নারীর ক্ষমতায়নে রোল মডেল বাংলাদেশ

22

নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বের রোল মডেল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঘরে-বাইরে, রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। এখন দূর গ্রামাঞ্চলেও নারী আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় নয়। কর্মক্ষেত্রে নারীরা দক্ষতা প্রমাণ করছেন, কৃতিত্ব দেখাচ্ছেন। নারীরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, পর্বত জয় করছেন, অগ্রট্টী ভূমিকা রাখছেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও। সব ধরনের খেলায়ও পুরুষের পাশাপাশি নারীরা আজ পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন। নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তো বটেই, উন্নত অনেক দেশ থেকেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। নারী-পুরুষের সমতা (জেন্ডার ইক্যুইটি) প্রতিষ্ঠায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশ। আর নারীদের এই অর্জনকে স্বীকৃতি প্রদান এবং তার কাজকে উৎসাহ দিতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’-এই প্রতিপাদ্যে এই বছর পালিত হল আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
কিছু হতাশা থাকলেও নারীর ক্ষমতায়নে দেশের অর্জন অনেক। হার্ভার্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে করা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে রাষ্ট্রক্ষমতায় নারীর অবস্থান বিবেচনায় সবাইকে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বরে উঠে আসে বাংলাদেশের নাম। ডাব্লিউইএফের হিসাবে নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নে ৪৮তম অবস্থানে বাংলাদেশ। এ অবস্থানের কারণ, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পাঁচ। প্রথম চারটি দেশ হলো আইসল্যান্ড, নিকারাগুয়া, নরওয়ে ও রুয়ান্ডা।
নারী উন্নয়নে সার্বিক সূচকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত ২৪টি দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার পরেই দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান বাংলাদেশের। বিশ্বের ৩৬টি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৭ অনুসারে, ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থান ছিল ৪৭তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের চেয়ে ভালো অবস্থান নির্দেশ করে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে নারীর ক্ষমতায়নের অর্জন অনেক। বৈশ্বিক স্বীকৃতিও কম নয়। নারী শিক্ষার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগে ভূমিকার জন্য গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। এ ছাড়া জাতিসংঘের ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ ও ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ অ্যাওয়ার্ডেও ভূষিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নারীর ক্ষমতায়নে বেশ কিছু আইন-নীতি ও বিধিমালা তৈরি করেছে সরকার। বর্তমানে বিচারপতি, সচিব, ডেপুটি গভর্নর, রাষ্ট্রদূত, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারী। বর্তমানে প্রশাসনের উচ্চপদে ৫৩৫ জন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদগুলোতে এ নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিব রয়েছেন ৬ জন নারী। অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৮১ জন, যুগ্ম-সচিবের মধ্যে নারী রয়েছেন ৮৭ জন। প্রশাসনে ১ হাজার ৮৪০ জন উপসচিবের মধ্যে নারী উপসচিব রয়েছেন ৩৬১ জন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে মোট নারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮১৯ জন। মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে গত বছর পর্যন্ত নয় জেলায় নারী ডিসিরা দায়িত্ব পালন করছেন।
গত দুই দশকে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান প্রায় ৩ ভাগেরও বেশি উন্নতি হয়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু নারীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। তিনি জয়িতা ফাউন্ডেশনকে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহব্বান জানিয়েছেন। মুজিববর্ষে ৫০ লাখ প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত নারীকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের নারীদের বেশ কয়েকটি তাক লাগানো সাফল্য সবার দৃষ্টি কেড়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশের নারী বিজ্ঞানী ড. ফিরদৌসি কাদরি ২২তম ল’রিয়েল-ইউনেস্কো ফর ওমেন ইন সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড অর্জন। তিনি আইসিডিডিআর’বির মিউকোসাল ইমুনলজি অ্যান্ড ভ্যাকসিনোলজি ইউনিট অব ইনফেকসিয়াস ডিজিসেস ডিভিশনের প্রধান। ফিরদৌসি উন্নয়নশীল দেশের শিশুদের সংক্রামক রোগ সম্পর্কে গবেষণার জন্য এই সম্মাননা পেয়েছেন। তার এই অর্জনের জন্য ১২ মার্চ তাকে প্যারিসে ইউনেস্কোর প্রধান কার্যালয়ে ১ লাখ ইউরো ও সনদ প্রদান করে পুরষ্কৃত করা হবে।
মাহজাবিন হক নামের আরেক বাংলাদেশি নারী শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসায় যোগ দিতে যাচ্ছেন। কৃতী এই শিক্ষার্থী গত বছরের শুরুর দিকে নাসায় দ্বিতীয় দফা ইন্টার্নশিপ শেষ করেন। তিনি মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে স্নাতক শেষ করেন। গত বছরের ৭ অক্টোবর তিনি স্পেস সিস্টেম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেবেন টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের মেয়েরা খেলাধুলায় বিগত কয়েক বছরে নিজেদের সাফল্য ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিকভাবে ফুটবল, ক্রিকেট ও অন্যান্য খেলায় তারা ভালো করছে। এর উদাহরণ ফাতেমা জাহারা। এই নারী খেলোয়াড় সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার লিজেন্ডারি নিউ সাউথ ওয়েলস ক্রিকেট একাডেমিতে বেশ কয়েক দিন কোচ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, যা দেশের নারীদের ক্রিকেট ইতিহাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরেক নারী জয়া চাকমা। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে চারজন নারী ফিফার রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে দুজন ভারতের আর একজন নেপাল অন্যজন ভুটানের। আর এবার ফিফার পঞ্চম এবং এশিয়ার আরেক নারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের জয়া। বলা হয়ে থাকে, নারী উন্নয়নের অন্যতম সূচক হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। সে হিসেবে বাংলাদেশে শুধু পোশাক খাতে আট মিলিয়ন শ্রমিকের মধ্যে ৭০-৮০ ভাগ নারী।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনেক অর্জন : নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নেও সরকার ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশই বিশ্বে সম্ভবত একমাত্র দেশ যেখানে সংসদ নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার একজন নারী। ২০২০ সাল নাগাদ সব রাজনৈতিক দলের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা পরিষদে ১ জন নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে নারীকে অধিকারবঞ্চিত করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার কারণে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নারীর পদচারণা দ্রুত হারে বাড়ছে। সমান অধিকার, মর্যাদার প্রশ্নে নারীরা তৎপর। সার্বিক বিচারে সমাজের প্রতিটি পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন কারিগরি ক্ষেত্রে নারীরা উচ্চ পদে রয়েছেন। দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যুক্ত রয়েছেন অনেক নারী। ক্রিকেট, ফুটবলসহ পর্বতশৃঙ্গ জয়েও এগিয়ে এসেছেন নারীরা। নারী পুলিশ সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করছেন। শিল্প প্রতিষ্ঠায়ও ভালো করছেন নারীরা। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে। বছরে বিপুলসংখ্যক নারী চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন।
তবুও নারী আপন ঘরেই নিরাপদ নয় : বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন বা নারীর উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা হয়। সুখবরও আছে অনেক। কিন্তু বিপরীত চিত্রটি আরও ভয়াবহ। ঘরে-বাইরে বলতে গেলে সর্বত্রই চলছে নারী নির্যাতন আর নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা। বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিবাহিত নারীদের শতকরা ৮০ জনই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। স্বামীদের হাতেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন তারা। কিন্তু কথিত পারিবারিক সম্মান, সন্তান এবং নানা সামাজিক দিক চিন্তা করে তাদের অধিকাংশই এই নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না।
আর ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্যাতনের শিকার নারীদের শতকরা ৮২ ভাগই বিববাহিত নারী। অর্থাৎ বিবাহিত নারীরাই নির্যাতনের শিকার হন বেশি। নারী নির্যাতনের মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন অন্যতম। শারীরিক নির্যাতনের হার শতকরা ৬১ ভাগ। অপর এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, নারী নির্যাতনকারী হিসেবে পরিবারের সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। পরিবারের সদস্যদের হাতেই শতকরা ৭৭ ভাগ নারী নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যায় নিয়মিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই।
নির্যাতনের বড় একটি কারণ হিসেবে বাল্যবিবাহকেও চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশের নতুন আইনে আইনগতভাবেই ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বিবেচনায় ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়েকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনায় যারা সাহস করে মামলা করেন তারাও বিচার পান না। শতকরা ৯৭ ভাগ মামলায়ই আসামিরা সাজা পান না।