নতুন বছরে অযৌক্তিক বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে

19

২০১৯ সালের বিদায় ঘণ্টা বাজার সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর মধ্যে নতুন বছরের আগমনকে সুভাশিষ জানাতে কতপ্রাণ অপেক্ষার প্রহর গুনছে। হাসি-তামাসার এ দুনিয়ায় ভাসমান জীবনগুলো অস্থির হয়ে উঠে যখন একটি পুরনো বছরের বিদায়ের পালা শুরু হয় আর নতুনের আগমন ঘটে। বিশেষ করে, যারা নগরজীবনে নিজেদের স্থায়ী কোন আবাসন গড়ে তুলতে পারেনি; যারা ভাড়া বাসায় যাপিত, তারা দুঃচিন্তায় ও উৎকণ্ঠায় থাকে। কারণ বছর বিদায় মানে এতোদিন যে ভাড়া দেয়া হয়েছে-তারও ইতি টানবে ভাড়া বাসার মালিক আর নতুন বছরের প্রথমদিন থেকে গুণবে নতুন ভাড়া। এর মানে বর্ধিত ভাড়া। আমরা জানি, চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের অধিবাসীদের যাদের নিজস্ব আবাসন নেই, ভাড়া বাসায় থাকেন, তাদের আবাসিক সমস্যাটা খুবই সঙ্কটময়। বছর বছর বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি এ সমস্যাকে আরো প্রকট করেছে। এই শহরের চাকরিজীবী আর ব্যবসায়ীদের প্রতিমাসের আয়ের বিপরীতে এই বাড়তি ভাড়া বহন করা সঙ্গতিপূর্ণ নয়; কখনোই ছিল না। নগর জীবনে মানুষের আয়ের সঙ্গে বাসা ভাড়ার এই যে বৈপরীত্য-এতেই নানা টানাপড়েন আর অসন্তোষের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবন।
সম্প্রতি দৈনিক পূর্বদেশসহ জাতীয় ও স্থানীয় বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে নতুন বছরে বাসাভাড়া বৃদ্ধির অনেতিক রীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৩৮৮ শতাংশ আর চট্টগ্রামে বেড়েছে ৩১৫ শতাংশ। ভাড়া বৃদ্ধির এই ক্রমহার কোনো নিয়মনীতির ওপর ভিত্তি করে নয়, বাড়ির মালিকরা বিভিন্ন অজুহাতে ভাড়া বৃদ্ধি করেন। এ নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় বাড়িওয়ালাদের স্বেচ্ছাচারিতা চলে নিরন্তর। জানুয়ারি এলে বাড়ি ভাড়া বাড়বে-এ নিয়তি মেনে নিয়ে বাড়তি ভাড়ার চাপে আতঙ্কিত মানুষ অসহায় বোধ করে। আয়ের সিংহভাগ অর্থ চলে যায় বাড়িওয়ালাদের পকেটি । এর কারণে ব্যাহত হয় রোজগারমুখী মানুষগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আর্থিক সঙ্কটে পড়ে নানা সাধ-আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত হয় ওইসব পরিবারের সদস্যরা। এভাবে শহুরে সমাজে সৃষ্টি হয়েছে দুটি শ্রেণি- একটি শোষক আর আরেকটি শোষিত।
নগর জীবনে শহরে বাড়ি ভাড়া একটা লাভজনক ব্যবসা। এই নিশ্চিত লাভের ব্যবসাটি সম্পর্কে এই নগরীর সামর্থ্যবান অনেক মানুষই অবগত। কোনো রকমে ভালো লোকেশানে একটি জায়গার মালিক হয়ে তাতে বাড়ি বানিয়ে একবারে ঝুঁকিমুক্ত ব্যবসা শুরু করা যায়। এই খাত থেকে অর্থ উপার্জন জটিল কোনো বিষয় নয়। আর যারা ভাড়াটিয়া তাদের অবস্থা ত্রাহী মধুসূদন। বছরে বছরে বিদ্যুৎ বিল বাড়লে পানির বিল বেড়ে যায়, সঙ্গে গ্যাসের বিলও বাড়ে। কিন্তু মধ্যবিত্ত যে মানুষগুলো বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল ও গ্যাস বিলের জোগান দেয় তাদের আয় কতটা বাড়ল- এই খবর কেউ রাখে না; না সরকার না বাড়িওয়ালা, না অন্যান্য সেবাদাতা কর্তৃপক্ষ। এই বাড়তি ভাড়া ও বিলের চাপে মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে, সেটা দেখার কেউ প্রয়োজন বোধ করে না।
আমরা মনে করি, বাড়ি ভাড়া নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট আইন থাকা দরকার। শহরের এলাকাবিশেষে কোন বাড়ির ভাড়া কত স্কয়ার ফিটে কত হবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাড়ির মালিকদের বছর বছর বাড়ি ভাড়া বাড়ানো রোধ করতে হবে। আর এটা কেবল সম্ভব সুনির্দিষ্ট আইনি পরিকাঠামোর মাধ্যমে। সরকারকে বাড়ি ভাড়ার নিয়ম-পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে। করতে হবে সুনির্দিষ্ট আইন। যেন বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটিয়া উভয়ের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে আইনি ধারার মাধ্যমে। আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগে বাড়িওয়ালাদের মধ্যে যেমন শোষণ মনোবৃত্তি থাকা উচিত নয়, তেমনি ভাড়াটিয়াদের সামর্থ্যকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। স্মরণ রাখা চাই, শহরে সরকারি, বেসরকারি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্বে নিয়োজিত মানুষগুলো দেশ ও জাতির উন্নয়নে কোনো না কোনোভাবে অংশীদার। এদেরকে বাড়িভাড়া নামক শোষণ পদ্ধতির জালে আটকে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাদের ন্যায্যতা অবশ্যই সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে আইনি কাঠামো তৈরি করে। নগরে ভাড়াটিয়া শ্রেণি অনৈতিক আর্থিক চাপ থেকে মুক্ত হোক- এই প্রত্যাশা আমাদের।