নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’

কাজি রশিদ উদ্দিন

6

কি লিখবো ভেবে কিছু ঠিক করতে পারছি না। দেশে এখন গরম হাওয়া বইছে। পূর্বদেশের পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, দেশে এখন শীতের আমেজ। ঠান্ডা ক্রমাগত বাড়ার জন্যে উকিঝুকি মারছে। আসলে আমি আবহাওয়াজনিত ঠান্ডার কথা বলছি না আমি বলতে চাচ্ছি দেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গরম হাওয়া বইছে। এটি সরকার বদলের নির্বাচন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে শুধু সরকার আর বিরোধী দল নয়। নির্বাচন কমিশনের জন্যও এক মহাপরীক্ষা। সুযোগ দেয়া এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য গণরায় অর্জন বিরোধী দলের পরীক্ষা হলো গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। আর নির্বাচন কমিশনকে পরীক্ষা দিতে হবে-একটি অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সাহস ও যোগ্যতার প্রমাণ দেয়ার জন্য। এবার রিটার্নিং অফিসারদের সভায় একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘এই নির্বাচন হচ্ছে জনগণের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার নির্বাচন। যিনিই হোন না কেন, কারো অন্যায় চাপে নতি স্বীকার না করতে তিনি রিটার্নিং অফিসারদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। কিছুটা বিতর্কিত সিইসি এতটা সাহসী বক্তব্য না দিলেও তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপরই জোর দিয়েছেন। এখন কথা আর কাজে মিল থাকলেই হয়।
আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময় (সামরিক-বেসামরিক সরকার নির্বিশেষে) নির্বাচন কমিশনকে মেরদন্ডহীন নতজানু ও দায়সারা গোছরের দেখে এসেছে দেশবাসী। একবার তো টেলিভিশনে দেখতে পেলাম এক নির্বাচন কমিশনারকে দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে বলতে এই দেখুন আমার মেরুদন্ড কতটা শক্ত। এই পরিস্থিতিতে জনগণকে অর্থাৎ ভোটারদের আশ্বস্ত করাই নয়, তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে ইসিকে।
সংবিধান যতটা ক্ষমতা দিয়েছে তাদের, এর যথার্থ প্রয়োগ অপরিহার্য। অন্যথায় তাদের সাক্ষী গোপাল ভূমিকাকে ইতিহাস ক্ষমা করবেন না।
নির্বাচনী খেলার মাঠ কি সমতল হবে। নাকি উঁচু-নিচু খাদখন্দে ভরপুর থাকবে। এটা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর। এখানে নির্বাচনরূপী খেলায় যত টিম বা পক্ষ আছে, সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য এখন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ক্ষমতাবান না ক্ষমতাহীন, ভিআইপি না অর্ডিনারি, অমুক মার্কা না তমুক মার্কা এসব মোটেও বিবেচনা না করে সব দল, জোট, প্রার্থী ও প্রতীকের জন্য একই সুযোগ সুবিধা ও অধিকারের গ্যারান্টি দিতে হবে ইসিকেই। এ জন্য ইসি প্রয়োজনে করবে। প্রশাসনকে তার নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করবে ইসির সাংবিধানিক ক্ষমতার বলে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি সর্বশেষ অবশ্য একটি ‘ঐতিহাসিক’ বক্তব্য দিয়েছেন, যা বাস্তবায়ন করা গেলে তাকে জাতি স্মরণে রাখবে বৈকি। তিনি বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনেও যে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ তিনি গ্রহণ করেছেন। এটা বাত কি বাত (কথায় কথা), ফাঁকা বুলি, না সত্যিই তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখার মত দৃঢ়তা দেখাবেন, তা সামনের দিনগুলোতে প্রমাণিত হবে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন খবাবষ চষধুরহম ঋরবষফ কথাটা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত ও আলোচিত সবার জানা কথা খেলার মাঠ। সেখানে খেলায় অংশ নেয়া সবার জন্যই একই রকম হতে হয়। কেবল দু’একটি টিমের কাছে এটা গ্রহণীয় হলে চলে না। অপর দিকে, খেলোয়াড় যত দক্ষ ও অভিজ্ঞ হোন না কেন এবং তিনি যত দীর্ঘ অনুশীলন করুন না কেন, মাঠ যদি খেলার উপযোগী না হয়, মাঠে যদি গর্ত থাকে আর আগাছা। এর অবস্থা যদি হয় কাদায় ভরা কিংবা এবড়োথেবড়ো, তা হলে সেই খেলোয়াড়ের পক্ষে ভাল খেলা মোটেও সম্ভব নয়। তখন তিনি খেলায় প্রত্যাশিত বা স্বাভাবিক সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হবেন। তাদের টিমের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। ফুটবল খেলায় রেফারিরা খেলার আগে মাঠ পরিদর্শন করে দেখে নেয় ঠিক উপযুক্ত আছে কিনা এবং তারপরও ৯০ মিনিটের খেলায় ৪৫ মিনিট পর উভয় দলের খেলার মাঠ হাত লাগিয়ে পরীক্ষা করেন এবং আম্পায়ারগণ এলবিডবিøও বা রান ওয়াট ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক তুমুলে উঠলে সিসিটিভিতে অর্থাৎ অধিকতর বিতর্ক এড়াতে থার্ড (ঞযরৎফ) আম্পায়ারগণের দ্বারা বারবার ক্যামেরা দেখে সেই খেলোয়াড়কে আউট বা নট আউট ঘোষণা করেন। এসবই করা ন্যায়বিচার ও খেলার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য নির্বাচন একটি রাজনৈতিক খেলা এবং প্রতিদ্ব›িদ্বতামূলক এবং এক্ষেত্রেও প্রতিদ্ব›িদ্বতার মাঠ অবশ্যই হতে হবে সমতল ও বৈষম্যমুক্ত। অন্যথায় নির্বাচন হবে না গণতান্ত্রিক তথা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক এবং তাতে ভোটে জনরায়ের প্রতিফলন হবে না।
নির্বাচনের সময় কথামালার রাজনীতি লাগাম ছেড়ে যায়। ওয়াদার বন্যা আর প্রতিশ্রুতির প্লাবন প্রার্থীদের বেশির ভাগের যেন মজ্জাগত স্বভাবের বহিঃপ্রকাশ। এমন এক ভোটপাগল ধান্ধাবাজকে নিয়ে একটা চুটকি। ‘পবিত্র’ চরিত্রের অধিকারী এই প্রার্থী নির্বাচনী সমাবেশে বললেন, এলাকায় এইবার দিচ্ছি বিদ্যুতের খুঁটি। আগামীবার ভোট পাইলে বিদ্যুৎ। আমি এক জবানের মানুষ, এই ওয়াদার এদিক সেদিক অইবনা!!
এবার বাংলাদেশে প্রার্থীর ‘উৎপাদন’ যাকে বলে ‘বাম্পার’। সংসদ নির্বাচনে একেক আসনে ২০, ৩০, ৪০ এমনকি দক্ষিণবঙ্গের এক আসনেই ৫০-এর বেশি প্রার্থী মনোনয়নপত্র কিনেছেন। বলাবাহুল্য, এটা ঘটেছে ক্ষমতাসীন দলের বেলায়। এক দশক একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকায় এ দলে ‘নেতার’ যেমন অভাব নেই তেমনি নৌকা মার্কা মানেই ‘নির্বাচিত’ ধরে নিয়েছেন অনেকে। এ সুযোগে কেবল নমিনেশন পেপার বেচেই দলের আয় বেশ কয়েক কোটি টাকা। এ দিকে বিভিন্ন পেশা নির্বিশেষে হাজার হাজার নারী-পুরুষ নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। বলাই বাহুল্য, তাদের খুব কমই বসার সুযোগ পেয়েছেন। দুই বন্ধুর তোমারটা কই ? কিন্তু এই দোস্ত দিয়েছে মোক্ষম জবাব। তার সাফ কথা ! ‘আমি কিনি নাই’, সবাই ভোটে দাঁড়াইলে ভোটটা দিব কেডা’।
পাদটীকা : সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বহু প্রত্যাশিত সংলাপ হয়ে গেল। আর কিছু না হলেও সরকার ও বিরোধী পক্ষের মোলাকাত-মোসাফাহা, সাথে দামি ও মুখরোচক খানাপিনা তো হয়েছে। সংলাপ সম্বন্ধে একটি পত্রিকায় রম্য সাময়িকীর ভাস্যমাফিক (ক) সংলাপ হওয়া মানে বিসিএস পরীক্ষায় একটা প্রশ্ন যোগ হওয়া। তা হতে পারে এরকম। ‘বাংলাদেশে সর্বশেষ সংলাপ কবে, কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ? (খ) কিছু ভাত হজম হয় না। ইস্যু না থাকলে তাদের মহাবিপদ, তাই সংলাপ ইস্যু তাদের এই বিপদে সহায়। আগেই বলেছি নমিনেশন পেপার বিক্রি করে ক্ষমতাসীন দলের আয় সর্বোচ্চ ১৬ কোটি টাকা বিএনপি এবং জাপা এদিক দিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে। তাদেরও কোটি কোটি টাকা আয়। ডজনে ডজলে সেলিব্রিটি এবার মনোনয়নপত্র কিনেছেন। যাই বলুন, ভোটের মওসুমে মনোনয়ন চাই। যত টাকা লাগে, কেননা, এটি যে সোনার হরিণ।
এবার আর একটা চুটকি। প্রথম বন্ধু, ফেসবুকে বন্ধুদের মাঝে আমার যে একটা অবস্থা, চল যাই, নমিনেশন ফরম কিনেই ফেলি। দ্বিতীয় বন্ধু ; আরে ধুর তোর জন্য একটা স্পেশাল ফরম কিনতে হবে। প্রথম বন্ধু সেটা আবার কী ? দ্বিতীয় বন্ধু ; কেন ? ‘নো-মেনশন’ ফরম। (২) বাবা। তুই কি বেকারই থাকবি ? ছেলে : না বাবা, এখনই ব্যবসায়ে নামছি। বাবা, কিসের ব্যবসা, পুঁজি দেবে কে ? আমি তো দিচ্ছিনা। এই দেখো আমার ব্যবসা। (বাবাকে কাপ-পিরিচের সেট দেখাল)। বাবা, সামনে ইলেকশান, তাই আমার সিলেকশনে আছে চায়ের দোকান খোলা। পাড়ায়, মোড়ে মোড়ে এখন মুফতে চা খাওয়ানোর ধুম। প্রার্থীরাই টাকা দিচ্ছেন। এটিই বর্তমানে মোস্ট প্রফিট্যাবল বিজনেস (ব্যবসা)।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট