নিরাপত্তার জন্য সরকারি গানম্যান নিয়ে চলেন ২৬২ জন

24

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বর্তমানে সারাদেশে গানম্যান নিয়ে চলেন ২৬২ জন। সরকারি গানম্যান পাওয়ার তালিকায় আছেন সাংবিধানিক পদবিধারী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ের লোকজনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। কয়েক বছর ধরেই মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পাশাপাশি হুমকি দিয়ে আসছে জামা’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) ও আনসার আল ইসলামসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তাঁর স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমীন হকসহ অনেককেই এসএমএস ও বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল দুর্বৃত্ত ও জঙ্গিরা।
গত ৩ মার্চ (শনিবার) সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠানে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় ফয়জুর হাসান ওরফে ফয়জুল নামের এক তরুণ। পরে তার জঙ্গি সম্পৃক্ততারও কিছু প্রমাণ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এ হামলার পর আগে থেকে হুমকি পাওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নজরদারি বাড়িয়েছেন গোয়েন্দারা। এই বুদ্ধিজীবীরা চাইলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যানও নিতে পারবেন বলে পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। খবর বাংলা ট্রিবিউনের
গানম্যান ও বডিগার্ড প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সচিবরা পুলিশ প্রোটেকশন ও গানম্যান পেয়ে থাকেন। তবে তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকে পোশাকি বডিগার্ড। আর সাংবিধানিক পদবিধারীরা সাদা পোশাকে ‘গানম্যান’ পেয়ে থাকেন’।
বিশিষ্ট কোনো নাগরিক যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকি মনে করেন তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। সেক্ষেত্রে আবেদন পেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’ করা হয়। তদন্ত শেষে সার্বিক বিবেচনায় মন্ত্রণালয় সন্তুষ্ট হলে পোশাকি পুলিশের মাধ্যমে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। ব্যক্তির সামাজিক পদমর্যাদা বিবেচনা করে কারও ক্ষেত্রে সাদা পোশাকেও ‘সশস্ত্র গানম্যান’ পাঠিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। বর্তমানে সাদা পোশাকে ২৬২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্য গানম্যান রেখে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। এ সংখ্যা কখনও বাড়ে, কখনও কমে।

পুলিশ সদর দফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘কারও চাহিদা অনুযায়ী পুলিশ প্রোটেকশন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে গানম্যান রাখার নিয়ম নেই। তবে কেউ যদি আবেদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে বোঝাতে পারেন যে, তার গানম্যান প্রয়োজন তাহলে সরকারিভাবেই তা দেওয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীকে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। আর ওই আগ্নেয়াস্ত্র পরিচালনা বা বহন করা ব্যক্তিদেরও অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে। তখন ধণাঢ্য ব্যক্তিরা নিজের খরচে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেন’।
গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর সরকারি গানম্যান দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত সংসদ সদস্যদের (এমপি) গানম্যান দেওয়ার বিধান নেই। তবে তিনি যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারেন, তাহলে তাকেও সরকারি গানম্যান দেওয়া হবে। অনেক এমপি অবশ্য নিজ উদ্যোগে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বেসরকারিভাবে গানম্যান রেখে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন’।
ওই কর্মকর্তা আরও বললেন, ‘নিরাপত্তার জন্য সাদা পোশাকে গানম্যান দেওয়া হয়। আবার প্রোটেকশন বিভাগ থেকে পোশাকি পুলিশের মাধ্যমেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তার জন্য যাদের পাঠানো হয় তারা কনস্টেবল থেকে সাব ইন্সপেক্টর (এসআই) পদমর্যাদার। তাদের আগ্নেয়াস্ত্রও পুলিশ বাহিনী থেকে দেওয়া হয়। গানম্যানদের জন্য থাকে আলাদাভাবে ৩০ দিনের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা’।
শুধু আবেদন নয়, কারও নিরাপত্তা দেওয়া জরুরি মনে করলে সরকারই এই উদ্যোগ নেয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান। তার ভাষ্য, ‘সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পুলিশ প্রোটেকশন দেওয়া হয়। আর কেউ নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও বিধি অনুযায়ী সেই ব্যবস্থা করা হয়’।
গানম্যান দেওয়া-নেওয়ার প্রক্রিয়া জানালেন পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ শাখার এআইজি সহেলী ফেরদৌস। তিনি বলেছেন, ‘প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির থ্রেট অ্যাসেস করা হয়। অর্থাৎ তিনি কোন ক্যাটাগরির ব্যক্তি। তার সোশ্যাল ও ইকোনমিসহ আনুষঙ্গিক স্ট্যাটাস দেখা হয়। তারপর ফিন্যান্সিয়াল কোনও কারণে যদি হয়ে থাকে তাহলে ওই ব্যক্তি কত টাকা ট্যাক্স দিয়ে থাকেন তা দেখা হয়ে থাকে। তারপর দেশের ভাবমূর্তিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ প্রোটেকশন কিংবা গানম্যান দেওয়ার সুপারিশ করা হয়’।