কৃষ্ণকুমারী স্কুলের ‘শিক্ষকের কান্ড’

দেড় ঘণ্টা লিখেই পাসমার্কের কাছাকাছি নম্বর ৭ ছাত্রীর!

ওয়াসিম আহমেদ

31

এসএসসির নির্বাচনীতে ১শ নম্বরের ৩ ঘণ্টার পরীক্ষায় দেড় ঘণ্টা লিখতে পেরেছে কৃষ্ণকুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ শিক্ষার্থী। অর্ধেক সময়ের মধ্যেই তারা পাসমার্কের কাছাকাছি নম্বর পেয়েছে। কেউ সর্বনিম্ন ১৯ আবার কেউ সর্বোচ্চ ২৮ নম্বরও পেয়েছে। কিন্তু বাকি দেড় ঘণ্টা তাদের উত্তরপত্র আটকে রাখায় পাস করতে পারেনি।
জানা যায়, কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া ‘শত্রুতাবশত’ ওই শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র আটকে রাখেন। স্কুলে বিভিন্ন সময় অভিযুক্ত ওই শিক্ষক ছাত্রীদের ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ দিতেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাতে রাজি না হওয়ায় তিনি এর প্রতিশোধ নেন পরীক্ষার হলে।
৯ শিক্ষার্থী ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। ওই কক্ষে ছিল ৭ শিক্ষার্থী। বাকি দুই জন অন্যরুমে পরীক্ষা দিয়েছে। তবে তাদেরও বিভিন্ন সময় অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ার কথা জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
কৃষ্ণকুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহমদ হোসেন পূর্বদেশকে জানান, অভিযোগকারী আফরিন আলম গণিতে ২১ নম্বর, উম্মে জিসান ২২ নম্বর, নাজমা সুলতানা পপি ২৫ নম্বর, ইসপিতা নূর ২৮ নম্বর, সাদিয়া আক্তার ১৯ নম্বর ও সাজিয়া আক্তার ২১ নম্বর পেয়েছে। বাকি দু’জন ২০৩ নম্বর রুমে পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের মধ্যে সুস্মিতা সেন অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করে। সে কেন অভিযোগ করেছে জানতে চাইলে তার অভিভাবক রাজেস বণিক বলেন, পপির খাতা নেয়নি সেটা সত্য। কারণ সে অন্য রুমে পরীক্ষা দিয়েছে। তবে তাকেও বিভিন্ন সময় অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন শিক্ষক প্রশান্ত বড়–য়া।
অংকে ২৮ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী ইসপিতা নূর পূর্বদেশকে বলে, প্রশান্ত স্যার বিভিন্ন সময় আমাদের ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ দিতেন। পরীক্ষার হলে প্রবেশ করার সাথে সাথে বলে উঠেন, ‘আজ তোদের পেয়েছি’। খাতা নিয়ে ফেলার পর আমি কান্নাকাটি করে খাতা ফেরত চাইলে তিনি আমার ফেসবুক একাউন্টের নাম জানতে চান। আরো বলেন, ‘তোমরা তো এমনিতে ছেলেদের সাথে ঘুরতে যাও, আমি তো সারাদিন ফ্রি থাকি, আমার সাথে গেলে সমস্যা কি?’ শেষে ১০ মিনিট আগে খাতা ফেরত দেন। এই অল্প সময় পরীক্ষা দিয়ে আমি ২৮ পেয়েছি। এছাড়া আমি দুইটি বিষয়ে জিপিএ ৫, তিনটা জিপিএ ৪, দুইটিতে জিপিএ ৩ দশমিক ৫, একটি জিপিএ ৩ এবং বাকিটাতে জিপিএ ২ পেয়েছি। আপনারাই বিচার করুন আমি ফেল করার মত ছাত্রী কি না ? নূর আরো বলে, শুধু আমার রেজাল্ট না, বাকি সবার রেজাল্টও এমনি। এখন আমাদের পড়ার সময়, আজকে শুধুমাত্র ওই শিক্ষকের কারণে আমাদের স্কুলের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ৬ নভেম্বর সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের কাছে ওই বিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থী অভিযোগ করে, শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া ছাত্রীদের বিভিন্ন সময় ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ দিয়েছেন। মোবাইল নম্বরসহ ছাত্রীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সংযুক্ত হতে আগ্রহ দেখান। পরবর্তীতে দশম শ্রেণির ছাত্রীরা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে এসব বিষয়ে অভিযোগ করলে, ওই শিক্ষককে দশম শ্রেণিতে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়। এরপর থেকে তিনি দশম শ্রেণির বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকেন এবং প্রায় সময় পরীক্ষায় নম্বর দেয়া ও ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। স¤প্রতি ওই শিক্ষার্থীদের এসএসসির নির্বাচনীতে গণিত বিষয়ে পরীক্ষা চলাকালীন ২০৪ নম্বর কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া। তখন তিনি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রায় দেড়ঘণ্টা আগে ছাত্রীদের উত্তরপত্র নিয়ে নেন। পরে পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে খাতা ফিরিয়ে দেন। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়েই বিষয়টি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহমেদ হোসেনকে অবহিত করেন। ওই সময় প্রধান শিক্ষক বিষয়টি দেখবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেন।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন পূর্বদেশকে বলেন, শিক্ষার্থীরা আমার কাছে অভিযোগ করে, তাদের খাতা আটকে রাখার কারণে পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। আমি বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধান নির্বাহীকে নির্দেশ দিয়েছি। তিনি আজকে (গতকাল ) পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কাজে ঢাকায় ছিলেন। তাই হয়ত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাননি। আমি আগামী রবিবার শিক্ষবোর্ডের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

তদন্ত কমিটি নিয়ে বিভ্রান্তি :
কৃষ্ণকুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ ছাত্রীকে ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ দেয়ায় তারা শিক্ষক প্রশান্ত বড়–য়ার বিরুদ্ধে সিটি মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়। এতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করে, পূর্বশত্রুতার জের ধরে পরীক্ষার হলে দেড় ঘণ্টা খাতা আটকে রাখেন শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া। ফলে এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় গণিত বিষয়ে ফেল করেছে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা। এধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মেয়রের নির্দেশে তদন্ত কমিটি করার কথা জানান বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহমদ হোসেন। তবে ‘তদন্ত কমিটি’ নিয়ে কোনো নির্দেশনা দেননি বলে জানান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এব্যাপারে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শকের নির্দেশে কমিটি গঠন করেন বলে জানান। শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর আবু তাহেরও এ ধরনের নির্দেশ দেননি বলে জানান। ফলে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের তদন্ত কমিটি নিয়ে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি ।
প্রতিবেদক গতকাল দুপুরে সরেজমিনে কৃষ্ণকুমারী স্কুলে গেলে প্রধান শিক্ষক জানান, স্থানীয় কাউন্সিলর সলিম উল্লাহকে আহব্বায়ক করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটির বাকি তিন সদস্য হলেন, স্কুলের শিক্ষক শিল্পী বৈদ্য, শাহীনুর জাহান ও তানসেন দেওয়ানজী। এ সময় তদন্ত কমিটির চারজনই উপস্থিত ছিলেন। তদন্তের অংশ হিসেবে ওইদিন পরীক্ষা হলে উপস্থিত থাকা বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে লিখিত জবানবন্দী নেন কমিটির সদস্যরা।
গতকাল রাতে কাউন্সিলর সলিম উল্লাহ মুঠোফোনে পূর্বদেশকে বলেন, আমরা তদন্ত করেছি। যারা এক বিষয় ফেল করেছে তাদের আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা মেয়র মহোদয়ের সাথে কথা বলব। অভিযুক্ত শিক্ষক প্রশান্ত বড়–য়ার ছাত্রীদের ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা আরো তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তদন্ত কমিটি কে করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনায় করা হয়েছে। কমিটি গঠনে মেয়র কোনো নির্দেশ দেননি জানালে তিনি প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে বলেন।
বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহমদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে মেয়রের কথা বলেন। পরে মেয়রের অস্বীকারের বিয়য়টি অবহিত করলে, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক মুঠোফোনে ওনাকে তদন্ত কমিটি করার কথা বলেন বলে জানান। পরে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর আবু তাহের মুঠোফোনে পূর্বদেশকে বলেন, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগটি নিয়ে আসে। অভিযোগের বিষয়টি জানার জন্য আমাকে বলেন চেয়ারম্যান। তারপর আমি শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলি। তাদের কাছে জানকে চাই, তারা প্রধান শিক্ষককে অভিযোগ করেছে কি না? উত্তরে তারা আমাকে বলেছে, তারা ঘটনার দিনই প্রধান শিক্ষককে অভিযোগ করে। পরে রেজাল্ট দেওয়ার পর আবার গেলে প্রধান শিক্ষক তাদের মেয়রের কাছে যেতে বলেন। শিক্ষার্থীরা মেয়রের কাছে গেলে সেখান থেকে শিক্ষাবোর্ডে আসতে বলা হয়। তাই তারা এসেছে।
তিনি আরো বলেন, আসলে বিষয়টি বোর্ড সংশ্লিষ্ট নয়। কেননা নির্বাচনী পরীক্ষা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা। সেখানে কি হয়েছে তা প্রতিষ্ঠান প্রধানের দেখার দায়িত্ব। আবার যেহেতু বিদ্যালয়টি সিটি করপোরেশন পরীচালনাধীন, তাই প্রতিষ্ঠান প্রধানের পর সিটি করপোরেশন দেখবে। তারপরও আমি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের সাথে ফোনে কথা বলি। তখন ওনাকে বলি, এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। সেটা তদন্ত হোক বা অন্যভাবেই হোক।
পরে প্রধান শিক্ষক আহমদ হোসেন থেকে আবারো জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শকই কমিটি গঠন করতে বলেছেন। তখন বিদ্যালয় পরিদর্শকের অস্বীকারের তাকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বলেন, ওনি আমাকে তদন্ত করতে বলেছেন, তাই আমরা অভ্যন্তরীণভাবে কমিটি করেছি।
তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি অস্বীকার করে সিটি মেয়র বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে কোনো তদন্ত কমিটি করতে বলা হয়নি। আর আমি বিষয়টি দেখার জন্য প্রধান নির্বাহীকে দায়িত্ব দিয়েছি। উনি আজ (গতকাল) পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই হয়ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। পরে বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সামসুদ্দোহার কাছে জানতে চাইলে, তিনিও অস্বীকার করেন।