নজরুলের অনুবাদ সাহিত্য

রতন কুমার তুরী

20

কবিতা-গল্প-নাটক- গান-প্রবন্ধ, অনুবাদ সাহিত্য- সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাতেই নজরুলের পদচারণা ছিলো অবাধ এবং সাবলিল । নজরুল সাহিত্য রচনায় এতোবেশি পারদর্শি ছিলেন যে, নিজের মাতৃভাষার বাইরেও ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি এসব ভাষার বিদগ্ধ সাহিত্যিকদেরও বিভিন্ন জীবনদায়ি সাহিত্য তিনি নিজেই অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে ঋগ্ব করেছেন। বিশেষ করে ফার্সি সাহিত্যের প্রতি নজরুলের ছিলো ভিষণ দুর্বলতা। তাই নজরুল ফার্সি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করে
ফার্সি সাহিত্য অনুবাদে ব্রতি হয়েছিলেন।
নজরুল ১৮৯৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে সাত দশকের ওপরে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকলেও তিনি সাহিত্য সৃষ্টির সাথে জড়িতো থাকতে পেরেছিলেন মাত্র চব্বিশ বছরকাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯১৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত। নজরুলের এই স্বল্পকালিন সাহিত্য সাধনায় তিনি রচনা করেছিলেন অসাধারণ সব কবিতা, গান, নাটক, প্রবন্ধ, ছোট গল্প, অনুবাদ সাহিত্য । “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য -প্রত্রিকা”র শ্রাবণ সংখ্যায় নজরুলের প্রথম কবিতা “মুক্তি” ছাপানো হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে। নজরুলের দ্বিতীয় কবিতা “কবিতা-সমাধি” প্রকাশিতো হয় সওগাত প্রত্রিকার আশ্বিন সংখ্যার একই বছর অর্থাৎ ১৩২৬ বঙ্গাব্দে। নজরুল কর্তৃক রচিতো তৃতীয় কবিতা “আশায়” প্রকাশিতো হয় “প্রবাসী” পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় তাও ১৩২৬ বঙ্গাব্দে। প্রকৃতপক্ষে নজরুলের “আশায়” কবিতাটি ছিলো পারস্য কবি হাফিজের একটি গজলের অংশবিশেষের অনুবাদ। নজরুলের পঞ্চম কবিতা “বোধন” প্রকাশিতো হয়েছিলো ১৩২৭ বঙ্গাব্দ ইংরেজি ১৯২০ খৃষ্টাব্দে মোসলেম ভারত পত্রিকার জৈষ্ঠ সংখ্যায়। নজরুলের এই কবিতাটিও ছিলো পারস্য কবি হাফিজের “য়ূসোফে গুম্ গশতা বাজ আয়েদ ব- কিনান গম মখোর” নামক গজলের অনুবাদ। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায় “বঙ্গনূর” পত্রিকায় নজরুল “রূমী” অবলম্বনে লেখেন “বাঁশীর ব্যথা”। প্রকৃতপক্ষে নজরুলের সাহিত্য সাধনার প্রথম দিক থেকেই মৌলিক কবিতা রচনার পাশাপাশি ফারসী থেকে অনুবাদের নিরন্তর আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। সাহিত্য সাধনার প্রথম দিকে নজরুল ইংরেজি থেকে বাংলা গদ্যের কিছু অনুবাদও করেছিলেন তা ১৩২৭ বঙ্গাব্দে ‘ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়” “জননীদের প্রতি”, “শিশুর খুঁটিনাটি বিশেষত্ব”, ও
“জীবন – বিজ্ঞান” শিরোনামে প্রকাশিতো হয়।
প্রকৃতপক্ষে নজরুল পলটনে থাকাকালিন করাচি সেনানিবাসেই “দীওয়ান- ই- হাফিজ” থেকে কয়েকটি গজলের অনুবাদ দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি এসম্পর্কে তার নিজের লেখা “রুবাইয়াৎ- ই-হাফিজ” গ্রন্থে লিখেছেন – “আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে আজ ইংরিজি ১৯১৭ সালের কথা। সেইখানেই আমার প্রথম হাফিজের সাথে পরিচয় হয়। আমাদের বাঙালী পল্টনে একজন পাঞ্জাবি মৌলভী সাহেব থাকতেন। তাঁর কাছে ক্রমেই আমি ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত কাব্যই পড়ে ফেলি।… ” মুলতঃ এর কয়েক বছর পর থেকেই নজরুল হাফিজের বিখ্যাত গ্রন্থ “দীওয়ান” অনুবাদ করা শুরু করেছিলো। অপরদিকে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস থেকে নজরুল “রুবাইয়াৎ – ই – হাফিজ” অনুবাদ শুরু করেন। নজরুল অনুদিতো
১০টি রুবাই তৎকালিন সময়ে “জয়তী” পত্রিকায় প্রকাশিতো হয়। উক্ত রুবাইগুলো কবির স্বহস্তে লিখিতো প্রতিলিপি “নজরুল- রচনা-সম্ভার” স্থান করে নিয়েছে। নজরুলের নিজ হাতে লিখিতো সেসব রুবাইগুলোর একটি হচ্ছে ঠিক এরকম –
