দেশে নিরাপদ সড়ক আর কতদূর

লিটন দাশ গুপ্ত

27

প্রায় বছর দুয়েক আগের কথা। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে, ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় শহরের একটি সড়ক ধরে হাঁটছিলাম। সেই দেশের ট্রাফিক সিস্টেম সম্পূর্ণ আমাদের দেশের বিপরীত। অর্থাৎ আমাদের দেশে আমরা রাস্তার ডান পাশ (নিজেদের বামপাশ) দিয়ে চলাচল করি বা গাড়ি চালিয়ে থাকি। আর ভিয়েতনামে চলেফেরা করে বা গাড়ি চালায়ে থাকে রাস্তার বাম পাশ দিয়ে। আমাদের দেশে ড্রাইভার বসে গাড়ির সামনে ডান পাশে, সেই দেশে ড্রাইভার বসে গাড়ির সামনে বাম পাশে। একইভাবে তাদের গাড়িতে যাত্রি উঠানামার দরজা গাড়ির ডানদিকে, যা সম্পূর্ণ আমাদের দেশের বিপরীত।
যাইহোক, আমরা সেই দেশে হাঁটার সময়, সেই দেশের নিয়ম অনুযায়ী হাঁটার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সেই দেশের নিয়ম অনুযায়ী হাঁটার চেষ্টা করেও আমরা নিজদেশের নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে যাবার কারণে, নিজেদের অজান্তে বার বার ভুল করে আমাদের সিস্টেমে হাঁটছিলাম। এইভাবে হাঁটতে গিয়ে একবার আমরা আমাদের মত করে রাস্তা পার হবার সময়, হঠাৎ একটি বাস ও একটি মোটর সাইকেল মুখোমুখি হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় দ্রæতগামী বাস আমাদের বাঁচাতে গিয়ে খুবই বিপদজনকভাবে ব্রেক করে থেমে যায়। অন্যদিকে মোটর সাইকেল চালক কিছুদূর গিয়ে ছিঁটকে পড়ে। এরপর দেখলাম সে (চালক) খুবই দ্রæত উঠে আমাদের দিকে ছুটে আসতে থাকে। গাড়িটি পড়ে আছে পথের ধারে। তার হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সামনের দিকে আসার অবস্থা দেখে, আমাদের সাথে থাকা পিরোজপুরের বন্ধু সঞ্জয় কুমার মালঙ্গী বলে, ভাই আজ আমাদের নিস্তার নাই। এদিকে মোটর আরোহী আমাদের সামনে চলে আসে। আমরা সবাই শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। সে আমাদের সামনে এসে দেখলাম, দুই হাত জোড় করে, বারে বারে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। বিভিন্নভাবে অঙ্গভঙ্গীর মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করছে সে খুবই দুঃখিত। উল্লেখ্য সেই দেশের প্রায় সকল মানুষ এমনকি উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিও ইংরেজি ভাষা জানেনা, বুঝেনা। তাদের জানা বা বুঝার কথাও নয়। কারণ সেই দেশে কোথাও কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কোন শ্রেণিতে ইংরেজি পড়ানো হয়না। শুধু তাই নয় বিদেশি ভাষা হিসাবে ইংরেজি ভাষাকে ঘৃণা করে। তাই বিভিন্নভাবে হাত নেড়ে অঙ্গভঙ্গীর মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করছে সে অত্যন্ত দুঃখিত। এই দিকে বাসের ড্রাইভারও দেখি একই অবস্থা। আমরা অবাক, ভুল করলাম আমরা অথচ উল্টো আমাদের কাছে এসে ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশ করা, কেমন জানি অন্য রকম মনে হল। হয়ত তাদের ধারণা আমরা বিদেশি, তাদের নিয়ম কানুন আমাদের অজানা, তাই আমাদের ভুল হতেই পারে। সেই জন্যে আমাদের কাছে এত আকুতি মিনতি, যেন তারাই অপরাধ করে ফেলেছে। তা দেখে আমাদের মনে হল আমরা কোন এক অজানা আজব দেশেই পৌঁছেছি।
