর নির্ভর করতে না পারাটাই সকল সমস্যার মূল। নির্ভর করতে পারছি না বলে একান্তই না ঠেকলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই না, থানা পুলিশ আদালত থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করি। শিক্ষকের কাছে সন্তানদের পড়াতে দিয়েও স্বস্তিতে থাকতে পারছি না। কর্মক্ষেত্রে নেই সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ। নির্ভর করতে গেলেই ঠকতে হবে, এ ভয়ে কারো উপর নির্ভর করতে গিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে হয়। প্রথমেই আসা যাক সম্মানিত শিক্ষকের কথা। শিক্ষক সমাজের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। শিক্ষক সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ধারণাটি হলো: মা বাবা সন্তানের জন্মদাতা কিন্তু মানুষ বানায় শিক্ষক। এমনটা আমরাও আমাদের সময়ে অনেক শিক্ষকের বেলায় দেখেছি। পরিবারের প্রতি নজর না দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে পড়ে থাকতেন। যার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বুড়িচং থানার মাদবপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান স্যার। আমার বন্ধু মুজিবুর রহমান সম্রাট কসবা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। ৬ষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত রোল এক। দশম শ্রেণিতে রোল হয় দুই এবং অংকে পায় ২৭। দশম শ্রেণিতে উঠে সে মাধবপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে যায়। এ নিয়ে প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করলে হাবিবুর রহমান স্যার বিষয়াটিকে আরো সিরিয়াসলি নেন। তাকে নিজের রুমে রেখে দিনরাত খেটে এস এস সিতে মানবিকে ১৭তম ঝঃধহফ করান। স্যারেরই গড়া ঝঃধহফ করা আরেক ছাত্র ড. ফরিদ উদ্দিন স্যার যিনি বর্তমান সিলেট প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। এরকম বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে নিজ বাড়িতে রেখে ছাত্র-ছাত্রীদের দেখভাল করে প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু এখন পত্রিকা খুললেই দেখি শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রীর যৌন হয়রানী, ধর্ষণের খবর। এমনকি শিক্ষকের কাছে ছাত্র বলৎকার হবার মতো নির্লজ্জ ঘটনাও। হেফজ বিভাগের প্রধান হাফেজের রুমে নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ইংরেজী বিভাগের শিক্ষকও এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। ছাত্রীকে যৌন হয়রানির দায়ে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান আক্কাস আলীকে বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে আজীবনের জন্য অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। গত এক মাস ধরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশুনা বর্জন করে ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। যেখানে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক- কর্মচারীরা তাঁর উপর নির্ভর করতে পারছে না, তবু সে পদত্যাগ করতে রাজি নয়। জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসকের উপর আমরা কতটুকু নির্ভর করতে পারছি তা নুসরাতের ঘটনাই প্রমাণ করে। ইতোমধ্যে কমিশনার, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও থানার ওসি জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এমনকি মাদ্রাসা বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অতিরিক্ত জেলা মাজিষ্ট্রেটের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। ৪ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট বলেন “ প্রিন্সিপাল খারাপ তো সবাই জানে, তুমি তার কাছে গেলে কেন?” প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নুসরাত ও তাঁর পরিবার আমার সাথে দেখা করতে আসলে আমি তাদের বলেছি, “অধ্যক্ষের স্বভাব খারাপ। মামলা করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।” অথচ এর আগেও লিখিতভাবে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও অর্থ আত্নসাতের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল (০১ এপ্রিল প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবর)। আদালতও ঠিকাদারী ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। জেলা প্রশাসক যেখানে ভূয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে জেলে যেতে পারেন, জনগন নির্ভর করবে কার উপর? আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যার্য্য হিস্যার ব্যাপারে আমরা কি বন্ধু প্রতীম প্রতিবেশি দেশ ভারতের উপর নির্ভর করতে পারছি? উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণদান ও আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের উপর নির্ভরশীল করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, এমনকি সার্বভৌমত্বেও আঘাত হানছে। দায়িত্বশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে এনে আমরা পারি নির্ভরতার অনুর্বর ভূমিটাকে উর্বর করতে। এজন্য দরকার আমাদের কমিটমেন্ট ও আন্তরিক প্রচেষ্টা। আর দরকার একটি ভালো ও বড় মন।

লেখক : কলামিস্ট