মদ্- লোভীরে মৌলভী কন্-
“পান করে এ শারাব যারা,
যেমন মরে তেমনি ক’রে
গোরের পারে উঠবে তা’রা! ”
তাই ত আমি সর্বদা রই
শারাব এবং প্রিয়ায় নিয়ে,
কবর থেকে উঠবে সাথে
এই শারাব এই দিল্- পিয়ারা।।
১৩৩৭ বঙ্গাব্দে কলকাতার “শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী এন্ড সন্স” নজরুলের “রুবাইয়াৎ- ই- হাফিজ” গ্রন্থটি পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। উক্ত পুস্তকের রুবাইগুলো তৎকালিন সময়ে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিতো হয়। নজরুলের “রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ” অনুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশিতো হওয়ার পর সাহিত্যাঙ্গনে নজরুলের ফার্সি ভাষার প্রতি দক্ষতা এবং অনুরপ্ততা প্রতিভাত হয়। এই অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিতো হওয়ার তিন বছর পর অর্থাৎ ১৩৪০ বঙ্গাব্দে নজরুল অনুদিতো পরপর ৫৯ টি ওমর খৈয়ামের রুবাই প্রকাশ করে মোহাম্মদী পত্রিকা।
নজরুলের এই “রুবাইয়াৎ – ওমর – খৈয়াম” গ্রন্থটি গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিতো হয় প্রায় আড়াই দশক পরে অর্থাৎ ১৩৬৬ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে। তাতে ১৯৭ টি রুবাই ছিলো।
এই গ্রন্থের প্রথম রুবাইটি ছিলো –
রাতের আঁচল দীর্ঘ ক’রে আসল শুভ ঐ প্রভাত,
জাগো সাকী! সকাল বেলার খোয়ারি ভাঙো আমার সাথ।
ভোলো ভোলো বিষাদ- স্মৃতি! এমনি প্রভাত আসবে
ঢের,
খুঁজতে মোদের এইখানে ফের, করবে করুণ নয়নপাত।
প্রকৃতপক্ষে মোহাম্মদীতে প্রকাশিতো ১ নং রুবাইটির কবির হাতের লেখা রূপ ছিলো এইরূপ –
পূর্বাশার ঐ মিহির হানে তিমির- বিদার কিরন তীর।
কায়খসরুর লাল পিয়ালায় ঝরছে যেন মদ জ্যোতির।
ভোরের শুভ্র বেদীমূলে ডাক দিয়ে কয় মুয়াজ্জিন –
জাগো জাগো, প্রাসাদ পেতে ঊষার ঘটের লাল পানির।
স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যে নজরুল পরবর্তিতে ইচ্ছে মতো রুবাইগুলো ঘষামাজা করে নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে একটি ভাষা থেকে আরেকটি ভাষায় কোনো সাহিত্য রুপান্তর করতে গেলে অনেক সময় মূল লেখকের লেখার আবেদন কিছিটা বিচ্যুতি ঘটে এক্ষেত্রে কোনো অনুবাদকারি যখনই পরবর্তিতে দেখেন যে এই রুপান্তরটা আরো একটু ঘষামাজা করলে মূল লেখকের আবেদনটা আরো স্পষ্ট হবে তাহলে সেটা তিনি করতেই পারেন নজরুলও সম্ভবতঃ তেমনটাই করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব সাহিত্যে ওমর খৈয়াম একজন বিদগ্ধ সাহিত্যিকের নাম। তার সৃষ্টি প্রতিটি রুবাই মানুষের চিন্তার জগতকে প্রসারিতো করেছিলো। খৈয়াম বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারলৌকিক জীবনের একটি স্পষ্ট ধারণা দিয়ে তা থেকে মানুষকে উত্তরণের পথ দেখাতে চেয়েছিলেন আর তার দর্শন অনেকটা মারফতি ধাঁচের। বিখ্যাত ওমর খৈয়াম গবেষক ফিডজেরাডও খৈয়ামের বেশকিছু রুবাই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন তিনিও পরবর্তিতে অনেক রুবাই পুণঃস্থাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
যেমন নজরুল অনুদিতো ওমর খৈয়ামের ১নং রুবাইটি ফিডজেরাড প্রথম দিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এভাবে –
Awake l for Morning in Bowl of Night
Has flung the stone that puts the Star to
Flightt
And Lo! the Huntar of the East has caught
The Sultan’ s Turrat in a Noose of Light..
ফিডজেরাড তার ওরম খৈয়াম বইটির চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন ১৮৭৯ সালে। সেখানে তিনি ওমরের ১ নং রুবাইটি পুনঃ অনুবাদ করেছিলেন ঠিক এভাবে এইভাবে-
Wake ! Fof the sun, who scatter’d into flight
The Stars before him from the Field of Night
Drives Night along with them from Heav’ n,
and strikas
The Sultan’s Turrat with a shaft of Light.