বিষয়টি এখানে বলার কারণ হচ্ছে, সেই দেশের চালকের ভদ্রতা নম্রতা, সৌজন্যতা বুঝানোর জন্যে। অন্যদিকে আমাদের দেশে গাড়ির চালকরা কি এবং তাদের কেমন স্বভাব, যাদেরকে নিয়মিত গাড়ি করে আসা যাওয়া করতে হয়, গণপরিবহনে চড়তে হয়, তারাই ভালো মত জানে। এই দেশের বেশ কিছু পরিবহন শ্রমিকের আচরণ পশুর আচরণ বা হি¯্রতাকেও হার মানায়। যেমন- গাড়িতে পূর্ণ যাত্রী, তবুও পিছনের গাড়িকে আগে যেতে দিবেনা এবং যাত্রী নিতে দিবেনা। অথবা যেতে চাইলে দ্রুত গতিতে বেপরোয়া চালিয়ে সামনে গিয়ে, গাড়ি দিয়ে গাড়িকে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করবে। গাড়িতে যাত্রির অভাব নেই আবার পথেও মানুষের অভাব নেই। তবুও এই ধরনের বিকৃত মস্তিষ্কের প্রতিযোগিতা। এখানে সাধারণ যাত্রী বা পথচারীর নিশ্চিত মৃত্যু হবে জেনেও তারা পরোয়া করেনা। এই জাতীয় চোখের সামনে বেশ কয়েকটা দূর্ঘটনা দেখে মনে হলো ইচ্ছাকৃত ভাবেই ঘটিয়েছে। ইচ্ছাকৃত কথাটি হয়ত অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে যারা প্রত্যক্ষ দেখেছে তারাই সাক্ষী।
এই ধরনের ইচ্ছা, চিন্তা, আচরণ সাধারণত কিছু পশুতে পরিলক্ষিত হয়। আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখতে পায়, প্রাণি জগতের একই শ্রেণির কোন প্রাণি খাবার সংগ্রহ করে, সবাই মিলে একসাথে খেয়ে থাকে। যেমন- বাঘ বা সিংহ, হরিণ শিকার করে সকল বাঘ বা সিংহ মিলে একসাথে খেয়ে থাকে। শিয়াল বা শকুন খাবারের সন্ধান পেলে, অন্য শিয়াল বা শকুনকে ডেকে নিয়ে এক সাথে খেয়ে থাকে। কিন্তু কুকুরের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্ন রকম চিত্র। কুকুর বিশাল একটি মৃত গরু দেখতে পেলে, একা নিজে খাবার চেষ্টা করে থাকে। অথচ আস্ত একটা মৃত জন্তু একা খেতে পারবেনা জেনেও একটি কুকুর অন্য কুকুরদের তাড়িয়ে দেয়। ঠিক সেই রকম কুত্তার চিত্র (!) বেশকিছু পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে বিদ্যমান। বিষয়টি এভাবে বলছি তাদের আচরণে অতিমাত্রায় ক্ষুব্ধ হয়ে। কারণ এদের পশুত্ব ও হিংস্রতা গত কয়েক মাস আগে তাদের ডাকা পরিবহন ধর্মঘটে প্রকাশ পায়। তারা অন্যায়ভাবে পরিবহন ধর্মঘট করে গাড়ি বন্ধ রাখে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষকে রিক্সা থেকে নামিয়ে আক্রমণ বা আঘাত করতে থাকে। শুধু তাই নয় পথচারীর গায়ে মুখে এমনকি মহিলাদেরকেও আলকাতরা বা পোড়া মবিল লাগিয়ে উল্লাস করতে থাকে।
এখনো এক বছর হয়নি; বিমানবন্দর সড়কে ক্যান্টমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনার কারণে নিহত হবার ঘটনায়, সাড়াদেশের শিশু কিশোররা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। স্কুলে পড়ুয়া শিশু কিশোর পথে নামা যা ছিল নজীরবিহীন ঘটনা। ঐ সময় পত্রিকায় ‘অসংগঠিত শক্তির নবজাগরণ’ শিরোনামে লিখেছিলাম। এরপর মনে করেছিলাম কিছুটা হলেও সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে, আমরা নিরাপদ সড়ক পাবো। কিন্তু কোথায় সেই নিরাপদ সড়ক?
