নগরীতে গণপরিবহনের সঠিক পরিসংখ্যান নেই

তুষার দেব

32

নগরীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী গণপরিবহনের সঠিক পরিসংখ্যান কারও কাছেই নেই। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে দু’দফায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেও এই মুহূর্তে ঠিক কত সংখ্যক গণপরিবহন নগরীর রাজপথে যাত্রী পারাপারে নিয়োজিত রয়েছে তার প্রকৃত চিত্র বের করতে পারে নি। জরিপ কার্যক্রমে হালনাগাদ কাগজপত্র ও পারমিটধারী যানবাহন হাজিরে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের রহস্যজনক লুকোচুরির কারণেই এ খাতে বিরাজমান ‘জিম্মিদশা’ থেকে যাত্রীদের মুক্তি মিলছে না।

জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন রুটে অনুমোদিত গণপরিবহনের মধ্যে কত সংখ্যক এখনও চালু রয়েছে তা খুঁজে বের করতে গত আগস্ট মাসজুড়ে বিআরটিএ ও নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ যৌথ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু যানবাহন হাজিরে লুকোচুরির আশ্রয় নেয় গণপরিবহন মালিকরা।

অনুমোদিত গণপরিবহনের ৪০ শতাংশই জরিপে গরহাজির থাকে। এ অবস্থায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর সিএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মেট্রো আরটিসি’র সভায় উপস্থিত গণপরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা দাবি করেন, আয়ুস্কাল ফুরিয়ে যাওয়া, কাগজপত্র হালনাগাদ না থাকা ও মেরামতের জন্য গ্যারেজে থাকাসহ নানা কারণে এসব গাড়ি জরিপ টিমের সামনে হাজির করানো যায়নি। তাদের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় আরটিসি। জরিপের বাইরে থাকা গণপরিবহনগুলো জরিপকারী কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করার জন্য গত ২ থেকে ৪ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় তিনদিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়। এরপরও যেসব পরিবহন মালিক গাড়ি  হাজির করতে ব্যর্থ হবেন, সেগুলো আর নগরীতে চলাচল করতে দেয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেয়া হয়। গণপরিবহন হাজির করার সময়সীমা এ সপ্তাহেই শেষ হচ্ছে। প্রথম দিন বাস-মিনিবাস, পরদিন হিউম্যান হলার এবং সর্বশেষ দিনে অটোটেম্পো হাজির করতে বলা হয় পরিবহন মালিকদের। এরপর শূন্যস্থানে নতুন গাড়ি নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপেও গরহাজির থাকা অনেক যানবাহন জরিপ টিমের সামনে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছেন পরিবহন মালিকরা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে জরিপে কার্যক্রমে নেতৃত্বদানকারী নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি-ট্রাফিক) ছত্রধর চাকমা পূর্বদেশকে বলেন, ‘নানা কারণে যেসব পরিবহন মালিক আগস্টে পরিচালিত জরিপে বাস-মিনিবাস, হিউম্যান হলার ও অটোটেম্পো হাজির করতে পারেন নি, আরটিসি’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদেরকে আরও তিনদিন সময় দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও অনুমোদিত সব যানবাহন জরিপে হাজির করা হয়নি। আমাদের ধারণা, ২০ শতাংশেরও বেশি যানবাহন গরহাজির রয়েছে।

বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানায়, প্রথম দফায় পরিচালিত জরিপে নগরীতে দেড় হাজারেরও বেশি গণপরিবহনের হদিস মিলে নি। এর মধ্যে রয়েছে  তিনশ’ ৬৪টি বাস-মিনিবাস, তিনশ’ ৮৯টি হিউম্যান হলার ও সাতশ’ ৯৩টি অটোটেম্পো। নগরীতে নিবন্ধিত ও রুট পারমিটধারী গণপরিবহনের সংখ্যা সোয়া চার হাজার হলেও ৪০ শতাংশ যানবাহনের হদিস না পাওয়ায় বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা বিস্মিত হন। এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর সিএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মেট্রো আরটিসির সভায় উপস্থিত গণপরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা দাবি করেন, আয়ুস্কাল ফুরিয়ে যাওয়া, কাগজপত্র হালনাগাদ না থাকা ও মেরামতের জন্য গ্যারেজে থাকাসহ নানা কারণে এসব গাড়ি জরিপ টিমের সামনে হাজির করানো যায়নি। তাদের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় আরটিসি। জরিপের বাইরে থাকা গণপরিবহনগুলো জরিপকারী কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করার জন্য নতুন করে সময় বেঁধে দেয়া হয়। গত ৪ অক্টোবর ওই সময়সীমা শেষ হলেও এখনও ২০ শতাংশ গণপরিবহন গরহাজির রয়েছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীতে বাস-মিনিবাসের ১১টি রুটসহ মোট ৪৬টি রুট থাকলেও এসব রুটে যাত্রীর তুলনায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন নেই। এজন্য সকাল-সন্ধ্যায় অফিস ও ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এসব রুটে কাগজে-কলমে অনেক গণপরিবহন থাকলেও বাস্তবে রাজপথে নেই। এ ছাড়া ভাঙা সড়কে ধীরগতির চলাচল, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানোসহ বিভিন্ন কারণে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃংখলা বিরাজ করছে। শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে নগরীর কোন্ রুটে কত সংখ্যক গণপরিবহন রয়েছে, তা জানতে গত ৪ আগস্ট থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত নগরীতে গণপরিবহন নিয়ে যৌথ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে বিআরটিএ ও সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ট্রাফিক- পশ্চিমাঞ্চল) ছত্রধর চাকমা এতে নেতৃত্ব দেন।

বিআরটিএ’র তথ্যানুযায়ী, নগরীতে এক হাজার একশ’ ৩৪টি বাস-মিনিবাস থাকলেও প্রথম দফার জরিপে পাওয়া গেছে সাতশ’ ৭০টি। লাপাত্তা হওয়া বাস-মিনিবাসের সংখ্যা তিনশ’ ৬৪টি। শতাংশের হিসাবে যা ৩২ শতাংশ। নগরীতে এক হাজার একশ’ ৪০টি অনুমোদিত হিউম্যান হলারের মধ্যে সাতশ’ ৫২টি পাওয়া গেলেও হদিস মিলেনি তিনশ’ ৮৯টির। শতাংশের হিসেবে যা ৩৮ শতাংশ। এছাড়া অনুমোদিত এক হাজার ছয়শ’ ৬০টি অটোটেম্পোর মধ্যে আটশ’ ৬৭টি পাওয়া গেলেও লাপাত্তা রয়েছে সাতশ’ ৯৩টি, যা ৪৮ শতাংশ। জরিপে মোট ৩৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ গণপরিবহনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় দফায় আনুমানিক আরও ২০ শতাংশ যানবাহনের অস্তিত্ব মিলেছে।

যাত্রী সাধারণের অভিযোগ, পরিবহন মালিকদের এই রহস্যজনক লুকোচুরিই গণপরিবহন খাতে নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ। যানবাহনের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, রুট বদল করে অন্যত্র যানবাহন চালানো, গণপরিবহন রিজার্ভ ভাড়ায় ব্যবহার, ভাড়া বৃদ্ধিসহ যাবতীয় নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ থেকে যায়। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে যাত্রী সাধারণ ও প্রশাসন। এই লুকোচুরি থেকে বের হতে না পারলে ‘জিম্মিদশা’ থেকেও মুক্তি মিলবে না।