ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড আইনের বাস্তব প্রয়োগের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে

7

গত ১২ অক্টোবর সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হল ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। গতকাল মঙ্গলবার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এ অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইন কার্যকর হলো। মূলত সংসদ অধিবেশন না থাকায় দ্রুততার সঙ্গে আইন কার্যকর করতে সাধারণত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সম্প্রতি নারীর প্রতি ধর্ষণসহ নানা বর্বোরোচিত ঘটনা দেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সকল মহল থেকে দাবি উঠেছে, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার। প্রধানমন্ত্রী কয়দিন আগে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হিসাবে বিধান রেখে আইন সংশোধনের ঘোষণা করেন। মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদন ও রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে রূপ নিল। এ অধ্যাদেশ জারির পর আইন প্রয়োগে আর বাধা থাকল না। আশা করছি, নতুন আইনের মধ্য দিয়ে নারী ও শিশুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। নারীর প্রতি নিপীড়নও ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। তবে একথাও সত্য যে, শুধু আইন করে বা বিদ্যমান আইনের সংশোধন করেই অপরাধ কমানো যাবে না, আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হতে হবে। ইদানীং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রভাবপ্রতিপত্তির ভয়ের কারণে নারীর প্রতি বর্বোরোচিত নিপীড়ন ধর্ষণের মত জঘন্য ঘটনা বেড়েই চলেছে। শুধু ধর্ষণ নয়, একই সঙ্গে ধর্ষণের পর হত্যার মত নিষ্ঠুর অপরাধেরও বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে এরই মধ্যে। এমতাবস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে প্রচলিত ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বদলে মৃত্যুদন্ডের বিধানের উদ্যোগ নেয় সরকার। বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড। আর ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। পাশাপাশি দুই ক্ষেত্রেই অর্থদন্ডের বিধান আছে। এ আইনের মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সাত দিন থেকে এক মাস এবং মামলা নিষ্পত্তির জন্য ১৮০ দিন (ছয় মাস) সময় বেঁধে দেয়া থাকলেও বাস্তবে ওই সময়ের মধ্যে রায় দেয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের এক একটি ঘটনা কিছুদিন পরপর সারাদেশকে নাড়া দিয়ে গেলেও এসব ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির নজির কম। ধর্ষণের বেশিরভাগ মামলা বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় চাপা পড়ে যায়। তাছাড়া ঠিকমতো ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়া, সামাজিক জড়তা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে নিরীহ মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয়েও সর্বোচ্চ বিচার পাচ্ছে না। ফলে দেশে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ যৌক্তিক। অর্থবিত্ত বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা বা তাদের মদদপুষ্টরাই ধর্ষণের মতো অপরাধ করে। ফলে এসব ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে, মামলা নিলেও তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে টালবাহানা করে, অপরাধীদের বাঁচিয়ে প্রতিবেদন দেয় কিংবা অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের দেখতে পায় না। বলা হয়, পলাতক। এরকম অভিযোগ অজ¯্র। স্বীকার করতেই হবে যে, ধর্ষকরাও আমাদের সমাজেরই কোনো না কোনো পরিবারের সদস্য। তাদের অনৈতিকতা দুশ্চরিত্র হয়ে উঠার দায় পরিবার-সমাজ এড়াতে পারে না। যুবক ও তরুণদের সুস্থ-সুন্দর মন ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না, এটাও স্পষ্ট। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে নৈতিকতার শিক্ষা ও চর্চা হওয়ার কথা সেখানেই দলবেঁধে ধর্ষণের মত ঘটনা সংগঠিত করছে কিছু নামধারী ছাত্র, যাদের পেছনে ছাত্রনেতার তিলকও আছে। ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর কিছু কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও বলাৎকারের মত গুরুতর অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রায় প্রকাশ হতে দেখা যায়। এ অবস্থায় সরকার যে কঠোর আইন করেছে-তা যথাসময়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েই করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করি, ইতোমধ্যে সংগঠিত ধর্ষণের বিচার এ আইনেই হবে- দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ভুলে গেলে চলবেনা, আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে না হলে ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না।