নাসের রহমানের নির্বাচিত গল্প

সত্যেন কুমার সেন

99

মননশীল সাহিত্যকর্মে ছোট ছোট গল্প ডানা মেলে মানুষকে হারায় নিজস্ব ভাবনার জগতে। একেকটি গল্প হয়ে উঠে অনুগল্পের মিশেলে প্রানবন্ত ও জীবন ঘনিষ্ঠ। প্রকৃতি নির্ভর সামাজিক ইতিহাস আর সামাজিক সচেতনতার আবহে জাগ্রত হয়ে উঠে পাঠককূলের অন্তরাতœা। নির্বাচিত গল্পসমূহের লেখক সেই ঘরানার সাহিত্যিক। যিনি নিজস্ব দর্শনবোধে আর অব্যক্ত ব্যঞ্জনার শিহরণে সিক্ত করে গল্পকে নান্দনিক ঢং এ উপস্থাপনার মুন্সিয়ানায় পাঠক প্রিয়তা লাভ করেছেন ইতিমধ্যে। সামাজিক গল্পকে ভাষার ছন্দোবদ্ধ মলাটে আবদ্ধ করে পাঠকের প্রত্যাশার আল্পনায় কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাওয়া, চঞ্চল শিশুমনের অধরা ব্যঞ্জনার অনুরণন,পরিশালিত জ্ঞানের ভান্ডারে পরিমাপহীন বাস্তব সম্ভাবনার উঁকিঝুকি,বিস্তৃত সাহিত্যের সুসংবদ্ধ কাঠামো বিণ্যাসে রচিত অনবদ্য সাহিত্যকর্মের রচয়িতা হিসেবে পাঠককূলে পরিচিত একটি নাম নাসের রহমান। ছোটগল্পের আদর্শকে আপন ভাবনার পরিষ্ফুটনে নিজস্ব লেখনীধারায়,স্বতন্ত্র আবেদনে ভিন্ন স্বাদের মাত্রায় উপস্থাপিত গল্পের চরিত্রসমূহকে পাঠকের সামনে তিনি নিয়ে এসেছেন কখনোবা গ্রামের পটভূমিতে কখনোবা শহুরে যান্ত্রিকতায়। জীবনবাঁকে সুখ-দুঃখের টানাপোড়েন,সামাজিক ইতিহাস,সংগ্রামের ইতিকথা সহ হাসিকান্না, প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে ফেরা,শিশুমনের নানান প্রচ্ছন্ন ভাবনারাশি,প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে বিভোরতা,মানবমনের প্রেমের শিহরন সব কিছুর ছোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে লেখকের পাঠকেরা। মননশীলতার চাদরে ঢাকা উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির মত বিকশিত বাংলা ছোটগল্পের শব্দভান্ডারে লুকায়িত চিরায়ত ধ্যানধারনার বাইরে এসে গল্পকারের প্রকাশিত বইসমূহ সাহিত্যের বিশাল সাগরে ফল্গুধারার বহমানতার ঢেউ নিয়ে উচ্ছলে পড়েছে,নাসের রহমানের এক নতুনধারার সৃজিত অনুগল্পের বর্ণনাকৌশলে। নির্বাচিত গল্প সমূহ লেখকের বিভিন্ন সময়ের আপন অভিজ্ঞতা আর ভাবনার প্রয়াসে আবদ্ধ একগুচ্ছ গল্পের সমাহার যা নন্দিত এবং অনুভূতিতে অনুপম ছোঁয়াময়।
প্রারম্ভিক গল্পে ভাষা শহীদদের বিনম্র শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পনের গল্প “ছড়াও ফুলের বন্যা” যেখানে পলাশ একুশের প্রহরে পুষ্পস্তবক নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনে শহীদ মিনারে যায়। শিউলীকে সাথে নিয়ে পলাশ নানান কৌতুহলী প্রশ্ন করে। সে জানে একুশের চেতনা অনেকের মনের গহীনে সুপ্ত অবস্থায় আছে,সে চেতনাকে জাগাতে হবে। অনেক শিশু ভোর থেকে খালি পায়ে ফুল হাতে শহীদ মিনারে আসে। বইমেলায় ঘুরাঘুরি করে। বেশিরভাগই এমনি ঘুরতে আসে। পলাশের চেতনা আর বোধের কাছে শিউলির ভাবনা চিন্তা মিলে না। অথচ জনৈক ব্যক্তির সাথে আগত ছোট্ট মেয়ে শিশুটি কৌতুহলী হয়ে জানতে চাই,‘ফুল দিয়ে কি করবে?’ লেখক প্রকৃতপক্ষে একুশের চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চেয়েছেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে,বিনম্র শ্রদ্ধা সহকারে।
স্বর্গীয় আনন্দ অভিজ্ঞতার ছোঁয়া “এ কি সোনার আলো” গল্পের প্রথমবার মাতা পিতা হওয়ার। গল্পের চরিত্র আফসান আর সোমা প্রথম সন্তানের জন্মের দেড় বছর পর যখন দ্বিতীয় বাচ্চা সোমা ধারন করে তখনি নানা রকম বিপত্তির উদয় হয়। যার সবটাই তাদের পারিপার্শ্বিক নানান জটিলতার কারনে সৃষ্টি। সোমার মা যখন সোমার কষ্টের কথা ভেবে এম.আর করানোর প্রস্তাব দেয়,তখনি সোমার বাবা বলে উঠেন,“মানুষ মানুষ তৈরী করতে পারে না। যে আসতে চায় তাকে আসতে দেয়া উচিত। একটা সন্তানের জন্য মানুষ কত চেষ্টা করে তারপরও পায় না।” নাসের রহমান খুব সুন্দরভাবে চরিত্রগুলোর মাঝে কথপোকথনের মাধ্যমে সবাইকে কতগুলো বোধের দিকে নিয়েছেন। যার মমার্থ অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ন। বাবা আবারো বলেন,“মনে রেখো,জন্মের পর একেক সন্তান একেক রকম আনন্দ দেয়। মা সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়ে সন্তানের চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু নেই বলে মনে করে।” অসাধারন কিছু উক্তি বাবা বলেন যার প্রেক্ষাপটে আফসান আর সোমার মনের সব আশংকা দূরীভূত হয়ে যায়। গল্পে লেখক মেয়েদের স্বাধীনতার ব্যাপারে কথা বলেছেন। সোমার ধারনায় মেয়েদের উপর পুরুষদের কর্তৃত্ব কিছুটা কমানো উচিত,তাতে প্রকৃতি যেভাবে তাদের গড়েছে তার বাইরে খানিকটা হলেও তারা আসতে পারবে। গল্পে সোমা আর আফসানের কথোপকথনে অনেকগুলো বাস্তব বিষয় ফুঠে উঠেছে। সময় এভাবে কেটে যেতে থাকে। ডাক্তারী নানান পরীক্ষা,নিয়মিত চেকআপ,সোমাকে সঙ্গ দেয়া সবকিছু নিয়ে সময় কাংখিত দিনে উপনীত হয়। ওয়েটিং রুমে আফসান অপেক্ষা করতে থাকে। আফসানের আর তর সয়ছে না। সে অস্থিরতায় ভোগে। হঠাৎ আয়া এসে বলে,ওনার একটি ছেলে হয়েছে। মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসে। লেবার রুমে আফসান তড়িঘড়ি করে ঢুকে পড়ে। আফসান আত্নজকে কোলে নিয়ে বিস্ময়ভরা নয়নে পিতৃত্বের স্বাদ নেয়। অসাধারন অনুভূতির গল্প ‘এ কি সোনার আলো’। খুব সাবলীল আর অনাবিল ভাষায় লেখক গল্পকে বর্ননা করেছেন,যেখানে স্বাভাবিকভাবে মানব সন্তানের জন্মের বিষয়টি উঠে এসেছে।
গল্পের নাম বিশ্লেষনে নাসের রহমান বরাবরই রুচিশীলতার পরিচয় দেন। ‘জলময় পদ্ম’ গল্পে প্রকৃতির বর্ননা এসেছে কাব্যিক ঢং এ।
পুকুরপাড়,দীঘির জল,হরেক রকম ফুলের সমারোহ, কালাপাহাড় আর গভীর জঙ্গল মিলে
মিশে প্রকৃতির মাঝে এক বন্যতার রুপ দিয়েছে। আর সামাং নামের ছোট্টবালকটি প্রতিদিন মিথিলার জন্য নানা রকম ফুল আর ফল নিয়ে আসতো গভীর অরণ্যের ভেতর থেকে। সামাং এর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মিথিলার কোমল মনকে আহত করে। সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। দীঘির শান্তজলে আচমকা সামাং এর অশরীরী উপস্থিতি সে টের পাই। সামাং এর হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে মিথিলার সামনে। সে বুঝতে পারে,দূর কালাপাহাড় আর সমুদ্রের মাঝে সামাং হারিয়ে গেছে,মিথিলার পছন্দের ফুলটি আনতে গিয়ে। নির্বাক দৃষ্টিতে অস্পষ্ট হয়ে উঠে মিথিলার দুটি চোখ। লেখকের অনুভুতি আর মিথিলার কষ্টের রেখা যেন পাঠককে দূর গগনের নীলাভ নিঃসীমতায় হারিয়ে নিয়ে যায়।
বিষন্নতার গল্প ‘স্বপ্নের দহন’। প্রেম এখানে আবারো অধরা হয়ে দুটি মনের গহীনে একরাশ হতাশা আর ধূসর আবেগের জন্ম দিয়েছে। শান্তা ও রকীবের প্রেম এখানে বৈষয়িকতার চাওয়া পাওয়ার ভীড়ে হারিয়ে গেছে। যে সন্ধ্যা প্রদীপ তাদের জীবনে আলোর ধারা বয়ে দিয়েছিল,স্বপ্ন দেখিয়েছিল ঘর বাঁধার তা যেন হঠাৎ করে দূর আকাশে হারিয়ে গেল। সকল স্বপ্ন ভেঙ্গে,হৃদয়ে ক্ষরন ঘটিয়ে। শান্তার জমাট বাধা কষ্টের পাহাড় যখন ক্রমাগত ভারী হতে লাগলো,সে আপ্রান চেষ্টায় যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চেষ্টা করছিলো,ঠিক সে সময় অতীত ভুলে যাওয়া রকীবের একটি ফোনে শান্তা নির্বাক হয়ে যায়। রকীবের কন্ঠে,আমি এখনও তোমাকে ভালবাসি-এই সুরের ধারা যখনি শান্তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো,সবকিছু যেন আবারো আঁধারে ডুবে গেল। সীমাহীন এক কষ্টের ভয়ংকর সব নিঃস্তব্ধতা তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো। গল্প এখানে শেষ হলো না। কারন পাঠককে বার বার মনে করিয়ে দেয়,কষ্টের গল্প কেন মানুষকে নিয়ে,সুখের পদ্যে কি জীবনে রচনা হয় না?
একজন সাহসী নারীর গল্প ‘পক্ষপাত’। এ সমাজে নারী কখনো মায়ের ভূমিকায়,কখনো সে সংসারের আয় উপার্জনকারী,কখনো সে ব্যস্ত সংসারকাজে। নানান রকমের কাজের মধ্যে দিয়ে সংসার নারীর কাছে দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু নারী মনের কোমলতা আর সন্তানের প্রতি আকুল-ব্যকুলতা তাঁকে পিছিয়ে আনতে চাই,সবকিছু থেকে। গল্পে সাথী নামের মেয়েটি একজন চাকুরীজীবি। সন্তানকে শ্বাশুড়ির কাছে রেখে প্রতিদিন সে অফিসে যায় কিন্তু তার মন পড়ে থাকে সন্তানের প্রতি। কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতার জন্য চাকুরী করতে হচ্ছে। সাথীর হাজবেন্ড সাকিবও চাকুরীজীবি। কিন্তু সন্তানে যতœআত্তির প্রশ্নে আর ক্রমাগত চাকুরী করার কারনে শ্বাশুড়ির নিয়মিত বকাঝকায়,একসময় সে সিদ্ধান্ত চাই,সাকিবের কাছে। চাকরী করবে নাকি ছাড়বে? কিন্তু সাকিবের কাছ থেকে চাকুরী করার ব্যাপারে কোনরুপ সায় না পেয়ে,সাথী নিশ্চুপ হয়ে যায়। সাথীর উদ্যোমতা,সবকিছুকে জয় করে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার বাসনা,আর্থিক সচ্ছলতা সব কিছু কেমন যেন ফিকে হয়ে যায় সন্তানের প্রতি ভালবাসার কারনে। সে বুঝতে পারে,সবটা সব সময় পাওয়া যায় না। এই দুধের শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা,মায়ের পরম মমতা,আদর যত্ন থেকে তাকে বঞ্চিত না করায় তার জীবনের পরম ব্রত। এখানে আর সবকিছু তুচ্ছ। প্রচ্ছন্ন এক দর্শনের শিক্ষা আছে এ গল্পের মধ্যে।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কখনো হার মানে না,তাঁরা হার মানতে শিখে নাই। রনাঙ্গনে শত্রু সাথে মুখোমুখি লড়াই করে স্বাধীন দেশের জয়সূর্য ছিনিয়ে আনা মুক্তিযোদ্ধার মানসিক দৃঢ়তা ফুটে উঠেছে ‘প্রতিপক্ষ’ গল্পে। ভিন্ন রকমের এক পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে গল্পকার এখানে গল্পের বিন্যাস ঘটিয়েছেন। অফিসের বড় সাহেব আর রিপনের সম্পর্কের মাঝে রনাঙ্গনের সেই দামামার মত বাজনার বজ্রসুরের একাত্তর ছিল,তা একেবারে গল্পের শেষে পাঠকের কাছে প্রকাশ পায়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী আজ অফিসের বড় সাহেব। পরাজিত শক্তির ধারক সেই বড় সাহেব একাত্তর পরবর্তী সময়ে শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার পালাবদলের হাওয়ায় সুবিধাভোগী। আজ তারা সমাজের উঁচু স্তরে বসবাস করে। সমাজের ভাল মন্দের বিচার বিশ্লেষন করে তারা আজকে। অথচ নিগৃহীত,বঞ্চিত সেইসব মুক্তিযোদ্ধারা যারা এদেশকে হানাদার মুক্ত করে,বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে ধরেছে বাংলাদেশের নাম,তাদেরই একজন এই রিপনের উত্তেজিত কণ্ঠে শাসানো উচ্চারন‘আপনার মনে রাখা উচিত আমি একাত্তরে রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছি। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কখনো একজন ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধার করুণা চাইতে পারে না”্। লেখক এই গল্পে বিনীত শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পন করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সূর্য সন্তানদের প্রতি আর স্বপ্ন দেখছেন বাংলার মাটিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সেই সব কুখ্যাত মিথ্যা পরিচয়ধারীদের সর্বনাশ। ক্লান্ত পথিক গল্পে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা পাই।
