নতুন বই নব আনন্দ

শৈবাল বড়ুয়া

84

কুয়াশা ভরা সকালে মিষ্টির ঘুম ভাঙে। লেপ মুড়ি দিয়ে উষ্ণতা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়েছিল মিষ্টি। শিশির ঝরা শীতের সকালে ঠান্ডা খুব বেশি মনে হয়। গত রাতে মায়ের সাথে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। কখন যে মা ওর পাশ থেকে উঠে গেছে মিষ্টি জানে না। কিন্তু মিষ্টিকে আজ ভোরেই উঠতে হবে। ওর স্কুলে আজ “নতুন ব্ই উৎসব”। মিষ্টি পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। সুতরাং আজ তার ব্যস্ততা। আজ সে স্কুলে যাবে।
কাক ডাকা ভোর। শীতের সূর্যের নরম আলো জানালার ফাঁদ গলে মিষ্টির পড়ার টেবিলে ছড়িয়ে পড়েছে। মিষ্টি এগিয়ে যায় সেই দিকে। মিষ্টির ছোট্ট ঘরের এক পাশে ছোট্ট পড়ার টেবিল। বসার ছোট্ট চেয়ার।
মিষ্টি গিয়ে চেয়ার বসে পড়ে। বিগত বছরের পুরোনো বইগুলো টেনে নেয় সে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া বইগুলো জড়ো করে বুকে জাপটে ধরে। ওর ছোট্ট বুকের মাঝে যেন ঢেউ খেলে যায়। আনন্দের মাঝে কেন জানি ও বেদনাহত হয়ে পড়ে।
পুরোনো বইগুলো ওর বুকে যেন পরম মমতায় আশ্রয় নেয়। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়টা ওর ছোট্ট বুকে চাপ সৃষ্টি করে। দু’চোখের পাতা আপনা-আপনি ভিজে যায়।
পুরোনো বইগুলো যেন মিষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের চোখেও যেন অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে। মিষ্টি ওদের দূরে সরিয়ে দিতে চায়না। বইগুলোও মিষ্টিকে ছেড়ে যেতে চায় না।
মিষ্টি বইগুলো টেবিলের ওপর রেখে পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকে। বইয়ের সব পৃষ্ঠায় ছাপা লেখাগুলো ওর অতি পরিচিত। বিগত বছর জুড়ে ও সেগুলোই পড়েছে কেবলই।
ইতোমধ্যেই কখন সে পাঠ্য বইগুলোর সঙ্গে মিষ্টির বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে মিষ্টি তা বলতে পারে না। এ যেন বাঁধন মুক্ত মিতালি। কেউ কাউকে ছাড়তে চায় না। কিন্তু ছেড়ে যেতে হয়, ছেড়ে দিতে হয়!
চতুর্থ শ্রেণিতে ষান্মাসিক আর বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে পঞ্চম শেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে সে।
মিষ্টি বরাবরই ভালো ছাত্রী। চতুর্থ বার্ষিক পরীক্ষায় এবারও সে প্রথম হয়েছে। ফল প্রকাশের দিন বড় আপা অর্থাৎ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ওকে বলেছে, ‘তোমাকে আরো ভালো করতে হবে। পঞ্চম শ্রেণিতে টেলেন্ট পুলে প্রাথমিক বৃত্তিতেও শীর্ষস্থান নিয়ে উপজেলায় তোমাকে জায়গা করে নিতে হবে।’ বড় আপার মুখের কথাগুলো মিষ্টিকে আন্দোলিত করে। ও, হাসিমুখে বলে, ‘আপা, আপনার শুভ কামনা আমার মনে থাকবে।’ আসলেই মিষ্টির পড়া-শোনার ঝোঁক ওর পথের পাথেয়। ফল প্রকাশের দিন অনেক হাসি, অনেক আনন্দ হয়েছিলো মিষ্টির, সহপাঠিদের নিয়ে। ও যেন ছোট পাখির মতোন শুধুই উড়েছিলো সেদিন।
কিন্তু আজ এই মূহুর্তে ওর মনে হতে লাগলো, পুরোনো বইগুলোর মায়া-মমতা যেন ওকে ছাড়তে চাইছে না। ওর চোখ জুড়ে এখন তাই অশ্রুবিন্দু।
বাবা বাইরের ঘর থেকে মিষ্টিকে ডাকে। মিষ্টি যেন হঠাৎ সম্মোহন অবস্থা থেকে মুক্তি পায়।
