নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে

239

জীবজগতের প্রতিটি জীব তথা প্রাণীকেই খেয়েপরে জীবনধারণ করতে হয়। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা মোটামুটি ৫ ভাগে ভাগ করিয়ে দেখিয়েছেন পÐিত মানুষরা। আর এ চাহিদাগুলো পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যই হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের দিকে একটু সচেতন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই দেখা যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের কী রকম ঊর্ধ্বগতি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করছে দ্রব্যের মূল্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এ দ্রব্যের এ মূল্যবৃদ্ধি। কারণ খুব সহজ, ব্যবসায়ী শ্রেণির মুনাফালোভী মনোভাবকেই দায়ী করা যায়। মজুদদারা দ্রব্য গুদামজাত করে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে। তাদের ধারণা, যেহেতু দ্রব্যটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম সেহেতু যেকোনো উপায়ে দ্রব্যটি তারা ক্রয় করতে বাধ্য। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ একসময় বিভিন্ন কারণে বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি লাভ করেছিল। কিন্তু সেদিনের সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলায় ভরপুর বাংলাদেশ আজ শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ মানুষের ভেতরেই অসৎ উপায়ে স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা বর্তমানে অধিক হারে দেখা যাচ্ছে। সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়ানো যে গ্রাম-বাংলা সোনালি রোদ্দুরের হাসিতে মুখর হয়ে থাকত, সেসব এখন গ্রাম-গঞ্জের নর-নারীকে যথারীতি আনন্দ দান করতে পারছে না। মানুষের ওপর চেপে বসেছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ঘোটক।
সম্প্রতি পিঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্য টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। রান্নার এই উপকরণ পিঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে দেশের প্রত্যেকটা নাগরিকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও এই পিঁয়াজ মজুদকারী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বিশ্বের কয়েকটি দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এমনকি বিমানে করেও পিঁয়াজ এসেছে এই দেশে। ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। অতিরিক্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জন্যই সাধারণ মানুষকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নাভিশ্বাস উঠে যায়। যদিও সরকারিভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়, তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা যথাযথভাবে মানা হয় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। বাজারে সঙ্কট না থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা এ অপকর্ম অব্যাহতভাবে করে চলেছে। এমনিতে নির্ধারিত মূল্যে জিনিসপত্র কেনাটাই অনেকের জন্য কষ্টকর। তার ওপর যখন অধিক মুনাফার লোভে বিক্রেতারা বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেন তখন তা ক্রেতা সাধারণের জন্য অসহনীয় হয়ে পড়ে।
সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার চেষ্টা চালালেও কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জন্য তা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজনের গাফিলতির কথা শোনা যায়। আবার নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবের কথাও জানা যায়। ফলে দায়ী ব্যবসায়ীরা যেমন পার পেয়ে যান, তেমনি আবার একই ধরনের অপকর্মে যুক্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবের সময় এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার জন্য মরিয়া হয়ে যান। তাদের কাছে ধর্মীয় নির্দেশনা বা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যেন অসহায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগ একটু দূরদর্শী ও সতর্ক হলে অসাধু ব্যবসায়ীদের এ সকল অপকর্ম থেকে জনগণ রক্ষা পেতে পারে। আর বিক্রেতারা যদি ক্রেতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতেন তাহলে হয়ত লাগামহীনভাবে মূল্যবৃদ্ধি করতেন না। দাম বৃদ্ধির এই হার স্থানভেদে পার্থক্য থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু দ্রব্যের মূল্য সবক্ষেত্রে একই হারে বেড়ে থাকে। ক্রেতা সাধারণের তখন অধিক মূল্যে পণ্য কেনা ছাড়া কোন পথ থাকে না। অবশ্য টিসিবি কয়েকটি পণ্য স্বল্পমূল্যে ভোক্তা সাধারণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুসারে ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে। কখনও কখনও বাজারে সঙ্কট সৃষ্টি হলে প্রতিষ্ঠানটি পণ্য আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করে। তবে টিসিবির পণ্য বাজারে আসার পূর্বেই মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা তাদের কাজটি সেরে ফেলেন। ফলে জনগণ এর সুফল ভোগ করতে পারে না। ব্যবসায়ীদের হাতে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পেছনে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দুর্বলতাকেও অনেকে দায়ী করেন। আমরাও মনে করি, টিসিবি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। হাতেগোনা কিছু পণ্য মাঝেমধ্যে তারা খোলাবাজারে বিক্রি করে, যা বিদ্যমান বিশাল বাজারব্যবস্থায় কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না। টিসিবির দুর্বলতার জন্য নিজস্ব তহবিলের অভাবের সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেও দায়ী করা হয়।
সরকার কেন টিসিবিকে সবল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে না? বিষয়টি যেন সবারই জানা। এ দেশে রাজনীতিক আর আমলারা শুধু তাদের নিজ নিজ পেশায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতে পারেননি, তারা তাদের পেশার পাশাপাশি বাণিজ্যেও জড়িয়েছেন প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষে। তবে ঢালাওভাবে সবাই নয়। আর এই একটি কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, একই সঙ্গে রক্ষক ও ভক্ষকের ভূমিকায় থাকলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এ ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি বাড়ছে বাসাভাড়া, পরিবহন-ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতের ব্যয়। সরকারি-বেসরকারি সেবার দামও বাড়ছে। সেই অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে জীবনযাত্রার মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৯ কোটি ১০ লাখই অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির। বাজার অস্থিতিশীল হওয়া মানেই দেশের বেশির ভাগ মানুষের ওপর চাপ পড়া। তাই সরকারকে বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, কর্মসংস্থানও বাড়াতে হবে। তখন উৎপাদন বাড়বে, বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা। আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির আঘাতও হয় সহনীয়। তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার বেশির ভাগ এখানে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বাস করে। বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচ্য বিষয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। কালোবাজারি, মুনাফাখোর, মজুদদার প্রভৃতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য দ্রব্যগুলোর মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন এবং ক্রমে এসব পণ্য সংগ্রহ করা কঠিনতর হচ্ছে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। মানুষের একটু ভালোভাবে বাঁচার দাবি আজ সর্বত্র। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের প্রতিক‚লে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাকে অতিক্রম করে অশ্বগতিতে বেড়ে চলছে ব্যয়ের খাত। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর।
সরকারকে কঠোর হাতে অতিলোভী অসাধু এসব ব্যবসায়ীকে দমন করতে হবে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যতালিকা টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাজারে দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে দেশের সাধারণ মানুষের আরও একটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা প্রদানে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মুনাফালোভী, কালোবাজারি ব্যবসায়ী শ্রেণি, ঘুষখোর কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে হবে। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে। তাহলেই দ্রব্যের মূল্য হ্রাস পাবে। জনমনে হতাশা, ক্ষোভ দূর হয়ে শান্তি ফিরিয়ে আসবে। বাজারে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে জনমানসের চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করতে হবে। আর সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। নিশ্চিত করা হবে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার নিরাপত্তা।
লেখক : প্রাবন্ধিক