এখন সড়ক দুর্ঘটনা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, আমরা চলার পথে নিজেদেরকে নিয়ে যেমন আতঙ্কে থাকতে হয়, তেমনি অন্যদেরকেও নিয়ে আশঙ্কায় থাকতে হয়। গত চার পাঁচ বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের ১৩ তম দেশ, যেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় বেশী সংখ্যক লোকের প্রাণহানী ঘটে। এখন হয়ত পরিসংখ্যান হিসাবে আরো এগিয়ে এসেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় যতজন নিহত হয়, আহত হয় তার চেয়ে আরো বহুগুন বেশি। কিন্তু কেন দেশে এত সড়ক দুর্ঘটনা? আমাদের দেশে নিরাপদ সড়ক আর কত দূর? এত বিজ্ঞ অভীজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির মতামত অভিমত কেন উপেক্ষিত হচ্ছে?
অথচ একটু সতর্ক ও সচেতন হলে অধিকাংশ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়। আমার দৃষ্টিতে দুর্ঘটনার মূল কারণ হচ্ছে- অমনোযোগী হয়ে বা চিন্তা মাথায় গাড়ি চালানো, লাইসেন্সবিহীন চালকের সাহায্যে গাড়ি চালানো, সঠিক স্থানে যথাযথ জায়গায় স্পীড ব্রেকার না থাকা, ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অমান্য করা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, দুটি গাড়ির মধ্যে অসহিষ্ণু প্রতিযোগিতা দেয়া, চালকের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষভাব, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, অদক্ষ অনভিজ্ঞ কমবয়সী চালক বা হেল্পারের সাহায্যে গাড়ি চালানো, দ্রæতগতিতে বেপরোয়া গাড়ি চালনার অভ্যাস, অন্যায় বেআইনী ভাবে ওভারটেক করা, মাদকাসক্ত ড্রাইভার কর্তৃক গাড়ি চালানো ইত্যাদি হচ্ছে মূল কারণ, যা আমি প্রতিদিনের একজন যাত্রী হিসাবে দৃশ্যত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এছাড়া আরো ডজনে ডজনে অনেক কারণ থাকলেও আমি মনেকরি মুখ্য কারণ এইগুলো।
এবার গাড়ির পিছনে লেখা থাকা কিছু কথা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করতে চাই। চলার পথে বিভিন্ন গাড়ির পিছনে বিভিন্ন ধরনের বাণী বিভিন্ন নীতিকথা দেখা যায়। যেমন-‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আদালত হচ্ছে মানষের বিবেক’ ‘১০০ হাত দূরে থাকুন’ ‘সতর্কতার সাথে গাড়ি চালাও’ ‘চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানো উচিৎ নয়’ ‘ভাইয়া আমি ছোট আমাকে মেরো না প্লীজ’ ‘গাড়ির কোন প্রাণ নাই বটে গাড়ির ভিতর অনেক প্রাণ’ ইত্যাদি হরেক রকম কথা। বিভিন্ন গাড়ির পিছনে থাকা এই সব লেখা থেকে দুটি কথা নিয়ে ও ব্যাখ্যা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করব। যেমন- যে গাড়ির পিছনে লেখা আছে ‘একটি দুর্ঘটনা সাড়া জীবনের কান্না’ অথচ সেই গাড়ির চালক গাড়ি চালানোর সময় কথাটি নিজে চিন্তা করেনা। আবার অনেক গাড়িতে লেখা আছে ‘ট্রাফিক আইন মেনে চলতে সচেতন হোন’ অথচ দেখা যায় সেই গাড়িটির চালক ট্রাফিক আইন অমান্য করে দ্রæত বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমার মাত্র দুটি পরামর্শ; একটি হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ‘সচেতনতা সৃষ্টি’ করা, এবং অন্যটি হচ্ছে প্রচলিত ‘আইন যথাযথ ব্যবহার’ করা। আশাকরি এই দুটিতেই সাড়া দেশে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। আমরাও নিরাপদ সড়কে পৌঁছাতে সক্ষম হব।

লেখক : প্রাবন্ধিক