নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের কঠিন আর্থিক দুরবস্তা থেকে বাঁচাতে বিত্তশালিরা এগিয়ে আসুন

8

কাজি রশিদ উদ্দিন

আজ ৮ নভেম্বর, রবিবার চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ও বহুল প্রচালিত দৈনিক আজাদীতে শেষ পৃষ্ঠায় প্রথম কলামে প্রকাশিত একটি খবরের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমেই বলে রাখা ভালো খবরটি পত্রিকার কোনও ডেস্ক বা নিজস্ব প্রতিবেদন নয়। খবরটি বিদেশি নিউজ এজেন্সির থেকে নেওয়া এবং আমি সেটি দাড়ি, কমা, সেমিকোলন সহ হুবহু নিম্নে তুলে ধরছি। প্রকাশিত খবরটির শিরোনাম সহ বিস্তারিত এভাবে শুরু। ‘কোট- শিরোনাম’ ‘বিয়ে না করেও একসঙ্গে থাকা যাবে আমিরাতে- মদও পান করতে পারবে।’ এবার খবরের বিস্তারিত। অবিবাহিত নারী-পুরুষ চাইলে একসঙ্গে থাকতে পারবে। এমনকি তারা অ্যালকোহলও (মদ) পান করতে পারবে। রক্ষনশীলতা থেকে বেরিয়ে এমন ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ডব্লিউএএম নিউজ এজেন্সি ও সংবাদপত্র দ্য ন্যাশনাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবর বাংলানিউজের।
মুসলিম দেশ বলে পরিচিত দেশটি তাদের ইসলামি আইনকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানানো হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমারেখা বর্ধিত করার জন্য ইসলামি আইনে শিথিলতা আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের অন্যতম জায়গা সংযুক্ত আরব আমিরাত। অবকাশ যাপনের জন্য সারা বিশ্বের লোকজন এখানে আসে। কিন্তু পর্যটকদের জন্য অ্যালকোহল পান ও অবকাশ যাপনের যাবতীয় আয়োজনের ব্যবস্থা থাকলেও দেশটির নাগরিকদের এসবের মধ্যে জড়িয়ে যাওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পরই এমন ঘোষণা এলো। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরাইলি বিনিয়োগ ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্যই দেশটি এমন উদ্যোগ নিচ্ছে। অ্যালকোহল পান করা, সংগ্রহ করা কিংবা বাজারজাত করার অপরাধে ২২ বছর বা তারও বেশি শাস্তির বিধানটি এখন পরিবর্তন হবে। এর আগে লাইসেন্সের মাধ্যমে অ্যালকোহল পানের অনুমতি ছিল। কিন্তু নতুন আইনে এ ধরনের কোন বিধিনিষেধ থাকছে না। সুত্র ডবিøউএএম নিউজ এজেন্সি, দ্যা ন্যাশনাল, ইকোনমিকস টাইমস’। আজাদীর খবরটি এখানেই শেষ। এই খবরটি প্রকাশ করার জন্য আমি দৈনিক আজাদীকে সাধুবাদ, ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাতে চাই। আমার মনে হয় এটি একটি ঊীপষঁংরাব রঃবস. কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এখানকার কোনও ইসলামি সংগঠন বা বিশিস্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব এখন পর্যন্ত এ সম্বন্ধে কোনও প্রতিবাদ করতে দেখা গেলো না। অথচ পশ্চিমা বিশ্বে রসুলুল্লা (সা.) সম্বন্ধে কট‚ক্তি করলে তাহারা প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়ে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে সংযুক্তি আরব আমিরাত একটি ইসলামি বা মুসলমানদের দেশ হয়েও ইসলামের পবিত্র কোরআন হাদিসের মুলমন্ত্র থেকে প্রকাশ্যে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিল।
যাক এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে দৈনিক পূর্বদেশের ১৫ নভেম্বরের হেডলাইন ‘বাজারে অসহায় অবস্থা সাধারণ মানুষের’ এ সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে চাই। আয় না বাড়লেও বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কোটি কোটি মানুষের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে হু হু করে। আগে থেকেই তাদের আয় সীমিত ও স্বল্প। দিনে এনে দিনে খাওয়া লোক যেমন অসংখ্য। তেমনি প্রতিনিয়ত গুণে গুণে দেখে শুনে কষ্ট করে খরচ করতে হয় অজস্র মানুষকে।
