নিরঙ্কুশ বিজয় বিজেপি জোটের ভারতের মসনদ আবারো মোদির

21

বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বুদ্ধদের সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। ফলে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন। যত আলোচনা-সমালোচনাই হোকনা কেন ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই ভারতীয় জনগণের সুস্পষ্ট রায়ের প্রতিফলন ঘটেছে এ নির্বাচনে। বুথ ফেরত জরিপে বিজেপি জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের যে আবাশ পাওয়া গিয়েছিল বস্তুত নির্বাচনী ফল তার চেয়েও বেশি আসনে বিজয় লাভ করেছে বিজেপি। অভিনন্দন বিজেপিসহ এনডিএ জোটকে। অভিনন্দন মুদিজি। ভারতের এবারের নির্বাচনে লক্ষ্য করার বিষয় যে, নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীন বিজেপি মিডিয়া ও কর্পোরেট হাউসগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল, যা সাধারণ জনগণকে প্রভাবিত করেছে। সর্বশেষ নির্বাচনে জনগণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটেছে ।
লক্ষ্য করার বিষয় যে, কয়েক মাস আগে দেশটির কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস। তাই ধারণা করা হয়েছিল, এবার লোকসভা নির্বাচনে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে দলটি। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু ঘটেনি। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএ ২০১৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার বেশি আসন পেলেও এনডিএ জোটের সঙ্গে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি। নির্বাচনে ভারতজুড়ে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের উত্থান লক্ষণীয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে মমতার রাজ্যে বিজেপির ঝড়ো হাওয়ায় সব তছনছ হতে বসেছে। এখানে ৪২টি আসনের ১৮টিই বিজেপি দখলে নিয়েছে। ২২টি মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের আর ২টিতে জিতেছে কংগ্রেস। অবাক হওয়ার বিষয় রাজ্যটিতে তিনদশকেরও অধিক সময় ক্ষমতার স্বাদ নেয়া বামদল ও তাদের জোট কোন আসনই ধরে রাখতে পারে নি। এ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গে বামদলের অস্তিত্বের সংকটের পাশাপাশি ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিতে দেশটির ভেতরে-বাইরে বড় একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে হাজার বছর ধরে যে বহু মত, পথ, ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে ভারত রাষ্ট্রটি দাঁড়িয়ে আছে-এ অবস্থায় হিন্দুত্ববাদীর পুনরুত্থানে দেশটিতে সেই বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে ? আমরা আশা করব, ভারত তার মূলনীতি থেকে সরে আসবে না। অবশ্যই বিজেপি বা মোদি নির্বাচনী প্রচারণায় যাই বলুক বিগত শাসনামলে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত ছিল। এবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে আরো জোরালোভাবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। বর্তমান বিশ্বে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ রেখে শুধু নিজ দেশের জনপ্রিয়তা দিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। বিজেপির শাসনামলে এ সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। সুতরাং উভয়দেশে সাম্প্রদায়িকতা প্রসূত কোনো ঘটনা ঘটলে দুই দেশে তার প্রতিক্রিয়া হয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের অবস্থান হওয়ায় দেশটির সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল সীমান্ত এলাকা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত প্রায় সব নদীর উৎস ভারতে। এ বিষয়গুলো সরাসরি দু’দেশের সম্পর্ক নির্ধারণ করে। এর বাইরেও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা বিষয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে প্রভাবিত করে থাকে।
আমরা জানি, মোদি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে। তবে কাক্সিক্ষত তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। হয়নি সীমান্তে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা। আমরা স্বভাবতই প্রত্যাশা করব, নরেন্দ্র মোদির এবারের শাসনামলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। ভারতের শাসনক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। ভারতের কোনো বিশেষ দল নয়, ভারত রাষ্ট্র তথা জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় এ দেশের মানুষ। অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানের মাধ্যমে সেটা সম্ভব হতে পারে। নরেন্দ্র মোদির নতুন মেয়াদেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক আরো উষ্ণতা পাবে-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।