“আনন্দ মেঘ” “ছায়াবিথী তলে” আর “বিদীর্ণ সৈকত” গল্পের বিষয়বস্তু পূর্বের গল্পের ভালো লাগার ধারাবাহিকতা। প্রেম এই অনুগল্পসমূহের সবটা জুড়ে। এখানে অনেকবছর পর সৈকত আর সীমার হঠাৎ দেখা বাচ্চাদের স্কুলে। ঠিক একিভাবে বুলবুল আর ইয়াসমীনের হঠাৎ দেখা সাক্ষাৎ। ‘আনন্দ মেঘ’ গল্পে জাতীয় সংগীতের সেই সুর‘আমার প্রানে বাজায় বাঁশি’যেন দুজনের হৃদয়ের আবেগকে উদ্বেলিত করে তোলে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নদিনের কাননে। নানা রকমের আলাপচারিতায় দুজনে মেতে উঠে। সময় বয়ে যায়। বুলবুল আর ইয়াসমীনের গল্পও চলতে থাকে। নাসের রহমানের গল্পগুলো ছোট ছোট কিছু কথা নিয়ে এগিয়ে যায়। প্রথাগত লেখনীধারা এখানে অনুপস্থিত। কিছু গভীর স্মৃতিচারনা,দর্শনবোধ,হতাশা,আক্ষেপ এর মাঝে গল্পের পরিসর কিন্তু রোমান্টিকতায় ভরপুর। হাজারো তরুন তরুনীর মনে যে স্বপ্ন থাকে,ঘর বাঁধার যে অভিলাষ আর শেষে অপ্রাপ্তির যে দীর্ঘশ্বাস তার সীমারেখা লেখক টেনে ধরেন প্রায় সবকটি প্রেমের গল্পে। অভিভাবকদের ভীড়ে এতসময় পরেও সীমার চোখ দুটি সৈকতকে খুঁজে ফিরে। এখানে কোন দৃষ্টিকটু সর্ম্পক নেই। স্বপ্নদিনের সেই ভাললাগা যে কখনো বিলীন হয় না,সেটাই এ দুটো গল্পের ছোঁয়া আর লেখকের মুন্সিয়ানা।
‘মাতাল হাওয়া’ লেখকের গভীর উপলব্ধি বোধে উদ্ভাসিত। জীবনে পরাজয় বলে কিছু নেই, এইটাই গল্পের বানী। মনের জোর থাকলে সবকিছু কে জয় করা যায়,এই মর্মবোধের পরিচয় দিয়েছেন গল্পের চরিত্র শৈবাল আর স্বর্ণা। ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটা চলা করা শৈবালের জীবনে নির্ভরতা আর বিশ্বস্ততার প্রতীক এই স্বর্ণা। যার কাঁধে ভর দিয়ে সে স্বপ্ন দেখেছে সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য উপভোগের। সত্যি সত্যি একদিন তারা দুজনে সেন্টমার্টিনে এসে পৌছালো। তরঙ্গমালার আনন্দ আর ভয়মিশ্রিত শিহরন তাদের ভিন্ন জগতে নিয়ে গেল। এতদিনের আক্ষেপ সাগরের উর্মিমালায় হারিয়ে গেল। শৈবালকে তার সমবয়সীরা খোঁড়া বলে করুণা করতো। অনেককিছুই সে জীবনে পায়নি। সৈকতে দাঁড়িয়ে শৈবালের চোখে যখন প্রাপ্তির আনন্দ অশ্রæ গড়িয়ে পরলো,তখন স্বর্ণা আবেগ জড়িয়ে বললো,‘আজ আমাদের বড় আনন্দের দিন,চোখে পানি রাখতে নাই’। মানুষের কষ্টের সীমারেখা টেনে লেখক গল্পের শেষে জীবনের জয়গান করেছেন। সেন্টমার্টিন থেকে ফেরার পথে অন্য যাত্রীদের ভাবনায় ছিল,এই খোঁড়া লোকটি নৌযানে উঠবে কেমনে? কিন্তু শৈবাল আর স্বর্ণার ভালবাসায় সেই কঠিনতম কাজটি অনায়াসে সমাধান হয়ে গিয়েছিল। মানবের জীবনে কোনকিছুই থেমে থাকে না। সৃষ্টি তার আপন গতিতে চলতে থাকে। মানসিক জোর আর জীবনকে ভালবেসে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়,পাঠকের ভাবনায় অনুপ্রেরনার ছোঁয়া লাগে,বেঁচে থাকার অফুরন্ত স্পৃহা জাগে।
প্রকৃতি আর প্রেম নাসের রহমানের গল্পের উপজীব্য বিষয়। সাথে আছে প্রতিদিনকার জীবনের চলাচলের নানা ঘটনাবলী,কাল্পনিক আর প্রতীকি চরিত্রের মাঝে বিষন্নতার রং,ছবি আর প্রতিচ্ছবির মাঝে একাকার হয়ে যাওয়া সময়ক্ষণ,প্রেমিকার দুনির্বার আকর্ষণে প্রেমিক আর প্রকৃতির উচ্ছ্বাস,মায়াময় স্বপ্নের ঘোর কাটতে না কাটতেই রুঢ় বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত মানবজীবন- যার সমস্তটাই লেখক দেখেছেন অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে। প্রত্যক্ষ করেছেন জীবনের বৈচিত্র্য আর লেখনিতে ঠাঁই দিয়েছেন এর মন্ত্রমুগ্ধকর সাবলীলতা। সরলীকরণ আর রচনার প্রাঞ্জলতায় রচিত প্রতিটি শব্দমালার ভেতর গেঁথেছেন প্রকৃতি প্রেম আর সৌন্দর্যের অফুরন্ত ভাললাগা।
‘কোলাহল সারাবেলা’ গল্পে গ্রামের সবুজ আর শিশুমনের গহীনে থাকা আনন্দ মিশেলে রুপকগল্পের ছোট ছোট বর্ণনায় গল্প হয়েছে পরিণত। সারাদিনের ছোটাছুটি,বড়শীতে মাছ ধরার আনন্দ,মাছটিকে বাঁচিয়ে রাখার নিদারুন চেষ্টা লেখক যেন প্রত্যক্ষদর্শীর মত করে দেখেছেন। গ্রামীন পরিবেশে শহুরে বন্দী জীবন ছেড়ে ঈদের আনন্দে ছুটি কাটাতে আসা শিশুদের আনন্দে বিহল হয়ে উঠে,“ আমাদের মাছ সাঁতার কাটছে,সাঁতার কাটছে” বলে হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে শহুরে গল্পের বিষন্নতা। বড়শীতে গেঁথে যাওয়া মাছটিকে নিয়ে নানা রকম ভাবনা আর রাতের বেলায় মায়ের বকুনী সব যেন পুকুরের পানির গভীরে হারিয়ে যাওয়া অস্বচ্ছ জলের মতন। টাকী মাছের মৃত্যু শোক শিশুমনে প্রভাব ফেলে। কিছুসময় পর তারা আবার আনন্দে জেগে উঠে জালে আটকে পড়া বড় কাতল মাছের লাফালাফি দেখে। লেখকের ভাবনায় শিশুমনের সেই দোলা দেয়া রুপালী আনন্দ বিভোর হয়। প্রতীক্ষার ঈদের চাঁদ আর রুপালি মাছের আঁইশগুলোর বাঁকা চাঁদের হাসির সাথে মিলে যায়। ভাবনার সব এলোমেলো আনন্দ-বেদনা-বিষন্নতা একাকার হয়ে উঠে লেখকের দৃষ্টি প্রখরতায়।
অনুগল্পের লেখনীধারা আরও প্রগাঢ় হয় “জোছনায় জলপরী” গল্পে। রাশেদের স্বপ বড় লরীর চাকায় পিষ্ট হয়ে যায়। রহস্যে দিঘীতে বসবাসকারী সেই মেয়েটিকে নিয়ে অগোছালো ভাবনার জালে আটকে পড়ে রাশেদ। কিঞ্চিত ভয়ে ভয়ে অশরীরী আত্মার স্বপ্ন সে দেখে,দোকানীর স্বরে“ঘুমা,তোর কি ডর করতেছে?” রাশেদ পরক্ষনে বলে উঠে“ডর করবে কেন,আমি কি মেয়েটিকে ডরাই নাকি?” রাশেদের পরাবাস্তব ভাবনায় মেয়েটি দারুন অবয়বে জোছনা ধারার মতন সাবলীল। ভেসে আসা দূরের অলীক প্রান্তরের কোন এক রুপসীর ছোঁয়া যেন রাশেদ অবিরাম অনুভবে ধারন করে আর অব্যক্ত দুঃখবিলাসী দৃষ্টিসীমায় আকাশের সব তারা যেন মিটমিট করে ঝিলিক দেয় চোখে। লেখকের ভাবনার অন্ত্যমিলে রাশেদ আর জলপরীর মিলে যাওয়া মানবমনের আরেক বিচিত্রতা। এখানে জীবনের অনুভূতি আর ব্যঞ্জনার সুরে নির্বাক হয়ে থাকে মহাকাল। প্রেমবিলাসী মনের কল্পনায় অচীনপুরের সেই মোহিণী ক্রমাগত বীণা বাজিয়ে যায়। স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে যায় পরের দিনের পত্রিকায় মধ্যরাতে লরির ধাক্কায় এক পথচারীর মৃত্যুর খবরে। লেখকের চরিত্রায়ন,গল্পের পরিবেশ বিনির্মাণ আর ঘটনার সাবলীল বর্ণনায় উঠে এসেছে অনেকগুলো মৌলিক বিষয়। গল্প এখানে শুধুমাত্র কল্পনা নির্ভর না হয়ে বাস্তবপথে যাত্রা করেছে। প্রকৃতি তার আলো-আধারী অস্পষ্ট এক সৌন্দর্যে প্রতিভাত হয়েছে এ গল্পে। নামকরনে আছে ভিন্নতা। ছোটগল্পের শেষ বানীর নির্যাসটুকুও যেন এখানে শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
নাসের রহমানের গল্পে শিশুমনের অনুভূতি এক বিশেষ রুপ পাই। শিশুদের নানান কর্মপরিধি,অবুঝ মনের বোধশক্তি,অল্প বয়সে পাকামী খুব সুক্ষèভাবে লেখক তাঁর “রুপালি মেঘের চাঁদ”গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। রোজাকালীন সময়ে শিশুদের ভাবনা,রোজা রাখার প্রতিযোগীতা আর ঈদের চাঁদের জন্য দুর্নিবার অপেক্ষা আমাদের সমাজের সকল শিশুর স্বপ্নময় সুখ-আনন্দ। সাথে নতুন কাপড়ের গন্ধ খোঁজা,ঝলমলে মার্কেটে ঘুরে বেড়ানো,শবে কদরের রাতের ভাবগাম্ভীর্যে বড়দের মত নিজেরা ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত হয়ে পড়া,অনেক প্রশ্নের নিরন্তর উত্তর খুজে ফেরায় এই বয়সের স্বভাবজাত উদ্দীপনা। লেখক খুব সুন্দরভাবে বাবার সাথে ছেলেদের কথপোকথনে তুলে ধরেছেন“তোমরা এখনো ছোট,আমি পড়লে তোমাদের পড়া হয়ে যাবে। এত লম্বা নামাজে ছোটরা যায় না”। শিশু মনে এইসব কথার স্থায়ীত্ব অল্প। ক্ষনিক পরেই তারা বাসার টিউটরকে প্রশ্ন করে “টিচার আপনি তারাবীর নামাজ পড়েন না?” প্রশ্নের পর প্রশ্ন চলতেই থাকে,বিরক্ত হয়ে টিউটর বলে,“আর কোন কথা নয়.এবার বই খোলো,পড়া শুরু করো।” শিশুদের মন চিরকালীন সহজ সরল আর কৌতুহলী। পড়ালেখার চাপে আটকে পড়া এইসব শিশুরা সারাদিন ব্যস্ত থাকে হোমওর্য়াক,কোচিং আর বাসার টিউটরের হোমওয়ার্কে। পাঠ্যবই,ক্লাসই যেন জীবনের বিশাল অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এখানে লেখক বাস্তবজীবনের রূঢ়তায় জীবনের স্বাদ নিতে না পারার শিশু মনের নিষ্পেষিত আক্ষেপের প্রতিচ্ছবি যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন তেমনি রুপালি মেঘের ফাঁকে সরু চাঁদ দেখার অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত হওয়ার গল্পও বলে গেছেন সমান্তরালে।
প্রকৃতির প্রেমে জাগরিত নাসের রহমানের গল্পের চরিত্রগুলোকে অনুভবের প্রক্রিয়ায় নিতে পাঠকের খুব বেশি সময় লাগে না। একধরনের
স্নিগ্ধতা আর মোহ জড়ানো স্পর্শের আবেশ জড়িয়ে থাকে গল্পের শুরু থেকে শেষ অব্দি। শিশুদের বিষয় নিয়ে লেখা লেখকের “স্বপ্নের রং” গল্পে মানবিক গুনাবলীর মধ্য দিয়ে শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি যেমন এসেছে তেমনি শিল্পীত ভাবনায় প্রকৃতিকে অপরুপ সৌন্দর্যের আসনে আসীন করেছেন। পাখির ডাকে ভোর হওয়া,সবুজ গাছের পত্রপল্লবে পাখির আনাগোনা,নীল আকাশের বুকে ডানামেলা পাখির বিচরন,কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকা স্থির বটবৃক্ষ সব যেন দোলা দিয়ে যায় শিশুর ভাবনাকে। মানুষের জীবনে প্রকৃতির শিক্ষা হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষা আর মা’র কাছ থেকে পাওয়া মানবিক গুনাবলীর শিক্ষায় জীবন পরিচালিত হয়,সেই দর্শন লেখক অনুধাবন করেছেন। এসবের ভেতর দিয়ে সমাজ পরিসরে ছোট্ট শিশুটি আগামী দিনের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠে। মা’র কাছে শত বায়না আর বাবার স্নেহের আড়ালে মায়ের বকুনী ঢাকা পরা ছোট্ট শিশুটি স্কুলের এতশত নিয়ম মানতে চাই না। তার কাছে স্বপ্নের ভেলা কখনো থেমে নেই। স্কুলের দারোয়ান যখন স্কুল ফটকের দ্বার দিয়ে মূল ভবনে বাচ্চাকে প্রবেশ করিয়ে দেয়,মা আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু না,মায়ের সেই সন্তান কান্না করে মাঝের গেইটে ছুটে আসে। বাচ্চার কান্নার শব্দ কেউ বুঝতে না পারলেও মা ঠিক বুঝতে পারে। নাসের রহমানের অন্তদৃষ্টি প্রখর। সপ্তাহ গড়িয়ে মাস পেরিয়ে যায়,সেই শিশু আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নেয়,এখন সে আর কান্না করে না। মা অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। শিশুর মনে ঠাঁই পাওয়া ভয়ভীতি যেন সেই পাখির সাথে সবুজের সাথে গড়ে উঠা সখ্যতায় মিলিয়ে যায় দূর আকাশের খন্ড খন্ড সাদা মেঘে। প্রকৃতি আর মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা পাওয়া শিশু বেড়ে উঠে স্বপ্নের হাজারো রঙে।
