দেশে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদেরও সতর্ক হতে হবে

9

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পর বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামিতে জান ও মালের যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে, তাতে বিশ্ব বিবেক হতবাক ও স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়া এখন এক মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। দেশটির সুলাওয়েসি দ্বীপে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার লোক নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছে দুই লাখের অধিক মানুষ। গৃহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, গবাদি পশু, সহায়-সম্পদহারা হয়েছে প্রায় ষোল লাখ মানুষ। তবে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে পারেনি। ভূমিকম্প ও সুনামিতে ব্যাপকসংখ্যক মানুষের প্রাণহানিতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত, মর্মাহত।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে ভূমিকম্পের পর সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু শহরে সুনামি আঘাত হানে। সাগর থেকে ছুটে আসা ৬ মিটার উঁচু (২০ ফুট) ঢেউ উপক‚লীয় শহরটিতে আছড়ে পড়ে। সুউচ্চ ঢেউ লন্ডভন্ড করে দেয় উপকূলীয় এলাকা। এতে পালুর বেশিরভাগ বাড়িঘর, হাসপাতাল, শপিংমল ও হোটেল ধসে গেছে। ভূমিধসে পালুর প্রধান মহাসড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সূত্র জানায়, সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু শহরের ৩ লাখ ৩৫ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে অধিকাংশ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। রেডক্রস বলছে, জীবিত ও আহতদের উদ্ধারে তাদের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। তারা বলছে সুনামিতে সুলাওয়েসি দ্বীপের পুরো বিশাল এলাকার প্রায় ১৬ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। লাশ ভাসছে সমুদ্রের পানিতে। সাগরের উপকূলে পড়ে রয়েছে সারি সারি মরদেহ। আর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে প্রাণের আর্তি। জীবনের এ আর্তনাদে সাড়া দিতে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত, ভারী যন্ত্রপাতিও সীমিত। ভূমিকম্পে অনেক বহুতল ভবন ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই উদ্ধার কাজে সময় লাগছে। আমরা লক্ষ্য করছি, যুগ যুগ ধরে জাপান ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রকৃতিতে সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্যোগ লেগেই আছে। মানুষের আওতার বাইরে ঘটমান এমন বিপর্যয় নিয়ে অনেক পরিকল্পনা ও সতর্কতার কথা থাকলেও সেখানকার কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেন বলে মনে হয় না। পালুতে একটি সুনামি আঘাত হানতে যাচ্ছে- এ ধরনের সতর্কতা জারি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও ভূতত্ত্ব সংস্থা বিএমকেজি ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করে, কিন্তু ৩৪ মিনিট পর তারা তা প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যদিকে তাদের করা সতর্কতা অনুযায়ী সময়ের মধ্যে উপকূলে আঘাত হানে এই সুনামি। এ ধরনের দুর্যোগ ও প্রাণহানি থেকে আমাদের অনেক সতর্কতা গ্রহণ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ওই দ্বীপ এলাকা ও এর আশপাশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিকট-অতীতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে। গত জুলাই ও আগস্টে পালু শহর থেকে শত কিলোমিটার দূরের লমবক দ্বীপে দফায় দফায় ভূমিকম্পে পাঁচশতাধিক লোকের প্রাণহানি হয়েছে। ২০০৪ সালে ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এখন সর্বহারা মানুষগুলোর অভুক্ত অবস্থায় মানবেতর দিন কাটছে। পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে হাজারো শিশু-কিশোর, নারী, বৃদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিৎ দেশটিকে মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জরুরি উদ্যোগ নেয়া। দ্রুত দেশটি ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠুক, আটকেপড়া মানুষ উদ্ধার হোক- এটিই আমাদের কাম্য। তবে এ মুহূর্তে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে আমাদের বাংলাদেশের কথা মনে আসছে। সম্প্রতি নাতিশীতোষ্ণ শরতে যে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে তাতে আবহাওয়া অফিস বাংলাদেশে আরো একটি ঘূর্ণিঝড়ের আশংকা করছে। অপরদিকে বিশেষজ্ঞের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক দিকগুলো স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশ এখন কোনোমতেই ভ‚মিকম্পসহ ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঝুঁকিমুক্ত নয়। এ জন্য আমাদের উচিৎ ভূমিকম্পসহ যেকোন দুর্যোগ মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা। এ ক্ষেত্রে সরকারের মনোযোগ আরো বাড়াতে হবে।