জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র মেগা প্রকল্প

নালা পরিষ্কারের মাধ্যমে কাজ শুরু হচ্ছে আজ

এম এ হোসাইন

66

অবশেষে ‘চট্টগ্রামের দুঃখ’ খ্যাত জলাবদ্ধতা নিরসনের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তদারকিতে আজ শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কাজ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে নগরীর নালাগুলো পরিষ্কারের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। ভারী বৃষ্টিপাতের আগেই নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের নালাগুলো পরিষ্কার করার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামা হচ্ছে। ফলে এ বর্ষায় মেগা প্রকল্পের কিছুটা হলেও সুফল মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে সিইজিআইএস-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাজ তদারকির জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সাথে সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তাকিাভুক্ত সিইজিআইএস প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বৈঠক করে কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় নগরীর ১৬টি খালকে টার্গেট করেই মাঠে নামছে সিডিএ। এ খালগুলোকে ৪টি লটে ভাগ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা লিমিটেড এবং করিম গ্রুপকে দুই লটে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরো দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এসব মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ দিয়ে পুরোদমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, বর্ষা সন্নিকটে। এরই মধ্যে শনিবার থেকে মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে আমরা ১৬টি খাল ও খালা সংস্কার এবং মাটি উত্তোলন করবো। এরমধ্যে শনিবার নালা পরিস্কারের কাজের মাধ্যমে মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। নালা পরিস্কার সম্পন্ন হলেই, খালের কাজ শুরু হবে। নগরবাসী যেনো দ্রুত সুবিধা ভোগ করতে পারেন সেজন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্ষার আগেই প্রর্যায়ক্রমে ৩০টি ওয়ার্ডের নালা-ড্রেন পরিষ্কার করা হবে।
নগরীতে বর্ষায় বিস্তৃত এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে নগরীর নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। শুধু বৃষ্টির পানি নয়, জোয়ারের পানিতেও যখন তখন ডুবে যায় নগরী বিভিন্ন এলাকা। জোয়ার-ভাটা হিসেব কষে নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকার বসবাসকারীদের পথ চলতে হয়। পানিতে কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি হয় প্রতিবছর। দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হয় অনেক এলাকার বাসিন্দাদের। ভয়াল এই দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে নেয়া হয়েছে বহুল আলোচিত এ মেগা প্রকল্প।
আজ নালা ও ড্রেন পরিষ্কারের মাধ্যমে প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই খালের মাটি উত্তোলন ও সংস্কার কাজ শুরু করা হবে। প্রাথমিকভাবে নগরীর দুই নম্বর গেট থেকে মুরাদপুর, বহদ্দারহাট থেকে বাস টার্মিনাল এবং আহমদীয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে রেললাইন পর্যন্ত অংশের নালা ও ড্রেন পরিস্কার কাজের মাধ্যমে এ প্রকল্পের কাজের সূচনা হতে যাচ্ছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, নালা, ড্রেন সংস্কার কাজ কিছুটা জঠিল। খাল সংস্কার কাজ অনেক সহজ। সে হিসেবে শনিবার সকালে দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট ও সুন্নিয়া মাদরাসা অংশে নালা পরিষ্কার কাজ শুরু হবে। পরবর্তিতে আমরা একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খাল সংস্কার কাজের উদ্বোধন করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে খালের কাজ করা হবে, তাই খাল সংস্কার কাজ অনেক দ্রুত হবে।
চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনের নেওয়া এ মেগা প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে ইতোমধ্যে ৫০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মহানগরীর ৩৬টি খাল পরিষ্কার করে ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার কাদা অপসারণ এবং ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি খনন করা হবে। খরচ হবে ৫৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। খালের দুপাশে ১৭৬ কিলোমিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। খালের ওপর ৪৮টি সেতু ও ছয়টি কালভার্ট নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। পাঁচটি টাইডাল রেগুলেটর নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ৪২টি বালির ফাঁদ (সিল্ট ট্র্যাপ) করা হবে ২৯ কোটি ৪০ লাখ টাকায়।
এছাড়া বন্যার পানি সংরক্ষণের জন্য তিনটি জলাধার ও খালের পাড়ে রাস্তা নির্মাণ হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হবে। তবে আপাতত এ বর্ষায় ১৬ খালে কাজ করা হবে। খালের সংযোগে থাকা নালাগুলো পরিষ্কারের মাধ্যমে এ কাজের সূচনা করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৬টি খালের মাটি উত্তোলন ও সংস্কার করা হবে।
এ খালগুলো হলো চাক্তাই খাল, বির্জা খাল, রাজাখালী খাল-১, রাজাখালী খাল-২, রাজাখালী খাল-৩, মির্জা খাল, মরিয়মবিবি খাল, হিজরা খাল, মহেশখাল, কলাবাগিচা খাল, ডোমখাল, বামুনশাহী খাল (কোদালাকাটা খাল, কাটা খাল, সানাইয়া খাল, মধুছড়া খালও বামুনশাহী খালের অন্তর্ভুক্ত), চাক্তাই ডাইভারসন খাল (বাকলিয়া খাল নামেও পরিচিত), নোয়া খাল (বাইজ্জা খাল ও বালু খাল নামেও পরিচিত), খন্দকিয়া খাল ও নাছির খাল।
খালগুলোর সাথে লাগোয়া নালাগুলোর কাদা আগে পরিষ্কার করা হবে। এতে পানি দ্রæত খালে নেমে যেতে পারবে। ফলে বর্ষায় মানুষ কিছুটা হলেও জলাবদ্ধতা থেকে নিস্তার পাবে। এতে নগরীর চান্দগাঁও, বৃহত্তর বাকলিয়া, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, বকশির হাট, দেওয়ান বাজার, চকবাজার, পাঁচলাইশ, হালিশহর, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক প্রভৃতি এলাকার লোকজন উপকৃত হবে।