প্রকৃতপক্ষে পারস্য সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের কিছু জটিল বিষয় নিয়ে সাধনা করেছেন ওমর খৈয়াম আর তাই তার প্রত্যেকটি রুবাই মানুষের চিন্তার জগকে খুব বেশি প্রসারিতো করেছিলো। যদিও তৎকালিন সময়ে ওমর খৈয়ামামকে মানুষ চিনতেই পারেনি। পরবর্তিতে অবশ্য মানুষ বুঝতে পেরেছিলো বিশ্বসাহিত্যে কী অমূল্য সম্পদই না ওমর খৈয়াম রেখে গেছেন। ওমর খৈয়াম ফার্সি ভাষাশ নিজেই বলছেন –
খাইয়াম কে খিমাহায়ে হিকমৎ মিদোখ্ত্
দার কোরায়ে নাম ফেতাদ ও নাগাহ্ বসোখ্ত
মেকরাজে আজল্ তানার ওমরাশ্ চুবুরাদ্
দাল্লাল কাজা বরায়গনাশ্ বফরোখত
খৈয়ামের এই রুবাইটি নজরুল অনুবাদ করেছেন ঠিক এভাবে
খৈয়াম যে জ্ঞানের তাঁবু করল সেলাই আজীবন,
অগ্নিকুন্ডে পঁড়ে সে আজ সইছে দহন অসহন।
তাঁর জীবনের সূত্রগুলি মৃত্যু কাঁচি কাটলো হায়,
ঘৃণার সাথে বিকায় তারে তাই নিয়তির দালালগণ।
অবশ্য নজরুলের জন্মের প্রায়,তিন দশক আগে ১৮৬৫ সালের পর অক্ষর কুমার বড়াল ওমরের ভাব ঠিক রেখে রুবাইগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন যার প্রথমটা হলো রীতিমতো এইরুপ –
আর ঘুমায়ো না, পান্থ, মেলহ নয়ন।
প্রাচী- প্রান্তে ফুটে, প্রভাত- কিরণ।
এলোকেশী নিশীথিনী পলায় তরাসে
অঞ্চলে কুড়ায়ে তার ছড়ান রতন।।
নজরুল সমসাময়িককালে কান্তিচন্দ্র ঘোষ ওমর খৈয়ামের ৭৫ টি রুবাই বাংলায় অনুবাদ করে তার ‘রোবাইয়াৎ -ই – ওমর – খৈয়াম’ প্রকাশ করেন। তার অনুদিতো ওমর খৈয়ামের ১ নং রুবাইটিও ছিলো এধরণের –
রাত পোহালো- শুনছ সখি, দীপ্ত ঊষার মাঙ্গলিক ?
লাজুক তারা তাই শুনে কি পালিয়ে গেছে দিগ্বিদিক।
পূব-গগনের দেব্ শিকারীর স্বর্ণ উজল কিরণ – তীর
পড়ল সেথা রাজপ্রাসাদের মিনার যেথা উচ্চশির।।
প্রকৃতপক্ষে ওমর খৈয়ামের রুবাইগুলো এ পর্যন্ত অনেকেই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করেছেন কিন্তু তারা বেশিরভাগই খৈয়ামের আসল আবেদন এবং ভাবকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন সেক্ষেত্রে নজরুলের অনুদিতো রুবাইগুলো অনেকটাই ওমর খৈয়ামের ভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলো।
এটি সম্ভব হয়েছিলো মুলতঃ নজরুলের ফার্সি ভাষা শেখা এবং ওমর খৈয়ামকে ভালো করে হৃদয়াঙ্গম করার কারণে।
এখানেই নজরুলের ফার্সি সাহিত্য অনুবাদের কৃতিত্ব। সত্যিকথা বলতে কী যেকোনো বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ করতে হলে উক্ত ভাষার ওপর ব্যাপক দখল থাকতে হয়, তার সাথে সাথে উক্ত ভাষার সাহিত্যিকদের রচিতো সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে থাকতে প্রচুর জ্ঞান তা নাহলে তা নিজ ভাষার সাহিত্যে পরিণত করা বেশ দুর্সাধ্য হয়ে যায়। নজরুল ফার্সি সাহিত্য অনুবাদ করার আগেই সে সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন আর তাই তিনি করাচিতে সেনানিবাসে বসেই ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করার পাশাপাশি পড়ে ফেলেছিলেন ফার্সি ভাষার বিখ্যাত সব সাহিত্যিকদের বই যা তাকে পরবর্তিকালে ফার্সি সাহিত্য অনুবাদে সহায়তা করেছিলো। প্রকৃতপক্ষে নজরুল ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাসম্পন্ন কবি। যিনি রবীন্দ্র যুগেও সাহিত্য জগতে রাজত্ব করেছিলেন অত্যন্ত দাপটের সহিত ।
তথ্যসূত্রঃ
রুবাইয়াত – ই – হাফিজ
কাজী নজরুল ইসলাম
নজরুল সাহিত্য বিচার
শাহাবুদ্দীন আহমদ
যুগকবি নজরুল
আবদুল কাদির
নজরুল স্মৃতি
বিশ্বনাথ দে
অনুবাদক নজরুল
আতোয়ার রহমান