ওকে আজ স্কুলে যেতে হবে। তাই বাবা ওকে ডাকছে। ‘বাবা আমি আসছি’ -বলে বাবাকে সাড়া দেয় মিষ্টি।
পুরোনো বইগুলোকে ভাঁজ করে একপাশে তুলে রেখে, নতুন বই এনে রাখার জন্য বইয়ের শেলফটা ফাঁকা করে রাখে মিষ্টি। তারপর ওর ঘর থেকে বেরিয়ে বাবার সামনে আসে ও।
বাবা তাঁর মেয়েকে দেখতে পেয়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে, ‘এ-কি তুমি কাঁদছো কেন! আজতো আনন্দ করার দিন। নতুন বই হাতে নেয়ার দিন।’
মিষ্টি বুঝতে পারে না, বাবাকে কী উত্তর দেবে! শুধু বলে, ‘আমার পুরোনো বইগুলো কাঁদছে’।
-বাবা মিষ্টির এ-কথা শুনে হাসতে থাকে। মিষ্টির মা-ও এগিয়ে আসে বাবা-মেয়ের কাছে।
মা বলে, ‘তোমার পুরোনো বইগুলো কাঁদছে, আর কি করা যাবে? কিন্তু তুমি আজ পঞ্চম শ্রেণির যে নতুন বইগুলো পাবে, তারাতো এতক্ষণ তোমার স্কুলে তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তুমি কি যাবে না তাদের আনতে?’
মিষ্টি একবার মায়ের দিকে তাকায়, আবার বাবার দিকে! ও দেখতে পায় বাবা-মা দুজনই ওর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
স্কুলের ইউনিফরমটা ঝটপট পরে নেয় মিষ্টি। মা ওর চুল আঁচরে দেয়। বেশ চটপট তৈরী হয়ে যায় স্কুলে যাবার জন্য। দেখতে পায় বাবাও তৈরী। আর দেরি নয়।-বাবার হাত ধরে, রিক্সায় চড়ে সোজা স্কুল গেইট এর সামনে পৌঁছে যায় ওরা।
স্কুলের সীমানায় ঢুকে মিষ্টির চোখে-মুখে আনন্দের বন্যা যেন! সে অবাক চোখে চারদিকে তাকায়। সবাই আজ নতুন ইউনিফরম পরেছে। একটা বড় ফেস্টুনে লেখা,“বই উৎসব”। চারদিক কেমন যেন রঙিন মনে হয় মিষ্টির। থরে থরে নতুন পাঠ্য বইগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নতুন বইগুলো যেন মিষ্টিকে ডেকে বলছে, ‘নতুন ক্লাসে নতুন বই পাঠ করবে তুমি।
মিষ্টি তুমি আমাদের নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠো।’
মিষ্টির মুখে হাসি ফোটে হঠাৎ। শ্রেণি শিক্ষিকার সামনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় সব শিক্ষার্থী।
মাইকে নাম ঘোষণা হলেই একে একে এগিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
মিষ্টির নাম ঘোষণা হতেই ও ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বড় আপা অর্থাৎ প্রধান শিক্ষিকার সামনে। শ্রেণি শিক্ষিকা আপা ফিতে বাঁধা একগুচ্ছ বই আপার হাতে তুলে দেয়। বড় আপা মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর নতুন বইয়ের গুচ্ছ তুলে দেয় মিষ্টির ছোট্ট হাতে।
মিষ্টির হাতে এখন নতুন বই। ওই নতুন বইগুলো যেন মিষ্টিকে বলছে, “আমাদের তুমি বাড়ি নিয়ে চলো।”
বইগুলো মিষ্টির দিকে তাকিয়ে হাসছে আর গান গাইছে যেন! -মিষ্টি এ মূহুর্তে বেদনার কথা ভুলে যায়। ফেলে আসা দিনকে পেছনে রেখে সামনের দিকে তাকায় ও! ওর অন্তর জুড়ে এখন পরম প্রশান্তি।
এই মূহুর্তে শীতের কুয়াশা কেটে গেছে। ভোরের লাল সূর্যটা মাথার উপরে ধবধবে ফর্সা রোদ ছড়াচ্ছে। রঙিন প্রজাপতি স্কুলের বাগানে গোলাপ, গাদা, জবা আর টগর, ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে।
মিষ্টির আনন্দ এখন আকাশ ছোঁয়া। ওর চোখে এখন আগামীর স্বপ্ন। মিষ্টির মুখে এ মূহুর্তে মিষ্টি হাসির ঝিলিক।