সমাজ বাস্তবতা থেকে দূরে থেকে কখনো জীবনকে উপভোগ করা যায় না,তেমনি কল্পনার আশ্রয়ে প্রতীকি চরিত্রের সাহিত্য অনেকসময় একঘেঁয়ে লাগে। অনুগল্পের ব্যতিক্রমী ধারার লেখক নাসের রহমান একঘেঁয়েমিতা দূর করে জীবনকে দেখেছেন আরো কাছ থেকে। জীবনের জটিলতা আর সরলতায় দেশ,প্রকৃতি,বাস্তবতা সবসময় তাঁর রচনায় জায়গা করে নিয়েছে। ব্যর্থতার জায়গা থেকে তিনি জীবনকে খুঁজে নিয়েছেন সফলতার পরিসরে। বিষয়ের গভীরতার নন্দিত উপস্থাপনা করেছেন তাঁর লেখনীর ছোঁয়ায়। “প্রজন্ম পতাকা” গল্পে লেখক গভীর অনুরাগে দেশের প্রতি ভালবাসা আর সম্প্রীতির জায়গায় দাঁড়িয়ে সাহিত্য রচনায় মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। সন্তানের দরদী গলায় জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায় ভালবাসি’ যখন গেয়ে উঠে,উর্ধ্বকাশে পত পত করে লাল-সবুজ পতাকার উড়ন দেখে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার চোখ আবেগে ছলছল করে উঠে। এ কান্না আনন্দ অশ্রæর। দেশ হানাদার মুক্ত করতে শহীদদের রক্তদানের মাধ্যমে যে লাল-সবুজ পতাকায় স্বাধীনতা এসেছে,সেই স্বাধীনতার আস্বাদ বাবা তার সন্তানের মাঝে খুঁজে পেয়েছেন। গল্পের ধারা বর্ণনায় লেখক পটভূমিতে এঁেকছেন মার্চপাস্ট,বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা,লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের চঞ্চলতা,গ্যাসভর্তি রংবেরঙের বেলুন,হিমেল হাওয়ায় বসন্তের আগমনী সহ শিশুমনের হেয়ালীপনায় স্কুল যেতে দেরী হওয়ায় বাবা বলেন“ তাড়াতাড়ি যাও,এখনি ঘন্টা পড়ে যাবে। তখন আর ঢুকতে পারবে না”,সব যেন এক সুতোয় গাঁথা। লেখক গল্পের শেষাংশে পিতার মাঝে দেশপ্রেমের যে আবেগধারার প্রবাহ তা সন্তানের হাতে ব্যানার আর লাল-সবুজ পতাকার রঙে মিশে একাকার হয়ে যাওয়ার সার্থক চিত্র পাঠকের সামনে চিরসবুজের বর্ণিলতায় আপ্লুত করেছেন।
গল্পের নাম করণে নাসের রহমান বরাবরই প্রকৃতিমনা আর সৌখিন। ‘রৌদ্রছায়ার মেলা’ গল্পটি শিশুমনের নানা বাতুলতা আর চঞ্চলতার সাথে এসময়ের গার্ডিয়ানদের কথপোকথনের এক অনুগল্প। স্কুল গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডিয়ানরা তাদের সাংসারিক নানান কথার মেলা বসাই। একে অপরকে হালকা খুনসুটিতে ব্যস্ত রাখে। কারো কাছে জীবন বর্ণিল তো আর কারো কাছে জীবনের রংগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। শৃঙ্খলার মাঝে রুটিনমাফিক শিশুরা শিক্ষা গ্রহনে ব্যস্ত,স্কুলের সিস্টারদের কড়া শাসনে এ্যাসেম্বলীতে সারিবদ্ধ করে দাড়ানো,মর্নিং আর ডে শিফটের আলাদা ড্রেসের মাঝেও শিক্ষার্থীদের খুঁজে নেয়ার বিড়ম্বনার চিত্র লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখক শিশুদের পাঠগ্রহনের সময়ের সাথে প্রকৃতির এক সম্পর্কের ইংগিত দিয়েছেন। ক্লাসরুমে ব্যস্ত শিশুরা যখন নিঃশব্দতার ভেতরে মগ্ন থেকে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করছে,তখন গাছের সবুজ পত্রপল্লবে পাখির কিচিরমিচির শোনা যায় না,প্রকৃতি যেন নিশ্চুপতায় গম্ভীর হয়ে আছে। যেন কোথাও কেউ নেই। শিশু আর প্রকৃতির কোলাহলহীনতা লেখকের অনুগল্পের ভাবনায় পাঠকের কাছে প্রশ্ন রেখে যায়,“শিশু আর প্রকৃতি কি একি বিষয়?”
“চোখের আলোয়” গল্পে লেখক অভিভাবকদের মনোযাতনা,সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে এই জগতে প্রতিষ্ঠিত করার সহজাত ইচ্ছাবোধ,সমাজ-দেশ,সাহিত্য-সভ্যতা,কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ধারন এবং লালন করে প্রগতিশীল মতাদর্শে বড় করার অভিপ্রায়,সন্তানের সফলতায় সৃষ্টির আনন্দের অনুভূতি মলাটবদ্ধ করেছেন। চপল-চঞ্চলা,অস্থির কিশোরীর মনোজগতের ধারা বর্ণনা লেখক খুঁজে নিয়েছেন আমাদের চারপাশ থেকে। পড়তে বসে হটাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া,বাসার টিউটরদের প্রানান্ত চেষ্টা,লেখাপড়াকে অবহেলা করা,অভিভাবকদের টেনশনের বাস্তবতা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। আজকালকার ছাত্রছাত্রীদের যে সিলেকটিভ বিষয়বস্তুতে পড়ালেখা শিখিয়ে শুধুমাত্র পরীক্ষা পাশ আর সার্টিফিকেট অর্জনের পিছনে সময় দেয়া হচ্ছে তার পড়ালেখার সাথে যে সখ্যতা গড়ে উঠছে না,লেখক তা গভীরে নিয়ে ভেবেছেন। লেখাপড়া শুধুমাত্র পরীক্ষা পাশের সনদপত্রের মাঝে আটকে পড়েছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা সৃজনশীলতার পরশ পাচ্ছে না। অমনোযোগীতা,স্বপ্নহীনতায় তারা অস্থির। গল্পের সেই কিশোরী অযথা সময়ক্ষেপণ করে স্কুলের ড্রেস পাল্টাতে,সিরিয়াল আসক্তি,হোমওর্য়াক শেষ না করা,অংকের সূত্রে ভুল করা,ক্লাসে বসে পাশের স্টুডেন্টদের সাথে গল্প জুড়ে দেয়া,দীর্ঘসময় পরেও পড়া শেষ করতে না পারা-এইসব যেন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বৈশিষ্ট্য। অভিভাবকের টেনশনের শেষ নেই। শেষপর্যন্ত সেই কিশোরীর পরীক্ষায় ভালো ফলাফলে পিতার আনন্দ অশ্রæ গড়িয়ে পড়ে। পিতা আবার স্বপ্ন দেখে মেয়েকে নিয়ে। স্বপ্ন এগিয়ে যায়,কুয়াশা কেটে যায়,আলোক উজ্জ্বল স্বর্ণালী দিনের সূচনা ঘটে।
“স্বপ্নকান্না” গল্পে লেখক আবারো শিশুমন নিয়ে লিখেছেন। কোরবানের আনন্দে আত্নহারা শিশুরা সারাবছর অপেক্ষায় থাকে এসময়টার জন্য। বছরে দুই ঈদে গ্রামের বাড়ি সরগরম হয়ে উঠে। শহরে আর ঢাকায় থাকা চাচা-চাচীরা,কাজিনরা সবাই আসে সেসময়। আনন্দে সময় কেটে যায়। কোরবানীর গরুকে নিয়ে বাচ্চাদের আনন্দ উচ্ছ্বাসে অনেক কৌতুহলী প্রশ্নও জাগে। কোরবানীর আগের রাতে গরুকে নিয়ে কল্পনার জগতে তারা অনেক কিছু ভেবে নেয়। বাচ্চাদের কেউ একজন বলে,“ আজ রাতে সব গরুকে নাকি স্বপ্ন দেখাবে। একটি লম্বা ছুরি দেখাবে” আরেকজন বলে“ আসমান থেকে ফেরেস্তারা এসে তাদের অভয় দিয়ে বলে,তোমরা কাল বেহেশতে চলে যাবে”। নানান কৌতুহলে তারা আলাপচারিতায় মেতে উঠে। ঈদের দিন গোসল সেরে নতুন জামা পরে জামাতে যাওয়ার পূর্বে গরুর চোখে পানির ধারা দেখে,তারা অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠে জানতে চাই “আমাদের গরু কাঁদছে কেন?” লেখকের ভাবনায় শিশুমনের আবেগে ফুটে উঠেছে স্বপ্নকান্না অনুগল্প।
ষড়ঋতুর বৈচিত্রময়তায় বাংলার প্রকৃতি রুপের যে পসরা নিয়ে আসে সেই সৌন্দর্যের বহি:প্রকাশ ঘটেছে লেখকের “সবুজ পাতায় শিশিরকণা” ও “ঝরাপাতা” গল্পে। প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিভোর লেখকের গল্পে প্রকৃতি আর শিশুর মাঝে ঠাঁই নিয়েছে নির্মল দর্শন। সবুজ প্রকৃতির এই দেশে ঘটা করে বৃষ্টি যেমন উদযাপন করা হয় তেমনি কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাওয়া চারদিকের স্তব্ধতাও অন্য এক ব্যঞ্জনার সুর তোলে। স্কুলের ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের গান প্রকৃতিও যেন কান পেতে শুনে থাকে। গল্পে ঋতু বর্ণনায় গ্রীস্ম এসেছে রুদ্র মনের খরতাপে,বৃষ্টির আগমনী ধ্বনিতে ক্ষতবিক্ষত মাঠঘাট তৃষ্ণা মেটায়, শরৎ আর হেমন্ত আসে কাশফুলের স্নিগ্ধতায় নীল আকাশের নিঃসীমতার ভেলায়,পুলক জাগানো শরৎ-হেমন্ত শেষ হতেই দেখা মিলে শীতের কুয়াশাভেজা ভোরের পাতায় ক্ষনিকপরে মিষ্টি রোদের হাসি আর শেষে মৃদুমন্দ বাতাসের দোলায় ফুলের সম্ভারে বিকশিত হয় ঋতুরাজ বসন্ত। ঋতু বর্ননার এই গল্পে লেখকের সুন্দর শব্দশৈলীর গাথুঁনীতে সাহিত্যবোধের রস যেন নির্মলতায় পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রকৃতির বৈচিত্রময় ছয়টি ঋতুর মত আজকের শিশুও একদিন স্বপ্নভেলায় চড়ে স্বপ্নের সীমানায় দেশকে নিয়ে যাবেন,এই বিশ্বাস শুধু লেখক ধারন করেন না,পাঠকের উপলব্ধিতেও জাগ্রত হয়।
প্রকৃতির অপরুপ রুপের সাথে মানবমনের চিরায়ত স্বপ্ন সাধনার লালন আর মাঝে মাঝে বিষন্নতায় হারিয়ে যাওয়ার অনেকগুলো ভালো গল্পের লেখক নাসের রহমান। “পুকুরজলে পুন্য স্নান” গল্পে লেখকের ভাবনার বিষন্নতা এক অন্য মাত্রায় রুপ নিয়েছে। ঘটনার প্রেক্ষাপটে মানবের নিষ্ঠুর আচরনের বিভীষিকার করুন চিত্র উঠে এসেছে জনৈক পাগলীর মৃত্যুতে। এই পাগলী মানুষের সৃষ্টি যে তার গ্রাম ছেড়ে হালদার পশ্চিমপাড়ের দূর গ্রামে ঠাঁই নিয়েছে ফেলা আসা অতীতের শেকড় সন্ধানে। মানুষের নিষ্ঠুর হাতে প্রকৃতির বিনষ্ট হতে থাকা,সম্পদের জন্য লালায়িত অবিরাম ছুটে চলা,ভোগ দখলের প্রতিযোগীতায় লিপ্ত থাকা পুকুরভরাটের প্রতি তীব্র ঘৃণায় মেয়েটি বলে,“রানী ঊষা বালা আমার দাদি। আমার দাদির দাদা মোহন সিং এ চারটি পুকুরের মালিক ছিলেন।”এ শুনে গ্রামের লোকজন তাকে তাড়িয়ে দেয়। রাতের আঁধারে সেই পাগলী,দাদির চিন্তায় মগ্ন থাকে। এক ধরনের বিষন্নতা আর আক্ষেপে সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা,দাদির মায়াঘেরা পুকুরজল মাটিতে ভরাট হয়ে যাবে। নিশিরাতে সে পুন্য স্নানে নিজেকে শেষবারের মত সিক্ত করার মানসে ধীরে ধীরে পুকুরজলে অবগাহন করে। এসময় দাদির আবেগ জড়িয়ে থাকা স্পষ্ট অনুভূতিতে নিজেকে অন্তিম শয়ানে আসীন করে। লেখক এখানে পরিণত হাতের ছোঁয়ায় কান্নার করুন সুরে বিউগল বাজিয়েছেন দাদি আর তথাকথিত পাগলীর মৃত্যু আলিঙ্গনে,এখানে মৃত্যু নির্ধারিত হয়েছে মানুষের নিষ্ঠুরতায়। মাটির গড়িয়ে পড়া চাকে আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে পাগলী কিন্তু তার বুকের আর্তনাদ কেউ শুনতে পারে না। অসাধারন ছোটগল্পের অনুভূতির ছোঁয়া পাওয়া যায় এ গল্পের ধারা বর্ননায়।
স্কুলগামী ছোট্ট শিশুমনে স্কুলের পড়ালেখা আর কঠোর বিধি নিষেধের গল্প “বিবর্ণপাঠ”। কোমলমতি শিশুর মনে এর প্রভাব পড়ে। আনন্দ স্কুল নিরানন্দে পরিণত হয়। রাস্তার জ্যামে আটকে পড়া প্রত্নের স্কুলে পৌছাতে দেরী হয়ে যায়। অংক পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নপত্র কমন পড়েছিল,কিন্তু সময়ের কারনে সবগুলো অংক সে করতে পারেনি। টিচারের গাঢ় স্বরের কন্ঠে,“ খাতা দিয়ে দাও আর সময় নেই। এতক্ষন লিখ নি কেন?” কথাগুলো প্রত্নের চোখে জল নিয়ে আসে,সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে থাকে। প্রত্ন ক্লাসে একা বসে থাকে। এই কঠোর বিধিমালায় লেখক আহত হলেও গল্পের সমান্তরালে জীবনের অন্যদিকটাও তিনি ভেবেছেন। মায়ের কাছে কান্নাজড়িত কন্ঠে ছেলে পরীক্ষায় সব প্রশ্নের উত্তর শেষ করতে না পারার কারন বলার পর মা ছেলেকে বলেন,“ পরীক্ষার সময় শেষ হলে আর লিখতে পারে না। সময়ের মধ্যে সব শেষ করতে হয়।” প্রত্নয়ের কান্না এবার থামে। সে আগামীদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সে আর মা ধীরে ধীরে বাসার দিকে রওনা হয়। লেখকের ভাবনায়,আজকের শিশু আগামী দিনের জাতির কর্নধার সে শিশুকে যোগ্য হয়ে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব সকলের। স্কুলের কঠোর বিধি নিষেধ আর মায়ের মমতা সব কিছু নিয়ে আগামীদিনের ভবিষ্যতের সূচনা করবে আজকের শিশু।
নাসের রহমানের ভাবনার আকাশে প্রকৃতি,মানুষ,আনন্দ,বিষন্নতা ছাড়াও নিটোল প্রেমের ছোঁয়ার অনুগল্প “বৃষ্টিভেজা রোদ”। অফিসের নানান কাজের মাঝেও সহকর্মীদের খুনসুটি আর বাহারী কথায় দিনের কাজ এগিয়ে যায়। এক অপরকে সাহায্য সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে অফিসের সব কাজ সুন্দরভাবে শেষ করার মন-মানসিকতা এ গল্পে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। পথ চলতে চলতে আর অফিসের কাজের ফাঁকে খুনসুটিতে লিমা আর কম্পিউটারের সহকর্মী ছেলেটির মনে কখন যে হালকা প্রেমের দোলা লাগে,তা নিজেরাই বুঝতে পারে না। লেখকের রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায় গল্পটিতে। লিমার কাকভেজা হয়ে অফিসে আগমনের পর ছেলেটি ওয়াশরুমের দিকে লিমাকে ইংগিত করার সময় দুষ্টামী করে বলে,“এখানে হবে না,ফ্লোর ভিজে যাচ্ছে”। সহকর্মী ছেলেটি লিমাকে অফিসের নানান কাজে সাহায্যে করে। লিমা তাকে বলে,“পুরুষদের কর্তব্যের মাঝে একটা উদ্দেশ্য থাকে। আপনারটা কী জানতে পারি?” লেখকের অফিস ছুটির পরে দুজন একসাথে রিকশা করে বাড়ি ফেরার সময়ে রোদের হালকা ছোঁয়ায় অপূর্ব লাগে লিমাকে। সহকর্মী ছেলেটির দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। লিমারও ভাল লাগে ছেলেটিকে। একরকম ভালো লাগায় বিভোর দুটি মনের ভাষা এতদিন অজানা ছিল দুজনের কাছে। আজ পড়ন্ত বিকেলে সাঝের আকাশের সব রং যেন ভালবাসার ছোঁয়ায় আরো বেশি রঙ্গীন হয়েছে যুগলের অবয়বে। লেখকের সুন্দর ভাষায় বর্ননার এগল্পে চিরায়ত প্রেমের স্বপ্নবাসনার কথা বলা হয়েছে যা সৃষ্টির পর হতে বহমান নিরবধি সময়কালে।
“আলোঝরা বনপথ” গল্পে কথাসাহিত্যিক তাঁর স্বকীয়তাকে আরো বেশি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছেন। গল্পের নায়ক হাসান নিজ শহর থেকে যাত্রা শুরু করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে শান্ত শহরে পৌছায়। এরই মধ্যে সে যেমন পাহাড় আর অরণ্যের সবুজের বৈচিত্রময় প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় তেমনি আবার গভীর খনি দেখে উৎকন্ঠিত হয়। হাসান একজন দৃঢ়চিত্ত,নির্ভীক,প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হিসেবে উপস্থাপিত গল্পে। যাদের জীবন পথে চলার সময়ে কোনও বাধা-বিপত্তি তাদের থামাতে পারে না। জীবনের চড়াই উৎরাই তাদের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। উচু-নিচু ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ী পথের দূর্গম রাস্তাতেও গথি শ্লথ হয় না,হাসানের তখন মনে হয়,“ কিন্তু যাত্রীবাহী গাড়ি হলে খুব সাবধানে চলতে হয়। অনেক সময় উল্টে এমন নিচে পড়ে যায় অধিকাংশ যাত্রী আর জীবিত থাকে না। তবুও কেন যেন বেপরোয়া। এমন মৃত্যু ভয়ে তারা ভীত নয়।” নাসের রহমানের গল্পে সমাজের এক শ্রেনীর শোষিত মানুষের নির্যাতিত হওয়ার চিত্র ফুটে উঠে। পাহাড়ি গৃহস্থদের কষ্টার্জিত ফসল ও ফলমূল অনেক কম দামে দিয়ে দিতে বাধ্য হতে হয় শহুরে বেপারীদের কাছে। যারা গৃহস্থদের ফলমূল শহরে বিক্রি করে অনেক মুনাফা অর্জন করে কিন্তু বঞ্চিত করে পাহাড়ী গৃহস্থদের। লেখকের ভাষায়,“বেপারির উৎপাতে ওরা দাঁড়াতে পারে না। যে দামে বলে সে দামে কিনে নেয়। দেওয়ার সময় কিছু টাকা কম দেয়। মানে ঘন্টা দু-ঘন্টার মধ্যে বিক্রি না হলে আর বিক্রি করতে পারে না।”হাসান চরিত্রায়নে লেখক মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন। দায়িত্ববান হাসান অফিসের কাজে শান্ত শহরের দিকে যাত্রা করেছে সেই সকালে কিন্তু যাত্রার পূর্বে বাচ্চাদের স্কুলে পৌছায় দিয়ে আসে। পরিবার আর কর্মস্থলের প্রতি দায়িত্ব পালনে হাসানের উদ্যোমী মনোভাব প্রশংসনীয় ও অনুপ্রেরনামূলক। যাত্রাপথে শহুরে আর শান্ত শহরের মাঝের অনেক জায়গার বর্ণনা লেখক দিয়েছেন। আলোঝরা বনপথ গল্পে লেখক মাটি আর প্রকৃতির ঋণ শোধ করেছেন। যে পরিবেশের আলো বাতাসে তিনি বড় হয়েছেন সেইসব জায়গাকে তিনি সাহিত্যের দরবারে যুক্ত করেছেন এক ভিন্ন উপমায়। ষোলশহর দুই নম্বর গেইট,হাটহাজারী রোড,গড়গড়িয়া,ভূতের নগরী(আলুটিলা),চেঙ্গী খাল,মানিকছড়ি,গুইমারা,মাটিরাঙ্গা এসব নাম কখনও বিলীন হওয়ার নয়। এসব দূর্গম জায়গায় চাকরীসূত্রে অনেকে অবস্থান করেও প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য্য উপভোগে উদাসীন থাকে। এই গল্পের মাধ্যমে এসব জায়গা সর্ম্পকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে পাঠককূলকে,নতুন আকর্ষনে। গল্পের আবেদনে চিরভাস্কর হয়ে থাকবে উদ্যোমী চেতনাবোধ,নতুনকে কাছে টানার শক্তি,একঘেঁয়ে যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রেমে বিভোর থাকার আনন্দ আর দায়িত্বশীলতা।
প্রকৃতি প্রেমের মাঝে,কংক্রিটের নগরীর বাইরে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকাটা যে এ যুগের মানুষের কাছে আরাধ্য আর আকুলতা তা এক টুকরো রোদ গল্প নামকরনেরই সার্থকতা। “ভোরের কুয়াশার কোমল সাদা কাশফুলের মত ভেসে ভেসে পাতায় পাতায় পরশ মেখে দিচ্ছে। তারিন ভেবে কুল পায় না আজকের সকাল কেন এত বিভোর করছে তাকে” তারিনের আকুল অভিব্যক্তি পাঠক হৃদয়ে ঝড় তুলে,তেমনি গল্প শেষে তারিনের ভারী কণ্ঠ বলে,“আমার মন খারাপ করা কোন ব্যাপার নয়,বাবু এই পরিবেশে বড় হলে প্রকৃতির এতসব সৌন্দর্য উপভোগ করার মত মানসিকতা তার তৈরী হবে না” তারেকের টাকার পিছনে দিনরাত ছুটে চলা আর তারিনের এর্পাটমেন্টের দমবন্ধ হয়ে আসা,যেন পাঠকের প্রকৃতির সান্নিধ্য জীবনের স্বাদ নিতে না পারার নিষ্পেষিত হওয়ার আক্ষেপের প্রতিচ্ছবি।
নাসের রহমানের ভাবনায় আর লেখনীতে যেমন নগরীর চিরচেনা চরিত্রের সংমিশ্রন থাকে তেমনি দেখা যায় পাহাড় ঘেরা ভিন্নরকম লোকাচারের প্রকৃতি সন্তানদের জীবনযাপনের চিত্র। প্রকৃতির মাঝে বসবাসকারী সেইসব শান্তি প্রিয় মানুষদের ভালো লাগা মন্দ লাগা,সহবস্থানে শান্তিময় জীবন যাপনের তীব্র ইচ্ছা-বাসনার গল্প “ফেরা” আর আর “বন ময়ূরের কান্না” । অশান্ত পাহাড়ের চরিত্র ক্যাচিং, মিথিলা আর রাহুলের বসবাস,মিথিলার চিন্তা জগতে অবিরাম আওয়াজ আসতো“দূর পাহাড়ের কোল ঘেষে আকাশের শেষ সীমানায় বিস্তীর্ণ নীলিমায় মানচিত্রের মত মেঘখন্ড যেন রাহুলের ছবি ভেসে উঠে বার বার। ওরা নাকি ফিরে আসছে রাতের আঁধার থেকে দিনের আলোতে”। লেখকের চমৎকার শব্দশৈলীর অনুপম গাথুঁনীতে ভাবনাগুলো যেন সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার আকুলতা। সমাজের শান্তিময় এক পটভূমি গড়ার ইংগিত লেখকের যেখানে ভিন্নতা থাকবে নিয়মের,আচার আচরনের কিন্তু অভিন্ন সত্তা থাকবে মানবিক আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের।
লেখকের লেখনী ধারা অবিরাম ছন্দবদ্ধ হয়েছে প্রতিটি গল্পে,প্রতিটি শব্দ নির্বাচনে। স্বপ্ন ও শোর্কাত ফুলের আর্তনাদ গল্পে সন্ত্রাসের ভয়াল থাবা কিভাবে পবিত্র শিক্ষাঙ্গনকে কুলষিত করছে,অস্ত্রের ব্যবহারে শিক্ষার্থীর স্বপ্ন হচ্ছে ধূলিস্যাৎ আর মায়ের অশ্রæ প্রিয় সন্তানের কাফনে তাজা রক্তে ¤øান হয়ে যাচ্ছে,তারই হাহাকারের পদধ্বনি শোনা যায়। দিনদিন সমাজের এই অবনতির চিত্র লেখক এঁেকছেন “পাখিদের সব গান করুণ কান্না হয়ে মাসুদের আর্তনাদের ভেতর হারিয়ে যায়। পাহাড়ের আদিম নিস্তব্ধতায় যেন চারিদিক ডুবে যায়। মাসুদের লাল রক্ত বুক বেয়ে তপ্ত মাটিতে পড়ার আগে আগুন হয়ে কৃষ্ণচূড়ার সাথে মিশে যায়”। পাঠকের মনোজগতে এক বিষন্নতা ভর করে,যা লেখকের রচনার সার্থকতা তেমনি বিষন্নতা ঝেড়ে “পথচারী” গল্পে তারুন্যের জয়গান করা হয়েছে। অজানা অচেনা লোকান্তরের ভয়-ভীতি কিছুই স্পর্শ করে না তারুন্যের যাত্রাপথে,তারুন্যের সাহসে। গল্পের চরিত্র আতিকের আপন কন্ঠে আক্ষেপের সুর“এরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। তবু কেন পরাধীনতার কলঙ্ক বহন করতে হচ্ছে”। আক্ষেপ ঝেড়ে পর মুর্হূত্বে আপন শক্তিতে আতিকের জেগে উঠার গল্পই হলো তারুন্যের পথচলা,শোষনমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা যেখানে সকলে মিলেমিশে গড়ে তুলবে স্বপ্নের সোনার বাংলা।
অবরুদ্ধ সমাজের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের জীবনের অবস্থা “বিষন্ন বিকেল” গল্পের উপজীব্য বিষয়। অন্তরা আর আসিফের কথপোকথনে “তুমি শুধু সাঁঝের রূপটাই দেখলে। সন্ধ্যার পর কালো আঁধারের ভয়াবহতা একবারও দেখলে না”। লেখক গল্পের পরতে পরতে সমাজের বিষন্নতা এঁেকছেন আপন ভাবনায় কিন্তু বাস্তবতার নিরীখে। চরিত্রের মাঝে গল্পের এগিয়ে যাওয়ার করুনতা আমাদের চিন্তার উদ্রেক ঘটায়,ভাবনার আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা বাড়িয়ে দেয়। রাজনীতি করা জাহেদের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহ রাজপথে পরে থাকতে দেখে লেখক সমাজের কাছে প্রশ্ন রাখে

অন্তরার আবেগে“ বলেছিল; এই জীবনটা দিয়ে দিতে পারি, তবুও রাজনীতি ছাড়তে পারবনা।” যে রাজনীতি মানুষ খুন করে সে রাজনীতি কিভাবে জনগনের উন্নয়ন ঘটায়?
প্রকৃতির রুপবৈচিত্র্য আস্বাদনকারী লেখকের প্রতিটি গল্পে মানবমনের বিচিত্র রুপ আর কল্পনার জালে মায়াবী মন্ত্রমুগ্ধতার ছোঁয়া “নীল তৃষ্ণা” গল্পের শফিক আর শিউলির মাঝে,যেখানে শিউলী আক্ষেপ করে বলতো “আহা যদি পাখিদের মত হতে পারতাম”। গল্পের বর্ননায় প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য প্রকাশিত“পাতার ওপর জ্যোৎস্নার আলো আর নীচে কেমন মায়াবী তরল আঁধার” “শিশির বিন্দুরা রোদ আর বাতাসের সান্নিধ্যে যতক্ষণ না মিলিয়ে যায় ততক্ষণ আমি বিভোর হতে থাকি ঐ তৃষ্ণার ভেতর” লেখক মনের শান্ত আর অনাবিল ধারায়। কথাসাহিত্যিক নাসের রহমান পাঠকের মনের গহীনে নিরবে জায়গা করে নিয়েছে কথার মায়ায় তেমনি সূক্ষè দৃষ্টিকোণে অবলোকিত“মাটি কাটার ট্রাক্টর পাহাড়ের বুক বিদীর্ণ করে চলছে। যান্ত্রিক শব্দটা এখনও বিশাল পাহাড়ের প্রাচীর ভেদ করে বাইরে আসতে পারছে না” সৌরভের ভাবনায়, “বিমূর্ত ছবি” গল্পের কথামালায়ও পাঠকের হৃদয় আকর্ষণ করে। সৌরভের স্মৃতির মাঝে অসীম ভাবনার ভান্ডারের বিচিত্র সব অনুভূতিময় বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন,সেখানকার পরিবেশের বর্ননা,ট্রেনের কামরায় এলামেলো ভাবনা,হটাৎ শৈলীর আগমন সবকিছুর মাঝে নাটকীয়তার প্রলেপমাখা ছিল। লেখকের প্রাঞ্জল ভাষায় এইসব রংবেরং এর স্মৃতিচাড়না পাঠক জীবনের কোথাও না কোথাও ভাবের অন্ত্যমিল খুঁজে পাই।
লেখকের রোমান্টিক গল্পের ছোঁয়া আমরা পাই “তৃষিত স্বপ্ন” গল্পে। চাকুরীজীবি আসিফের অনেকদিন পর বান্ধবী মেরিনার সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পর হিয়ার মাঝে যে ব্যাকুলতা জাগে তা পাঠকের হৃদয় হরন করে “মেরিনা আগের মতই কানের দুপাশে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে উঠা চুলগুলো সযত্নে লালন করেছে”। সৌন্দর্যে বিভোর আসিফের দৃষ্টি সরাতে মেরিনা নীরবতা ভঙ্গ করে বলে “তুমি কথা বলছো না যে”। পুরানো ভাললাগাগুলো জাগ্রত হয়ে উঠে দুটি মনের গহীনে। প্রকাশিত ভালবাসার ব্যাঞ্জনা শুধুমাত্র আসিফের কন্ঠে নয়, মেরিনার দীপ্তিময় চেহারায় অসংখ্য অনুরণে আবেগ জড়িত কন্ঠে ভেসে আসে “সত্যি বলতে কি, তুমি প্রকাশ করতে পার আর আমি পারি না।”পাঠকের হৃদয়ে ক্ষরন ঘটে,ভালবাসার ফল্গুধারা বয়ে যায় নিরবধি,দূর সমুদ্রের গভীরে আর নিঃসীম আকাশের দিগন্তরেখায়।

বরেণ্য গল্পকার নাসের রহমান তাঁর অসাধারন লেখনীশক্তির মধ্য দিয়ে মানবমনের স্বপ্ন,ভালবাসা,সমাজের অসংগতি আর বিরূপতা একেঁছেন আপন ভাবনায়,যা পাঠকসমাজকে যেমন আলোড়িত করে তেমনি অনুরনিত করে অসংখ্য ছোঁয়ায়। নির্বাচিত গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পের সবগুলো চরিত্রই আমাদের খুব চেনা-জানা। আপন গন্ডির মাঝে লেখকের অর্ন্তদৃষ্টির প্রত্যক্ষ সৌন্দর্যে মহিমান্বিত একেকটি চরিত্র। এখানে বৈরী বিষন্নতা আর সুখের কান্নার মাঝে জীবনকে উপলব্ধির যে অনুপ্রেরনা তা এককথায় চমৎকার। লেখকের জীবনকালে রচিত নানারকম গল্পের বুনটে ঠাসা “নির্বাচিত গল্প” পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে,তা বলাই বাহুল্য।