প্রধানত করোনা মহামারী জনিত কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সংসারের অপরিহার্য দৈনন্দিন খরচ মেটাতে বহু কষ্টের সঞ্চয়ের অর্থ ব্যয়ে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। এমনকি অনেক দিন মজুরসহ সাধারণ মানুষ চড়া সুদের ফাদে জড়িয়ে পড়ছেন। তা থেকে মুক্তির উপায় কী কিংবা কত দিনে সম্ভব, কেউ জানেনা।
একটি সহযোগী দৈনিকের সাম্প্রতিক একটি প্রধান প্রতিবেদনে প্রসঙ্গক্রমে আরো বলা হয়েছে, মহামারীর ভীতি অনেকাংশে হ্রাস পেলেও দেশবাসীর মনে ভর করেছে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির আতংক। শীতের প্রাক্কালে এ সময়ে অতীতে কোনো সময়ে আলু-সবজি পেঁয়াজের দাম এতটা বাড়েনি। চাল-ডাল-তেল-মাছ গোশতের দামও অব্যাহত গতিতে বেড়েই চলেছে। কিন্তু দেশের মানুষের আয় বাড়েনি। বরং তা কমে গেছে গত কয়েক মাসে। তাই কোনোক্রমে ‘দিনযাপন’ আর প্রাণ ধারনের গøানি বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এমনিতেই কোভিড-১৯ সংক্রমনে আয়-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিপনি ও বিপণীতে মারাত্মক অচলাবস্থা। অনেকে কাজ হারিয়ে দিশে হারা। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ক্রমান্বয়ে উর্ধ্বগতির সাথে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষত রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে খরচ বাড়ছেÑ প্রতিদিন। গতবার পেঁয়াজের দামে ‘আগুন লেগেছিল’। মাঝ খানে এটা কিছু কমে আবার বাজার খুব উপরে উঠেছে, যাতে ‘হাত দেয়া’ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অসাধ্য। শাকসবজি, মাছ ও আলুসহ কাঁচাবাজারের পণ্য দামের দিক দিয়ে রেকর্ড গড়েছে।
সহযোগী দৈনিক পত্রিকায় বলা হয়েছে, বস্তিবাসী, গ্রামের গরিব মানুষ কিংবা শহরের দিনমজুর ও রিকশা শ্রমিকরা অনেক সময় ডাল-আলু ভর্তা, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ভাত খেতে পারতেন; কিন্তু গত ছ’-মাসে সেটিও তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে অগ্নিমূল্যের দরুণ। তারা রুজির উপায় হারিয়ে ধারকর্জ করে বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, পরিজন নিয়ে তাদের করতে হচ্ছে মানবেতর জীবন যাপন। অবশ্য সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কতজনের জন্য আর কিভাবে সম্ভব। অনেকে বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের বাজেট আরো ছোট করে আনছেন। ফলে জীবন ও সংসার কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে গেলেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের বিরতিহীন উর্ধ্বগতি তো আছেই। এর সাথে প্রধানত করোনা মহামারীজনিত চিকিৎসায় ব্যয় করতে হচ্ছে অনেক।
এ অবস্থায় চোখে-মুখে আঁধার নেমেছে সীমিত আয়ের অসংখ্য মানুষের। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে তারা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো থেকে গ্রামের আরো অনিশ্চিত জীবনে প্রত্যাবর্তন করছেন। দিনমজুর সমেত নিম্নবিত্ত বহুলোক মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে চক্রবৃদ্ধিহারে ঋণ নিয়ে আর শোধ করতে পারছেন না। কারণ তাদের রোজগার কমে গেছে। এই করোনাকালে, এমনকি মহামারী অনেকের আয়ের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তারা হাত পাততে পারছেন না অন্যের কাছে। এ ক্ষেত্রে তাদের আত্মসম্মান বোধ ছাড়াও বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সবার জীবিকার্জনের। ফলে অনেকে সঞ্চয়ের যৎসামান্য অর্থও ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। তারা জানেন না এই শেষ সম্ভলও শেষ হয়ে গেছে কিভাবে আর কেমন করে সংসার চালাবেন।
বিদ্যমান আয় বৈষম্য ও সামাজিক শোসনরোধসহ পর্যাপ্ত প্রণোদোনা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব সরকারের হলেও পাকিস্তান আমলের ২২ বিত্তশালী পরিবারের চেয়ে বর্তমানে হাজার হাজার বিত্তশালী পরিবারকে এই দুঃস্থ ও ভুক্তভোগীদের সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত। এটিই সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট