নতুন বছরের প্রত্যাশা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ে থাকুক শিশুদের বইয়ের ব্যাগটা

শাম্মী আক্তার

108


বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। ০২.০১.২০২০ সকাল ৭.৩০ মিনিট। গত রাত সাড়ে দশটায় মেয়েটা ঘুমিয়েছিল এখন সকাল সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ঘুম ভাঙছে না। এদিকে গতকাল তার বিদ্যালয় থেকে ফোন এসেছে ৮:১৫ মিনিটের আগেই উপস্থিত হতে হবে কারণ এ সময় অ্যাসেম্বলি শুরু হবে। যাইহোক, অনেকটা জোরাজুরি করি মেয়েকে ঘুম থেকে জাগানো হলো। তারপর তো যথারীতি শুরু হলো কান্নাকাটি কারণ সে আরোও ঘুমাতে চায়। এই তীব্র শীতে ঘুম ঘুম চোখে কারই বা পড়াশোনা করতে ভালো লাগে! এতে করে সার্কাডিয়ান রিদম আক্রান্ত হতে পারে।
মেয়ের দিনটাই শুরু হলো ঠিকমতো আরাম করে ঘুমাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে, বিরক্তি নিয়ে! যা কিনা তার দিনের পড়াশোনা, আচার-আচরণ এবং স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। যাইহোক, এত সকালে তো খেতেও ভালো লাগে না তাই কিছু না খেয়েই মেয়েটা বিদ্যালয়ে রওনা দিলো আর যখন আমি ওর ব্যাগটা কাঁধে দিতে যাচ্ছিলাম তখন একটু আঁতকে উঠলাম। ইস্! কত ভারী!

বর্তমানে যেহেতু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না। তাই যদি হয় অর্থাৎ তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত যদি কোনো পরীক্ষা না থাকে তাহলে প্রতিদিন এই কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ে এত ভারী ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসার কি খুবই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে?
তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত অন্তত থাকুক না পড়াশোনাটা বিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বইয়ের ব্যাগটা থাকুক না বিদ্যালয়ের ডেস্কে। শিশুরা একাডেমিক পড়াশোনা যা শিখবে সেটা বিদ্যালয়েই শিখবে। প্রয়োজনে শিশুদের বিদ্যালয়ে অবস্থানের সময় কাল একটু বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। আবার অতি উৎসাহী বাবা-মায়েরা প্রয়োজনে একসেট অতিরিক্ত বই বাসায়ও রেখে দিতে পারে।
তারপর চিরাচরিত যে পদ্ধতি অর্থাৎ বাড়ির কাজ দিয়ে দেয়ার যে প্রবণতা সেটারও কিছু গঠনগত এবং গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করি। ক্লাসের পড়ার বাইরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একটা ডায়েরিতে প্রতিদিন ভিন্নধর্মী বাড়ির কাজ লিখে দেবে। সেটা কেমন হবে? শিশুরা সপ্তাহের পাঁচ দিন অর্থাৎ যে দিনগুলোতে বিদ্যালয় চলে এই দিনগুলোতে তারা পাঁচ রকমের কার্যাবলী করবে। এগুলো হতে পারে একদিন একটু ভাষা দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করলো, একদিন একটু গান গাওয়ার বা কবিতা লেখার বা বলার চেষ্টা করলো, অন্যদিন একটু ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি করলো, তার ভালো লাগা কোনো বিষয়ের ছবি আঁকলো, নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা করলো, আরেকদিন চারপাশে যা দেখেছে তার উপর একটি গল্প তৈরি করলো যা পরবর্তী দিন ক্লাসে বন্ধু-বান্ধবের সামনে উপস্থাপন করলো বা কোনো একটা ভালো কাজ করতে বলা হলো, অন্য দিন হতে পারে তারা নিজেরা কাউকে কোনোভাবে সহযোগিতা করলো ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ একেক দিন একেক ধরনের বাড়ির কাজ হিসেবে এগুলো করতে বলা হলো এতে করে তাদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক, উদ্ভাবনী, স্বেচ্ছাসেবী এবং মানবিক সমস্ত গুণাবলীর বুনিয়াদ একেবারে শুরু থেকেই শুরু হলো। এভাবে ভালো কাজের মানসিকতার ভিত্তি মজবুত হতে থাকলো। অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত এভাবে চলতে দেওয়া প্রয়োজন।

মেয়েটার বিদ্যালয়ে যেদিন ইন্টারভিউ ছিল সেদিন বাসায় এসে ও আমার কাছে জানতে চাচ্ছে “আম্মু কিভাবে ফার্স্ট হতে হয়”? সহজভাবে ওকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। বিষয়টা এমন, যে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, আবেগীয় বিকাশ, শারীরিক ফিটনেস, আচার-আচরণ, মানসিকতা ইত্যাদি ভালো তারা ফার্স্ট হতে পারে। তার মানে শুধু লেখাপড়াতে ভালো হলেই চলবে না পাশাপাশি অন্যান্য দিকেও নজর দিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করতে হবে, সাজাতে হবে তাহলে ফার্স্ট হওয়া যাবে।

ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়া বা ইউটিউব যেদিকেই তাকাই সরাসরি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত একটা বিষয় খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই দেশে ডায়েটিশিয়ান এর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। কেউ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন আবার কেউবা শুধুমাত্র গুটিকয়েক অনলাইন, অফলাইন কোর্স বা ট্রেনিং করেই নিজেদেরকে ডায়েটিশিয়ান হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করছেন। যা কিনা সাধারণ মানুষের জন্য যাদের এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান নেই তাদের জন্য সুদূর প্রসারী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। (বিষয়টা অনেকটা এরকম দাঁড়িয়েছে যে মাশরুম খাওয়া যায় কিন্তু সবার এই ধারণা বা জ্ঞানতো থাকবে না যে সব মাশরুম খাওয়া যায় না।)
বর্তমানে পরিবেশ এমন দাঁড়িয়েছে যে বাইরের দেশের মতো আমাদের দেশেও “রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান” এর পলিসি গ্রহণ করা প্রয়োজন এতে করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বা দ্বিধা কমবে অন্যদিকে ডায়েটিশিয়ানদেরও উপযুক্ত মান মর্যাদা বজায় থাকবে। বিষয়টা যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এটা এমন হতে পারে আমাদের দেশে যে সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগ রয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটি বিভাগ থেকে প্রতিনিধি শিক্ষক নিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটা উইং বা প্লাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে যারা প্রয়োজনীয় মূল্যায়নের মাধ্যমে “রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান” সার্টিফিকেট দেবে।
বর্তমানে যেহেতু নন কমিউনিকেবল রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাচ্ছে তাই স্বাভাবিকভাবেই ডায়েটিশিয়ানের প্রয়োজনীয়তা সবাই অনুভব করছে তাই বিষয়টা একটা স্বীকৃত পদ্ধতির মাধ্যমে হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর মাধ্যমে সদ্য পাশকৃত শিক্ষার্থীদের মনে যে দ্বিধা যে তারা নামের পাশে “ডাইটেশিয়ান” পদবী লিখতে পারবে কিনা সেটাও দূরীভূত বলে মনে করি। নিঃসন্দেহে “ডায়েটিশিয়ান” এর থেকে “রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান”(আর ডি) অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য এবং সম্মানের। এর মাধ্যমে এই রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ানদেরকে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে নিঃসংকোচে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে যা কিনা সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা।

আমার দৈনন্দিন কাজের মধ্যে একটা কাজ আমি বিশেষভাবে করার চেষ্টা করি। সেটা হচ্ছে প্রতিদিন অন্তত দুই তিনটা বিদেশি লিডিং নিউজ পোর্টাল এর স্বাস্থ্য বিষয়ক ফিচারগুলো পড়া। এই ফিচারগুলো যখন পড়ি তখন মনে তেমন সন্দেহ কাজ করে না। কারণ সবগুলোতেই দেখি স্বাস্থ্যবিষয়ক ফিচার বা সংবাদগুলো কাভার করে হেলথ/ মেডিকেল/নিউট্রিশন এক্সপার্টরা। আমাদের দেশে এই জায়গায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের দেশে যেহেতু এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান করা হয় তাই এই জায়গাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। হেলথ জার্নালিজম এর উপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। দেশ যেহেতু সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাই মনে করি এই নতুন বছরে এই জায়গাগুলোতে গুণগত পরিবর্তন আমরা চাইলেই করতে পারি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক,
ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়